Image description

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি প্রাণ হারানোর পর নতুন নেতা বেছে নিতে তেহরানে শুরু হয় সপ্তাহব্যাপী এক বিস্ময়কর লড়াই। রক্ষণশীল বিপ্লবী গার্ডসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন মধ্যপন্থীরা। শেষ পর্যন্ত জেনারেলরাই জয়ী হন, তবে তাদের পছন্দের প্রার্থীর চূড়ান্ত মনোনয়ন পড়েছিল প্রচণ্ড বাধার মুখে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির উত্থানটি বাইরে থেকে সহজ এবং পূর্বনির্ধারিত বলে অনেকের মনে হতে পারে।

তবে বিষয়টি কেন্দ্র করে ক্ষমতার অন্দরমহলে চলেছে তীব্র টানাপড়েন। 

 

মোজতবাকে সর্বোচ্চ নেতা বানানোর প্রক্রিয়াটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য ছিল অনেকটা ‘গেম অব থ্রোনস’-এর মতো। টানটান উত্তেজনাপূর্ণ এই লড়াইয়ে সবার সামনে ছিল একটি খালি সিংহাসন। এর উত্তরাধিকার মনোনয়নে আলেমদের একটি পরিষদ দ্বিধাবিভক্ত, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক জেনারেলরা মরিয়া, আর ইরানের প্রভাবশালী দুই বংশ- খামেনি ও খোমেনিরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত।

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সর্বশক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতার মাঠে নেমেছিলেন, সামরিক কমান্ডাররা নিজেদের প্রভাব রক্ষায় সক্রিয়, এমনকি সাবেক গুপ্তচর প্রধানও নিজের পছন্দ চাপিয়ে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে যদি এখন সুসময়ও চলত তাহলেও তাদের পক্ষে তৃতীয়বারের সর্বোচ্চ নেতাকে খুঁজে বের করার কাজ সহজ হতো না। কারণ তাদের এমন একজন নেতা নির্বাচন করতে হতো- যিনি শুধু সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হবেন না; বরং দেশের রাজনীতি ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপরেও প্রভাব বজায় রাখার মতো ক্ষমতাবান হতে হবে। সদ্য প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন।

তিনি ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রয়োগের পরেও কয়েক দশকে নানামুখী অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে ইরান। 

 

আলি খামেনির মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের মাঝে ইরানের ক্ষমতার অন্দরমহল এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। আকাশ থেকে বোমায় মাটি যখন কাঁপছিল, তখন আলি খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের ইস্যু আরেক যুদ্ধের সূচনা ঘটায়। 

আয়াতুল্লাহর নিভৃতচারী ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মোজতবা আলি খামেনির ক্ষমতারোহন ঘিরে প্রায় এক সপ্তা ধরে চলে অন্তর্দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার খেলা ও নানামুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। পাঁচজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা, দুজন আলেম, সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত দুজন ইরানি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের তিন সদস্যের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নাটকীয় বিবরণ তুলে ধরেছে নিউইয়র্ক টাইমস।

নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের নাম প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি। 

 

সব দিক বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, আলি খামেনির স্বাভাবিক জীবনাবসান ঘটলে হয়ত তার ছেলে মোজতবা খামেনি উত্তরসূরি নির্বাচিত হতে না। এমনকি আয়াতুল্লাহ খামেনি ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের কাছে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তিন জনের নাম বলে গিয়েছিলেন। সেই তালিকাতেও মোজতবার নাম ছিল না।

নতুন নেতা নির্বাচনে গোপন বৈঠক

সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগের জন্য ইরানে সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেমের একটি পরিষদ রয়েছে। ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নামের ওই পরিষদ ৩ মার্চ একটি গোপন ভার্চুয়াল বৈঠক করে। নিয়ম অনুযায়ী যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো প্রার্থী দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন লাভ করতে না পারবেন ততক্ষণ পর্যন্ত এই বৈঠক চলার কথা। 

ভার্চুয়াল আলোচনা শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েল কুম শহরে পরিষদের সদর দপ্তরে বিমান হামলা চালায়। এই শহরটিতে অনেক আলেমের বসবাস এবং তারা শিয়া মাদ্রাসায় পড়ান। হামলায় পরিষদের কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মী নিহত হন।

নিউইয়র্ক টাইমসকে তথ্য দেয়া কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধের প্রথম দিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হন। এর পর থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং গার্ডস কর্পসের জেনারেলরা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে রাখার লড়াই শুরু করেন। নিজেদের ক্ষমতার প্রভাব নিশ্চিত করতে তারা নানা কৌশল নিতে থাকেন। 

কট্টরপন্থী জেনারেলরা শাসনব্যবস্থা নমনীয় করার আহ্বানের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন। তারা সবাই আলি খামেনির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি আরো কঠোর করার পক্ষে। অন্যদিকে মধ্যপন্থী গোষ্ঠীর যুক্তি ছিল- নতুন মুখ, নতুন শাসনশৈলী এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতা বন্ধ করা প্রয়োজন।

মোজতবা খামেনির পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন রেভল্যুশনারি গার্ডস এবং তাদের নতুন প্রধান কমান্ডার জেনারেল আহমদ ভাহিদি, যুদ্ধে গার্ডসের কৌশল নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা জেনারেল মোহাম্মদ আলি আজিজ জাফারি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার ও সাবেক গার্ডস কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। গার্ডসের গোয়েন্দা ইউনিটের সাবেক প্রধান ও দেশের বাইরে বিভিন্ন অপারেশনের পরিকল্পনার মূল ব্যক্তি হোসেইন তায়েবও ছিলেন এই শিবিরে।

তবে অপ্রত্যাশিত কিছু জায়গা থেকে মোজতবা খামেনির বিরোধিতা উঠতে শুরু করে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান এবং বর্তমানে কার্যত দেশের শাসক আলি লারিজানি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের কয়েকজন সদস্যকে বলেন, দেশের জন্য একজন মধ্যপন্থী ও ঐক্য গড়তে সক্ষম নেতা দরকার। মোজতবা নির্বাচিত হলে বিভাজন তৈরি করতে পারেন। মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও আলেম লারিজানির সঙ্গে যোগ দেন।

মধ্যপন্থী শিবির সম্ভাব্য দুই প্রার্থীকে সামনে নিয়ে আসে। তারা হলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি। তাদের মধ্যে হাসান রুহানি ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির আলোচনার নেতৃত্ব দেন। মধ্যপন্থী পরিচয়ের কারণে বর্তমানে কিছুটা কোণঠাসা আছেন। আর হাসান খোমেনি সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। মধ্যপন্থীরা আপসের জন্য আলিরেজা আরাফির নামও প্রস্তাব করেন। তিনি ইরানে একজন পণ্ডিত ও আইনজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। তার ধর্মীয় যোগ্যতা বেশ শক্তিশালী, তবে নীতি বা সামরিক মহলে তেমন প্রভাব নেই। এ কারণে তাকে পরিচালনা করা সহজ হবে বলে ভেবেছিলেন মধ্যপন্থীরা।

শীর্ষ প্রার্থীদের নিয়ে পরিষদে আলোচনা ঘুরপাক খেতে থাকে। তবে ডনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর প্রচণ্ড ক্ষোভ মধ্যপন্থীদের উদ্যোগকে দুর্বল করে দেয়। পরিষদের বেশিরভাগ সদস্য এমন এক নেতা নির্বাচনের পক্ষে মত দেন যিনি আলি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে সক্ষম।

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিষদের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ মাহমুদ রাজাবি বলেন, ‘প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য আমরা সাতটি মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়েছিলাম। কোনো নেতার সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি খুব শক্ত ছিল, কারো ধর্মীয় যোগ্যতা বেশি ছিল, কারো ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ছিল শক্তিশালী, আবার কারো ছিল প্রজ্ঞা।’

তিনি জানান, পরিষদ পাঁচ বা ছয়বার সরাসরি বৈঠকে বসার চেষ্টা করে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে সেগুলো বাতিল করা হয়।

৩ মার্চ ভোটের প্রাথমিক পর্যায়েই মোজতবা খামেনি প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পেয়ে যান। এতে বোঝা যায় গার্ডস কর্পসের জেনারেলরা প্রাধান্য অর্জন করেছেন। এরপর অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস বিষয়টি সরকারি কর্মকর্তাদের অবহিত করে। আর তারা রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমকে ৪ মার্চ ভোরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করার বিষয়টি প্রচারের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দেন। তবে সেটা ছিল অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের সূচনাপর্ব মাত্র। 

ক্ষমতার খেলা

লারিজানি হঠাৎ করে মোজতবা খামেনির ক্ষমতায় আরোহনের ঘোষণা স্থগিত করেন। তিনি বলেন, এমন ঘোষণা দেয়া হলে মোজতবার জীবনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ আলি খামেনির যেকোনো উত্তরসূরিকে নির্মূলের হুমকি দিয়েছিলেন। লারিজানি প্রস্তাব দেন, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।

ইসরায়েল ৬ মার্চ সেই হুমকি কার্যকর করার প্রমাণ দেয়। তারা তেহরানের কেন্দ্রস্থলে সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডে বাঙ্কারভেদী বোমা হামলা চালায়। এতে স্থাপনাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তবে মোজতবা খামেনি সেখানে ছিলেন না।

নেতা নির্বাচিত হওয়ার ঘোষণা স্থগিত হওয়ায় মধ্যপন্থী শিবিরের সামনে আরেকটি চেষ্টা চালানোর সুযোগ তৈরি হয়। তারা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য চাপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে নতুন নির্বাচনে যেতে বাধ্য করার জন্য শক্ত কারণ দরকার ছিল।

প্রয়াত আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন লারিজানি যুক্তি দেন, মোজতবার পক্ষে আয়োজিত ভার্চুয়াল ভোটটি অবৈধ। সংবিধান অনুযায়ী পরিষদের সদস্যদের সরাসরি উপস্থিত থেকে ভোট দিতে হয়। এরপর পরিষদকে জানানো হয়, যুদ্ধের প্রথম দিনে বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনি নিজেই পদটি নিতে অনাগ্রহ জানিয়েছিলেন। এছাড়া নিরাপত্তাজনিত কারণে তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করাও সম্ভব নয়।

তবে মোজতবার পক্ষের শিবির জানায়, পদটি নিতে অস্বীকৃতিও ক্ষমতায় আরোহণের একটি আনুষ্ঠানিকতার অংশ।

তেহরান থেকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ রাজনীতিক আবদোলরেজা দাভারি বলেন, “মোজতবাকে যথন জানানো হয় তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এ দায়িত্ব নিতে চাই না, অন্য কাউকে বেছে নিন।’ শিয়া আলেমদের মধ্যে এটি ভদ্রতার একটি সাধারণ রেওয়াজ। শুরুতে তারা বলেন ‘আমি ক্ষমতার পেছনে ছুটছি না’, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সেটি গ্রহণ করেন।”

এরপর মধ্যপন্থী শিবিরের সদস্যরা আরেকটি কৌশল নেন। পরিষদকে তারা জানান, আয়াতুল্লাহ আরি খামেনির একটি নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা খুঁজে পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে তারা পরিষদের নেতৃত্বে থাকা বোর্ডের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসার অনুরোধ জানান। 

সেই বৈঠকে আলি খামেনির দুজন ঘনিষ্ঠ সহকারী গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা এবং অন্যজন তার চিফ অব স্টাফ আসগর হেজাজি। আলি খামেনির ইচ্ছার বরাত দিয়ে তারা জানান, প্রয়াত নেতা বলেছিলেন- তিনি চান না তার ছেলে বা পরিবারের কেউ তার উত্তরসূরি হোক।

সাক্ষ্যে দুই কর্মকর্তা আরো বলেন, আলি খামেনি বংশগত উত্তরাধিকার নিষিদ্ধ করেছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন বংশগত উত্তরাধিকার ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের মূল চেতনাকে লঙ্ঘন করে। ওই বিপ্লবের মাধ্যমেই ইরানে রাজতান্ত্রিক শাসনের উৎখাত হয়। বৈঠকে দুই কর্মকর্তা একই বার্তাসংবলিত একটি লিখিত উইলও উপস্থাপন করেন। এর ভিত্তিতে তারা পরিষদকে প্রাথমিক ভোট বাতিল করার আহ্বান জানান।

তবে শেষ মুহূর্তে পরিষদের সিদ্ধান্ত পাল্টানোর এই চেষ্টা বৈঠকে উপস্থিত আলেমদের বিস্মিত করে। তারা বড় পরিসরে পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য সময় চান। বিষয়টি মোজতবা খামেনির পক্ষের জেনারেলদেরও উদ্বিগ্ন করে তোলে। তারা এর বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন।

পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলি মোয়ালেমি এক ভিডিও ভাষণে মধ্যপন্থীদের উদ্যোগকে অভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা করে নিন্দা জানান।

আয়াতুল্লাহ মোয়ালেমি বলেন, ‘পরিষদের সদস্যদের মনোভাব পরিবর্তন করা এবং আমাদের অন্য দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিষদের বাইরে থেকেও কিছু ব্যক্তি কাজ করছেন। তাদের উদ্দেশ্য আমাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে মনোভাব প্রভাবিত করা।’

জেনারেলরা ছিলেন মরিয়া

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ৭ মার্চ ঘোষণা দেন, ইরান পারস্য উপসাগরের আরব দেশগুলোর ওপর আক্রমণ বন্ধ করবে। আগের হামলাগুলোর জন্য তিনি দুঃখও প্রকাশ করেন। পেজেশকিয়ান জানান, তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী পরিষদ আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই অন্তর্বর্তী পরিষদে তিনিও একজন সদস্য, যারা নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছিল।

যুদ্ধ পরিচালনা করা এবং মোজতবা খামেনিকে সমর্থন দেওয়া রেভল্যুশনারি গার্ডসের জেনারেলরা প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। গার্ডসের প্রধান কমান্ডার জেনারেল ভাহিদি এবং জেনারেল আজিজ জাফারি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসকে দ্রুত চূড়ান্ত ভোটের জন্য বসা এবং মোজতবা খামেনিকে নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণা করতে চাপ দেন।

গার্ডসের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তায়েব পরিষদের ৮৮ সদস্যের সবাইকে ফোন করেন। মোজতবাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আয়াতুল্লাহর ছেলেকে নির্বাচিত করা সবার নৈতিক, ধর্মীয় এবং আদর্শিক দায়িত্ব।

এরপর ৮ মার্চ আবারও ভার্চুয়ালি পরিষদের বৈঠক বসে। সেখানে মধ্যপন্থীদের তোলা বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক হয়। কেউ কেউ বলেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে তার ছেলেকে বাদ দেওয়া উচিত। অন্যরা যুক্তি দেন, সংবিধান কখনো পূর্বসূরি নেতার উইলের ভিত্তিতে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে না। পরিষদের সদস্যদের স্বাধীনভাবে নেতা নির্বাচন করার ক্ষমতা রয়েছে। আলোচনায় সবাই একমত হন- যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল ভোটকে বৈধ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।

এরপর প্রত্যেক আলেম একটি কাগজে একটি নাম লিখে সেটি খামে ভরে মোম দিয়ে সিল করেন। কুরিয়াররা তাদের কাছ থেকে খাম সংগ্রহ করে ভোট গণনা ও যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কমিটির কাছে পৌঁছে দেন।

মোজতবা খামেনি ৮৮টির মধ্যে ৫৯টি ভোট পান। ফলে সর্বসম্মতভাবে না হলেও তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেয়ে বিজয়ী হন। মধ্যরাতের কিছু আগে রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমে ঘোষণা আসে- ইরান নতুন সর্বোচ্চ নেতা পেয়েছে। মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন এবং আনুগত্যের অঙ্গীকার জানানোর ঢল নামে। এমনকি যারা তার উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন তারাও প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। এভাবেই ইরানের শাসকগোষ্ঠী নতুন সর্বোচ্চ নেতার পেছনে দৃশ্যত এক কাতারে দাঁড়ায়, যেই নেতাকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি।