পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের পরেও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হার না মানার তত্ত্বই হাজির করেছেন। হাজির করেছেন আসন লুটের তত্ত্ব। আর তাই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে অস্বীকার করেছেন। এর ফলে বরখাস্ত করার পথ তৈরি হলো বলে মনে করা হচ্ছে। মমতার পদত্যাগ না করায় বিষয়টি নিয়ে লোকভবনেও (রাজভবন) আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রথা অনুযায়ী, ফলাফল নিশ্চিত হলে মুখ্যমন্ত্রী গিয়ে পদত্যাগ করেন। হার-জিৎ নির্বিশেষে সরকারের মেয়াদ শেষের সময় মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী যদি জয়ী হন, তাহলে তিনি নতুন করে শপথ গ্রহণ করেন। তবে এই ক্ষেত্রে মমতা হেরে গিয়েছেন। তবে আইনজ্ঞদের মতে, যদি তিনি নিয়ম মেনে না চলেন, তাহলে সরকার বরখাস্ত করা ছাড়া রাজ্যপালের আর কোনো উপায় থাকবে না। এটাই হবে সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
ফলপ্রকাশের পরের দিন মঙ্গলবার কালীঘাটের দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ বৈঠক করে দাবি করেছেন, আমরা তো হারিনি। জোর করে, মিথ্যা বলে, অত্যাচার করে হারিয়েছে। গণনাকেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেয়া, ফরম ১৭-সি কেড়ে নেয়া হয়েছে। ওরা এমনি জিতলে আমার কিছু বলার থাকতো না। নির্বাচনে তো হার-জিৎ আছে। কিন্তু আমরা হারিনি। ইস্তফা কেন দেবো? লোকভবনে গিয়ে ইস্তফা দেবো না। কেউ যদি জোর করে ইস্তফা দিতে বলে, আমি বলবো- না, এটা হবে না।
নিজেকে মুক্তবিহঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন মমতা। বলেছেন, এতদিন আমি চেয়ারে ছিলাম। অনেক কিছু সহ্য করেছি। কিন্তু এখন আমি মুক্ত বিহঙ্গ। সাধারণ মানুষ। আর সহ্য করবো না। সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। আমি রাস্তার লোক। রাস্তায় ছিলাম, রাস্তায় থাকবো। তবে দলের আগামী দিনের রণকৌশল নিয়ে কিছু বলতে চান নি তিনি। কী হবে, কোন পথে এগোবেন তা আপাতত গোপন রাখতে চান মমতা। জানিয়েছেন, এখনই এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে কিছু বলবেন না। তবে তিনি বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের উপর ভরসা রাখছেন। আবার বিরোধী ঐক্যকে শক্তিশালী করার কথা ভাবছেন। ইন্ডিয়া জোটের শরিক নেতাদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। সকলে তাকে সহানুভূতি জানিয়েছেন।
মমতা নির্বাচন কমিশনকেই ‘ভিলেন’ বলে উল্লেখ করে দাবি করেন, কমিশনের সাহায্যে ১০০’র বেশি আসন লুট করা হয়েছে। মমতা বলেন, ওরা এমনি জিতলে আমার কোনো অভিযোগ থাকতো না। ভোটে হার-জিৎ থাকেই। কিন্তু তা তো হয়নি। আমরা হারিনি। ওরা ভোট লুট করেছে। বিজেপি’র কথায় কমিশন খেলেছে সরাসরি।
মমতা আরও বলেন, আমাদের এই লড়াই বিজেপি’র বিরুদ্ধে ছিল না। নির্বাচন কমিশন এখানে একটা কালো ইতিহাস তৈরি করলো। কমিশনই ভিলেন। তারা মানুষের অধিকার লুট করেছে। ভোটের আগে সব জায়গায় রেড করেছে। সব অফিসারদের বদলে দিয়েছে। বিজেপি আর কমিশনের মধ্যে বেটিং হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে তিনি দাবি করেন।
মমতা এই নির্বাচন পর্বকে ইতিহাসের ‘কালো অধ্যায়’ বলে চিহ্নিত করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, আমরা বাঘের মতো লড়াই করেছি। তবে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে, বাঁচার জন্য তার দলের কর্মীদের অনেকে বিজেপিতে যোগ দেবে। তিনি বলেন, গণনা শুরুর পর থেকে সংবাদমাধ্যমে বিজেপি ২০০’র বেশি আসন পেয়ে গিয়েছে দেখানোর পর বিভিন্ন জায়গায় হামলা শুরু হয়। তিনি বলেন, বিজেপি’র লোকজন গণনাকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে মারধর শুরু করে। এই প্রসঙ্গে ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোট গণনা যেখানে হচ্ছিল সেই সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ঘটনার উল্লেখ করেন তিনি। মমতা বলেন, ১৩ হাজার ভোটে আমি লিড করছিলাম। ৩২ হাজারের বেশি পাওয়ার কথা ছিল।
কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ে ওরা গণনাকেন্দ্রে ঢুকেছে। সব ভেঙে দিয়েছে। এটা শুনেই আমি গেলাম। তিনি বিস্ফোরক অভিযোগ করেন, গণনাকেন্দ্রের মধ্যে তাকে লাথি মারা হয়েছে, ধাক্কা দেয়া হয়েছে। সেই সময় সিসিটিভি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, মহিলা হিসেবে আমি অপমানিত। আমার সঙ্গেই এটা হলো, তা হলে অন্যদের কী ভাবে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে। দল কর্মীদের পাশে আছে। তার ঘোষণা, আমরা লড়াই চালিয়ে যাবো। ঘুরে দাঁড়াবো।