মধ্যপ্রাচ্যে টানা ৪০ দিন পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গতকাল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই দেশ। এর পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানে পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইরান এই যুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের দাবি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেওয়া ইসরায়েল ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানালেও লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে রাশিয়া বলছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত পরাজয় হয়েছে। এদিকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও বন্ধ হয়নি পাল্টাপাল্টি হামলা। গতকালও ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
জবাবে তেল আবিব ও জেরুজালেম লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। গতকাল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য একটি শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চলাকালে হারমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারবে। এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। গতকাল ভোরে তিনি ঘোষণা দেন, তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতিতে কঠোর শর্ত আরোপ করেছে দুই দেশ। ফলে একে নাজুক সমঝোতা বলছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে বলা হয়েছে, ইরানকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, আমাদের হাতের আঙুল এখনো ট্রিগারে রয়েছে। শত্রুর সামান্যতম ভুল বা বিচ্যুতির মোক্ষম জবাব দেওয়া হবে পূর্ণ শক্তি দিয়ে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, এই চুক্তি লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য উত্তপ্ত অঞ্চলেও কার্যকর হবে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল এক এক্স পোস্টে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, উভয় দেশ যে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেছে, আমি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাই। এই উচ্চপর্যায়ের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষই অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করেছে।
যুদ্ধবিরতির পর নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত বিধ্বংসী হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিতে রাজি হয়েছি। দুই পক্ষের মধ্যে একটি উভয়মুখী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে এই স্থগিতাদেশের প্রধান শর্ত হচ্ছে- ইরানকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া ১০ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।
অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির পরপরই ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সরাসরি অনুমোদনেই এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে। এই দুই সপ্তাহের সাময়িক বিরতির পর একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে পরবর্তী দফার আলোচনা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যদি যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর আত্মসমর্পণ আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক অর্জনে রূপ নেয়, তবে আমরা এই ঐতিহাসিক বিজয় একসঙ্গে উদ্যাপন করব। অন্যথায় ইরানি জাতির সব দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা পুনরায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই চালিয়ে যাব। এর পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানান, আগামী দুই সপ্তাহ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত সম্ভব হবে।
তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে এবং কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেও লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে রাজি নন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি জানান, ইসরায়েল দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের বিরুদ্ধে হামলা স্থগিত করার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। তবে শর্ত হলো- ইরান অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর তেহরান সব ধরনের হামলা বন্ধ করবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। যদিও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এদিকে যুদ্ধবিরতির মাঝেও পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও ইরান। গতকাল সকালে ইরানে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)। জবাবে ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিব ও জেরুজালেমে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
আগামীকাল ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা : ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতির মাঝেই একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি করতে আগামীকাল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এসব প্রস্তাবে ইরান কেবল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে বলা হয়েছে- হরমুজ প্রণালির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইরানের হাতে; মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহার; হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতিদের ওপর হামলা বন্ধ করা; সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত দেওয়া; যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং শান্তিচুক্তির আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা প্রদান, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ চুক্তি থেকে সরে যেতে না পারে। ইরানের এসব প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘বিরোধের প্রায় সব বিষয়ে’ একমত হয়েছে এবং এই দুই সপ্তাহের সময়সীমা চুক্তিটিকে ‘চূড়ান্ত ও কার্যকর’ করার সুযোগ দেবে।
ইরানে ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জন হয়েছে, ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জন করেছে। এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একটি চুক্তির আওতায় ইরানের সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের ‘ঠিকঠাক দেখভাল’ করা হবে।
ট্রুথ স্যোশালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে আর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে মিলে মাটির গভীরে চাপা পড়া সব পারমাণবিক বর্জ্য বা উপাদান খনন করে সরিয়ে ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে এবং চুক্তি হলে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।
যুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের দাবি ইরানের : যুদ্ধে নিজেদের ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের দাবি করেছে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল। গতকাল এক বিবৃতিতে বলা হয়, আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগেই ১০ দফার একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে বাধ্য করেছে ইরান। এতে ভবিষ্যতে আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, অঞ্চলটি থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা এবং ক্ষতিপূরণের কথাও বলা হয়েছে। ওই আলোচনায় চুক্তি চূড়ান্ত করার দিকে অধিক মনোযোগ দেওয়া হবে। তবে এর অর্থ এটা নয় যে, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে, রাশিয়া : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। তিনি বলেন, আরও আক্রমণাত্মক হওয়া, আরও আগ্রাসী হওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও সক্রিয় থাকা এবং ‘জয়’ খুব কাছেই- এই ধরনের যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছিল, সেই অবস্থান আবারও চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
সেনাদের গুলি বন্ধের নির্দেশ ইরানের সর্বোচ্চ নেতার : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির সামরিক বাহিনীকে গুলি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়; শত্রুপক্ষ একটু ভুল করলেই জোরালো জবাব দেওয়া হবে। গতকাল এক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা জানান, এটি যুদ্ধের শেষ নয়, তবে সব সামরিক শাখাকে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ মেনে গুলি বন্ধ করতে হবে।
যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা : মধ্যপ্রাচ্যে টানা ৪০ দিন সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। গতকাল জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, বেসামরিক মানুষদের জীবন রক্ষা ও মানবিক দুর্ভোগ কমাতে অবিলম্বে সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ করা প্রয়োজন। ক্রেমলিনের (রাশিয়া) মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রাশিয়া আশা করে শান্তি আলোচনা অব্যাহত রাখতে আগামী দিনগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করবে।
এ ছাড়া যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে জাপান, ইরাক, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড।