Image description
যু দ্ধ বি র তি

নানা নাটকীয়তার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে আপাতত যুদ্ধের দামামা কিছুটা স্তমিত হয়েছে। সব পক্ষ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ায় এই তিন দেশে স্বস্তি নেমে আসে। মঙ্গলবার রাতভর নানা উৎকণ্ঠার পর বুধবার সকালে আসে এই স্বস্তির খবর। এর আগে ‘ইরানকে নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার এই হুমকির পর অনেক বিশেষজ্ঞ পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেন এবং আগাম যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে সতর্ক করেন। তবে শেষমেষ পাকিস্তানের প্রচেষ্টায় যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। পরে ইসরাইলও যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়ার কথা জানায়। আপাতত যুদ্ধবিরতির খবরে কিছুটা স্বস্তি মিললেও শঙ্কা রয়ে গেছে। এখনো চূড়ান্ত কোনো আলোচনা হয়নি। এ ছাড়া ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি মানেই যুদ্ধ শেষ নয়। তাদের দাবি চূড়ান্ত না হলে ফের যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়েছে তেহরান। যদিও এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এ বিষয়ে একটি আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই নিজেদের পূর্ণাঙ্গ ও ঐতিহাসিক বিজয় দাবি করেছে। তবে ইরান সতর্ক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। বুধবার দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বলেছে, যুদ্ধে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে ইরান। একই সঙ্গে তারা ১০ দফা প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রকে। এই ১০ দফা প্রস্তাবের মধ্যে আসলেই এমন সব প্রস্তাব আছে যা ইরানের বিজয় নিশ্চিত করে। এর মধ্যে আছে কোনো আগ্রাসন চালানো হবে না ইরানের বিরুদ্ধে এর নিশ্চয়তা দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইরানের হাতে। সব নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব বাহিনীকে প্রত্যাহার করে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এই দাবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মেনে নেয়া কঠিন। যদি যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি মেনে নেয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, যুদ্ধে তারা হেরে গেছে। এমনিতেই নৈতিকভাবে বলা যায়, এ যুদ্ধে তারা বড় কিছু অর্জন করতে পারেনি।

পক্ষান্তরে মধ্যপ্রাচ্য সহ সারাবিশ্ব উত্তাল, এলোমেলো হয়ে পড়েছে। তবু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ বিজয় অর্জনের দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ এবং পরিপূর্ণ বিজয়। শতভাগ। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। ওদিকে হোয়াইট হাউসে তার প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় দাবি করেছেন। ইরান তার ১০ দফা প্রস্তাবে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিন্তু ওই প্রস্তাবে লেবাননের উপস্থিতি মানছে না ইসরাইল।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের পরিকল্পনা পাঠায়। সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে এসব নীতিকে মেনে নেয় ওয়াশিংটন। তারা জানায়, এরপর দুই পক্ষের মধ্যে ১৫ দিন আলোচনা হবে। এর সময় বাড়তেও পারে। তারা আরও বলেছে, কোনো চুক্তি হতে হলে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক মেকানিজমের মধ্যদিয়ে। এর অর্থ এই নয় যে, যুদ্ধ শেষ। যদি দাবি পুরোপুরি মেনে নেয়া না হয়, তাহলে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে ইরান। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানি বাহিনী এবং তাদের মিত্র গ্রুপগুলো ওই অঞ্চলে শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। ফলে তাদেরকে যুদ্ধবিরতিতে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। তারা সমঝোতা প্রক্রিয়ার এই সময়টাতে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে। যদি এ সময়ে কোনো ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ নেয় শত্রুপক্ষ তাহলে তার জবাব দেয়া হবে শক্তি ব্যবহার করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বোমা হামলা স্থগিত করে একে দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি বলে অভিহিত করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবকে আলোচনার জন্য কার্যকর ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এই বিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য সময় দেবে। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে, এবং তাদের অনুরোধে- যাতে মঙ্গলবার রাতে ইরানের বিরুদ্ধে পাঠানো ধ্বংসাত্মক শক্তি থামিয়ে রাখা হয় এবং শর্ত থাকে যে, ইরান হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক ও নিরাপদভাবে খুলে দেবে- আমি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে বোমাবর্ষণ ও হামলা স্থগিত করতে সম্মত হচ্ছি। এটি হবে দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রায় সব বিরোধপূর্ণ বিষয়েই সমঝোতা হয়েছে। তিনি যোগ করেন, আমরা ইতিমধ্যে আমাদের সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছি এবং ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছি। আমরা ইরানের কাছ থেকে ১০ দফা প্রস্তাব পেয়েছি, যা আলোচনার জন্য কার্যকর ভিত্তি। এএফপিকে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘সম্পূর্ণ ও নিঃশর্ত বিজয়’ অর্জন করেছে। তিনি বলেন, ১০০ শতাংশ বিজয়। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ইরান চুক্তি ভঙ্গ করলে তিনি আগের মতো বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করবেন কিনা, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। ওদিকে যুদ্ধবিরতি হওয়ায় নিজেদের বিজয় দাবি করে ইরানের রাজধানী তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারে উল্লাসে ফেটে পড়ছেন ইরানিরা। তাদের হাতে দেশের জাতীয় পতাকা। শরীর মোড়ানো জাতীয় পতাকায়।

যুদ্ধে নিহতের পরিসংখ্যান: টানা ৪০ দিন যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে সব দেশ। ২৮শে ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধের সূচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। পরে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা ও ঘাঁটিতে হামলা চালায় দেশটি। এই যুদ্ধে বহু হতাহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নাগরিক হারিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানায়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে মোট ৩ হাজার ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক রেডক্রস এবং রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৯০০ জন।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২রা মার্চ থেকে ইসরাইলি হামলায় দেশটিতে ১ হাজার ৫৩০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১২৯ শিশু রয়েছে। সংকট শুরুর পর থেকে ইরাকে অন্তত ১১৭ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ইসরাইলের এম্বুলেন্স পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও লেবানন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেশটিতে মোট ২৩ জন নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের ১১ জন সেনা নিহত হয়েছেন। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ১৩ জন সেনা নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হয়েছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এই তথ্য জানিয়েছে।

দুজন সেনাসহ মোট ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ। কাতারের জলসীমায় গত ২২শে মার্চ ‘নিয়মিত দায়িত্ব পালনের’ সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে সাতজন নিহত হয়েছেন। কুয়েতে নিহত হয়েছেন সাতজন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে চারজন ফিলিস্তিনি নারী নিহত হয়েছেন। সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের শহর সুয়েইদায় একটি ভবনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে চারজন নিহত হন। বাহরাইনে ইরানের দু’টি পৃথক হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। ওমানের সোহর প্রদেশের একটি শিল্পাঞ্চলে গত ১৩ই মার্চ ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত আল-খারজ শহরের একটি আবাসিক এলাকায় নিক্ষিপ্ত গোলার আঘাতে দুজন নিহত হয়েছেন। উত্তর ইরাকে ড্রোন হামলায় একজন ফরাসি সেনা নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গত ৩রা এপ্রিল জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে থাকা ছয় বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা অব্যাহত: ইরানে হামলা বন্ধে রাজি হলেও লেবাননের বিষয়ে রাজি হয়নি ইসরাইল। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা অব্যাহত রেখেছে দেশটি। বুধবার দখলদারদের হামলায় অন্তত ৮ জন নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। বলেছে হামলা হলেও তারা যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতির আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার ইসরাইলের ৫২টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের তায়ির শহরের বাসিন্দাদের অবিলম্বে শহরটি খালি করার নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী।

ইসরাইলের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয়, ব্যর্থ নেতানিয়াহু: ইসরাইলের বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, ইরানে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত ইসরাইলের জন্য একটি রাজনৈতিক বিপর্যয়। এক্ষেত্রে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘ব্যর্থ’ হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির প্রতিক্রিয়ায় বুধবার ইয়ার লাপিদ এমন মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অন্যতম মূল ইস্যু ইরান। অথচ যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ইসরাইল আলোচনার টেবিলেই ছিল না।

শুক্রবার ইসলামাবাদে আলোচনা: ইরানের দেয়া ১০ দফা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আগামী শুক্রবার (১০ই এপ্রিল) আলোচনা শুরুর কথা রয়েছে। এক বিবৃতিতে ইরান জানিয়েছে, ওই আলোচনায় চুক্তি চূড়ান্ত করার দিকে অধিক মনোযোগ দেয়া হবে। তবে এর অর্থ এটা নয় যে, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।

যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ প্রণালিতে টোল নেবে ইরান-ওমান: যুদ্ধবিরতি চলার সময় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি (টোল) নেয়ার পরিকল্পনা করেছে ইরান ও ওমান। ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের খবরে বলা হয়েছে, এই তহবিলের অর্থ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে খরচ করা হবে।