১৯৯৯ সালে তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী বিধবা ফাতিমা নেদাই যখন তার সন্তানদের নিয়ে ইরান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন আত্মীয়স্বজন সবাই তার বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু ফাতিমা চেয়েছিলেন তার সন্তানরা এক ‘মুক্ত ও নিরাপদ’ দেশে বড় হোক। সেই গন্তব্য ছিল দুবাই। তখন দুবাই আজকের মতো আকাশচুম্বী অট্টালিকার শহর ছিল না; ছিল মরুভূমি আর ধুলোবালি ঘেরা এক বর্ধিষ্ণু নগরী। ফাতিমার ছেলে মোহাম্মদ তখন ১৫ বছরের কিশোর। চোখের সামনে তারা দুবাইকে পাল্টে যেতে দেখেছেন। ফুটবল খেলার মাঠের জায়গায় তৈরি হয়েছে বিশ্বের উচ্চতম ভবন বুর্জ খলিফা। কিন্তু আজ সেই চেনা দুবাই মোহাম্মদের কাছে অচেনা হয়ে উঠছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্র এখন দুবাইয়ের আকাশেও হানা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান যখন আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, তখন দুবাইয়ের শান্ত আকাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুন লেগেছে ফেয়ারমন্ট দ্য পাম এবং বুর্জ আল আরবের মতো বিলাসবহুল হোটেলে। মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম বন্দর জেবেল আলীর কাছেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
মোহাম্মদের কাছে এই দৃশ্যগুলো শৈশবের ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। তিনি বলেন, ‘আমি সেই শব্দগুলো ভুলিনি, আমি বোমা হামলা ভুলিনি। আমি এখনও স্তব্ধ।’ তিন সপ্তাহের এই লড়াইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্য করে ইরান ১৯০০-এর বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। গত ১৬ মার্চ দুবাই বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি ট্যাঙ্কেও ড্রোন হামলা হয়েছে।
আমিরাতে ইরানি হামলার ফাইল ছবি: এপি
দুবাই মানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের ঝকঝকে ছবি, কৃত্রিম দ্বীপ বা মঙ্গল অভিযান। চলতি বছর ইলন মাস্কের বোরিং কোম্পানির সঙ্গে মিলে তারা পাতালপথে উচ্চগতির যাতায়াত ব্যবস্থা ‘দুবাই লুপ’ তৈরির কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে দুবাই মূলত টিকে আছে লাখ লাখ অভিবাসীর পরিশ্রমে। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, দুবাইয়ের ৩০ লাখ জনসংখ্যার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ স্থানীয় আমিরাতি; বাকি সবাই বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন ও মিসরসহ ২০০টি দেশের নাগরিক।
দুবাইয়ের বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের পেছনে ইরানি বণিকদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই তারা এখানে ব্যবসা করছেন। এমনকি ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে দুবাই হয়ে উঠেছিল তেহরানের অর্থনীতির জন্য এক ‘সেফটি ভালভ’ বা বিকল্প পথ। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ সেই দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও আত্মিক সম্পর্ককে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন দুবাইয়ে বসবাস মানেই ছিল এক অনিশ্চয়তা; চাকরি গেলে দেশ ছাড়তে হবে। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে প্রবর্তিত ‘গোল্ডেন ভিসা’ এই ব্যবস্থার পরিবর্তন এনেছিল। এটি পেশাজীবী ও বিনিয়োগকারীদের ৫ থেকে ১০ বছর থাকার নিশ্চয়তা দেয়। যখন যুদ্ধের ডামাডোল শুরু হলো, হাজার হাজার মানুষ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। বিমানের টিকিটের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ গুণ বেড়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে ওমান বা সৌদি আরবের দিকে সড়কপথে পাড়ি দিচ্ছেন।
আমিরাতি তেল স্থাপনায় ইরানের হামলা। ফাইল ছবি: এপি
তবুও অনেকে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাকিস্তানের তাজিন জাফরি বা ইরানের মোহাম্মদের কাছে দুবাই কেবল কর্মস্থল নয়, এটিই তাদের ঘর। মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি যদি এখন ইরানে ফিরে যাই, তবে নিজেকে বিদেশি মনে হবে। আমার বন্ধু, নেটওয়ার্ক, স্মৃতি সবই তো এখানে।’
দুবাইয়ের মূল শক্তি তার স্থিতিশীলতা। কিন্তু ড্রোন যখন দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স সেন্টারের কাছে আছড়ে পড়ে, তখন সেই আস্থায় ফাটল ধরে। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর অর্থনীতিবিদ ফারুক সুসার মতে, এই সংঘাত চলতে থাকলে আমিরাতের অর্থনীতি ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিলে হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারাবে।
বর্তমানে দুবাই সরকার জনগণের মনোবল বাড়াতে মিরাকল গার্ডেনের মতো দর্শনীয় স্থানে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবার জন্য হটলাইন চালু করেছে। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে এখন তুমুল আলোচনা, ওমান যাওয়ার কোন রাস্তাটি খোলা আছে? অথবা ভবনের ওপর ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়লে কী করতে হবে? এক আফ্রিকান দোকানদার যেমন বলছিলেন, ‘দুবাই আক্রান্ত হলেও এখনও এটি অনেক দেশের চেয়ে নিরাপদ।’ এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই টিকে আছে অভিবাসীদের শহর দুবাই, যদিও তার ভবিষ্যৎ এখন কুয়াশাচ্ছন্ন।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্কার