ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে বহিষ্কৃত দুই শিক্ষার্থী সীমা আক্তার (১২০৬৪৬) ও মাইশা ইসলাম (১৩১১০৫) ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন করেছেন। এর আগে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে তাদের সহ মোট পাঁচ জনকে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়। ১০ বছর পর ছাত্রত্ব ফিরে পেতে আবেদন করেছেন এই দুই শিক্ষার্থী।
মঙ্গলবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) তদন্ত কমিটির প্রধান প্রফেসর ড. গোলাম হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন ‘আমরা ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থীকে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেকেছিলাম।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের ১৪ই নভেম্বর অপরাজিতা হলের নামাজের কক্ষ থেকে সাতজন শিক্ষার্থীকে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে প্রাথমিক ভাবে অভিযুক্ত করা হয়। ওই দিন তিন জন বহিরাগত সহ মোট সাত জন শিক্ষার্থী অপরাজিতা হলের নামাজের কক্ষে গোপন মিটিং করছিল।
কারণ দর্শানো নোটিশের প্রেক্ষিতে সীমা আক্তার জানায় ঘটনর সময় তিনি ডিসিপ্লিনের সেশনাল ট্যুরে কক্সবাজারে ছিলেন এবং মায়িশা ইসলাম বলেন সেই সময় তিনি নামাজ কক্ষে গিয়েছিলেন নামাজ আদায় করতে। উক্ত সংস্থার সাথে তিনি জড়িত নন এবং কোন মিটিংয়ে তিনি অংশগ্রহণ করেন নি।
উক্ত ঘটনার প্রায় ১০ মাস পর ২০১৬ সালের আগস্ট মাসের ৮ তারিখ তৎকালীন ছাত্র বিষয়ক পরিচালক ও স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. অনির্বাণ মোস্তফা কে সভাপতি করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির অন্যন সদস্যরা ছিলেন বাংলা ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী ছাত্রবিষয়ক পরিচালক, মো. দুলাল হোসেন এবং নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাজিতা হলের সহকারী প্রভোস্ট ড. শিল্পী রায়। তদন্ত কমিটি তিন দিন অভিযুক্তদের লিখিত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। একই বছর ডিসেম্বর মাসের ২৯ তারিখ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ৫ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলো।
তদন্ত প্রতিবেদনে সীমা আক্তার ওই দিন সভায় উপস্থিত না থাকলেও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাথে যুক্ত থাকার প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। মায়িশা ইসলাম সভায় উপস্থিত থাকলেও তিনি ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাথে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেলেও প্রত্যক্ষদর্শী ও অভিযুক্তদের (রওশানারা খাতুন) ভাষ্যে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাথে সম্পৃক্ততার প্রমান পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়। এর পূর্বে ২০১৪ সালে মায়িশা ইসলামের কাছ থেকে জিহাদি বই সন্দেহে পাঁচটি বই বাজেয়াপ্ত করা হয়। বই গুলো হলো সাইমুম সিরিজের ৫০,৫১,৫২ ও ৫৩ খণ্ড।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পালাবদলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পরিবর্তনের পর গত বছর ২০২৫ সালের ১লা জানুয়ারি সীমা আক্তার ও মাইশা ইসলাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর তাদের বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার, বিএসসি সনদপত্র উত্তোলনর ব্যবস্থা, ক্ষতিপূরণ ও জড়িত শিক্ষক, কর্মচারীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য আবেদন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের আবেদন আমলে নিয়ে লাইফ সায়েন্স স্কুলের ডিন প্রফেসর ড. গোলাম হোসেন কে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযুক্ত সীমা আক্তারের কাছে তদন্তের বিষয়ে জানতে চায়লে তিনি বলেন ‘তদন্ত কমিটির স্যারেরা আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তারা আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খারিজ করে দেবেন, কিন্তু শর্ত দেন যে তাদের নির্দেশে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে হবে। নিরুপায় হয়ে আমি তাদের কথা বিশ্বাস করি এবং তাদের কথামতো লিখে দেই যে আমি একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের সদস্য। কিন্তু শিক্ষকরা তাদের সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেননি; উল্টো সেই কাগজটিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছেন। আমার বাবা খুলনা শহরের একটি বেকারিতে সামান্য বেতনে শ্রমিকের কাজ করতেন অনেক কষ্টে আমাকে পড়িয়েছেন। আমি সব সময় ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী ও পর্দানশীল ছিলাম এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোনো কাজের সাথে কখনোই জড়িত ছিলাম না। স্রেফ ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সন্দেহ থেকে আমার কোনো অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও আমার ওপর এই অমানবিক শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক বছরের বেশি হয়ে গেছে আমরা আবেদন করেছি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন এখনও আমাদের কিছু জানায়নি। আমরা অন্তত আমাদের অনার্সের সার্টিফিকেট টা চাই।’
তৎকালীন তদন্ত কমিটির প্রধান ড. অনির্বান মুস্তফার সঙ্গে পূর্ববর্তী তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে কথা বলতে তিনি আগ্রহী নন।