যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে শুমার লিখেছেন, “আর না, অনেক হয়েছে। এবার এই যুদ্ধ থামান।” নিউইয়র্কের এই আইনপ্রণেতা আরও বলেন, “এমনকি খোদ রিপাবলিকান সিনেটররাও প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে প্রশাসন আসলে কী অর্জন করতে চাইছে, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণাই নেই।”
এর আগে ‘এক্স’-এ অন্য একটি পোস্টে শুমার উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে শত শত কোটি ডলার “জলে যাচ্ছে”। এর ফলে প্রতি গ্যালন (প্রায় ৪.৫ লিটার) জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে এখন গড়ে ৩.৯৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তটি কংগ্রেসের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও কংগ্রেস এখন তাঁর দলেরই নিয়ন্ত্রণে। রিপাবলিকানরা মূলত প্রেসিডেন্টের পাশেই রয়েছেন, তবে শীঘ্রই তাঁদের যুদ্ধের বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে।
‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ৬০ দিন পর্যন্ত সামরিক অভিযান চালাতে পারেন। এখন পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা সামরিক অভিযান বন্ধে যেসব প্রস্তাব এনেছিল, রিপাবলিকানরা সহজেই ভোটের মাধ্যমে সেগুলো নাকচ করে দিয়েছেন।
তবে আইনপ্রণেতারা বলছেন, প্রশাসনকে সামনে আরও সুর্নিদিষ্ট ও বিস্তারিত কৌশল দেখাতে হবে, অন্যথায় কংগ্রেসের তোপের মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই চাপ আসছে, যখন তাঁদের কাছে যুদ্ধের জন্য নতুন করে শত শত কোটি ডলারের অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্পের একটি মন্তব্য—যুদ্ধ তখনই থামবে “যখন আমি আমার হাড়ে হাড়ে টের পাব (বা মন থেকে অনুভব করব)”—বেশ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট ও ভার্জিনিয়ার সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার এ নিয়ে বলেন, “তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেলে যুদ্ধ থামাবেন? এ তো পাগলামি!”
হাউস স্পিকারের দাবি: অভিযানের লক্ষ্য ‘প্রায় অর্জিত’
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও প্রেসিডেন্টের নিজ দলের সদস্যরা তাঁকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবেন বলে মনে হচ্ছে না। হাউস স্পিকার মাইক জনসন বলেছেন, সামরিক অভিযান শিগগিরই শেষ হবে। চলতি সপ্তাহে ক্যাপিটলে এপি ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমি মনে করি, আমাদের মূল লক্ষ্য এখন কার্যত অর্জিত হয়ে গেছে।” তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও এর উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং তাদের নৌবাহিনীকে অকেজো করে দেওয়া। এসব উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে।”
জনসন স্বীকার করেন যে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের ওপর ইরানের হুমকি দেওয়ার সক্ষমতার কারণে যুদ্ধটা “সামান্য দীর্ঘায়িত” হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা প্রেসিডেন্টের সাহায্যের অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। জনসন বলেন, “পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করে আনতে পারলেই, আমার মনে হয় কাজ শেষ।”
তবে প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো—যেমন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সক্ষমতা নস্যাৎ করা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার কমিয়ে আনা—আইনপ্রণেতাদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। তাঁদের কাছে এই লক্ষ্যগুলো পরিবর্তনশীল ও অস্পষ্ট মনে হচ্ছে। ওয়ার্নার বলেন, “সরকার পরিবর্তন? সম্ভব নয়। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা? স্থলবাহিনী নামানো ছাড়া সেটাও সম্ভব নয়।” তিনি আরও বলেন, “আমি যদি প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দিতাম, তবে বলতাম: নিজের ইচ্ছায় কোনো যুদ্ধে জড়ানোর আগে আমেরিকার জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন আমাদের লক্ষ্যগুলো আসলে কী।”
পেন্টাগন হোয়াইট হাউসকে জানিয়েছে যে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন—যা একটি বিশাল অঙ্ক এবং এর সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সিনেট ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক শুমার এই চাহিদাকে “অযৌক্তিক” বলে অভিহিত করেছেন।
চলতি বছর কংগ্রেস থেকে প্রতিরক্ষা বিভাগের জন্য ৮০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে। এছাড়া ট্রাম্পের কর ছাড়ের বিলের মাধ্যমে পেন্টাগন আগামী কয়েক বছরে বিভিন্ন আপগ্রেড ও প্রকল্পের জন্য আরও ১৫০ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। হাওয়াইয়ের সিনেটর মাজি হিরোনো বলেন, দেশের অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক খাত রয়েছে। গত বছরের রিপাবলিকান কর হ্রাসের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমে যে কাটছাঁট করা হয়েছিল, সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “মেডিকেডের তহবিল কেড়ে না নিলে কেমন হয়? কিংবা স্ন্যাপ কর্মসূচির অর্থায়ন নিশ্চিত করলে কেমন হয়, যা লাখ লাখ মানুষের উপকারে আসে?”
তিনি বলেন, “আমেরিকান জনগণের জন্য আমাদের এসব কাজই করা উচিত।” অনেক আইনপ্রণেতা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করছেন। বুশ তখন আফগানিস্তান এবং পরবর্তীতে ইরাকে সামরিক অভিযানের জন্য কংগ্রেসের কাছে গিয়ে অনুমোদনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সিনেটর টিলিস বলেন, ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’-এর আওতায় সামরিক অভিযান চালানোর এখতিয়ার ট্রাম্পের আছে, তবে সেই সুযোগ শীঘ্রই শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, “যখন যুদ্ধের ৪৫ দিন পার হয়ে যাবে, তখন আপনাকে দুটির মধ্যে যেকোনো একটি বিষয় স্পষ্ট করতে হবে—হয় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া, অথবা যুদ্ধ থেকে সরে আসার একটি পরিষ্কার পথ বা ‘এক্সিট প্ল্যান’ ঠিক করা।” “প্রশাসনকে আসলে এই বিকল্পগুলো নিয়েই এখন ভাবতে হবে,” যোগ করেন তিনি।
সূত্র : আল জাজিরা ও দা গার্ডিয়ান