ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ব্যাপক সাফল্য ও রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা, ভাঙচুর ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, আসাম ও উত্তরপ্রদেশের মতো সংখ্যালঘু মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোতে বুলডোজার চালানোর প্রকাশ্য হুমকি এবং ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই কলকাতার রুবি মোড় থেকে শুরু করে টালিগঞ্জ, আসানসোল, নিউটাউনের মতো এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়গুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া বা অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে। টালিগঞ্জে খোদ সাবেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের অফিস গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বারাসাতের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় মসজিদের দেয়াল ও দরজায় গেরুয়া আবির ছুড়ে মারার ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উসকানি ও সম্প্রীতি ভঙ্গের গভীর ষড়যন্ত্র দেখছেন স্থানীয়রা। মুসলিম কলোনিগুলোতে স্থানীয় বিজেপি নেতাদের বুলডোজার চালানোর প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং মাঝ রাতে বাইক বাহিনীর আস্ফালন সাধারণ মানুষকে ঘর হারানোর আশঙ্কায় তটস্থ করে রেখেছে। মুসলিম মহল্লায় ঢুকে মারধর, বাইক মিছিল করে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
এসব এলাকায় ভোট গণনার সময়ও পেশিশক্তি প্রয়োগের নগ্ন প্রদর্শন ঘটেছে। চুঁচুড়ার এইচআইটি কলেজে ধনেখালী বিধানসভার ভোট গণনা কেন্দ্রে উপস্থিত এজেন্টরা দাবি করেন, বিজেপির এজেন্টরা কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতেই কার্যত আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং বিরোধী এজেন্টদের ওপর চড়াও হয়। এমনকি নারী এজেন্টদের উদ্দেশে ধর্ষণের মতো জঘন্য ও অসভ্য হুমকি দিয়ে তাদের গণনা কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এক পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের তথ্য আপডেট করাও রহস্যজনকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ উঠেছে, বিজেপি সমর্থকরা মিনাখাঁয় তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য মহুয়া সরদার মাইতির বাড়িতে ঢুকে তাকে মারধর এবং তার মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এছাড়া কোচবিহার থেকে ডানকুনির সর্বত্রই বিরোধী দলগুলোর অফিস দখল করে গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ধনেখালীর এক প্রত্যক্ষদর্শী এজেন্ট ক্ষোভের সঙ্গে জানান, গণনা কেন্দ্রের ভেতরে যে তাণ্ডব চলেছে, তা কল্পনাতীত। জয় শ্রীরাম স্লোগান দিয়ে আমাদের ওপর চড়াও হয়ে বলছে, সময় থাকতে গেরুয়া শিবিরে চলে আয়, নয়তো রক্ষা নেই। বিশেষ করে নারীদের যে ভাষায় গালিগালাজ আর হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা সভ্য সমাজে ভাবা যায় না।
অন্যদিকে বারাসাতের এক স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা বছরের পর বছর ধরে শান্তিতে বাস করছি। কিন্তু এখন মসজিদের গায়ে গেরুয়া আবির ছোড়া হচ্ছে, কলোনির সামনে বাইক নিয়ে এসে বলা হচ্ছে বুলডোজার আসবে। আমাদের অপরাধ কী? আমরা কি এ দেশের নাগরিক নই?
এমন পরিস্থিতিতে মিনাখাঁ থেকে শুরু করে বহরমপুর- সর্বত্রই সংখ্যালঘু মহল্লাগুলোর বাসিন্দারা এখন ঘুমহীন রাত কাটাচ্ছেন। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক জয়ের নাম করে যেভাবে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ভাবাবেগ ও জীবনযাত্রাকে আক্রমণ করা হচ্ছে, তা বাংলার দীর্ঘদিনের লালিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত। এই অরাজকতা ও পেশিশক্তি প্রদর্শন বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে বলে তারা দাবি করেন।