বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কমে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে একযোগে তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী উপাচার্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও হিসেব করলে দেখা যায়, ওই বছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট নারী উপাচার্য ছিলেন ৫ জন। একই সাথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন আরও পাঁচজন। তবে বর্তমানে নারী উপাচার্য রয়েছেন মাত্র একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর পূর্ণ ভিসি রয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র চারটিতে।
তথ্য বলছে, ১৯৯৩ সালে দেশের প্রথম নারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক বেগজাদী মাহমুদা নাসির। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম নারী উপাচার্য। যদিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য পেতে অপেক্ষা করতে হয় আরও দুই দশক। ২০১৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে শত বছরের এই অচলায়তন ভাঙা হয়।
বর্তমান তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের মাত্র একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নারী উপাচার্য দায়িত্ব পালন করছেন। এটি হচ্ছে সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। এতে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাহমিনা আখতার। গত জুন মাসে সরকার তাকে এই মেয়াদে নিয়োগ দেয়।
অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ৪ জন নারী উপাচার্য। তারা হলেন—সেন্ট্রাল উইমেন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. পারভীন হাসান, উত্তরা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা লেখা, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক শামীম আরা হাসান এবং জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়ের জাহান সোগরা।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ) বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. সঙ্গীতা রায়মাঝী। পূর্ববর্তী উপাচার্য ড. রুবানা হকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাহিত্যের এই সিনিয়র অধ্যাপককে শীর্ষ পদে স্থলাভিষিক্ত করা হয়। যদিও নতুন করে ভিসি নিয়োগ দিতে ইতোমধ্যেই সার্চ কমিটি গঠন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী উপাচার্যদের ইতিহাস
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০২৫ সাল নাগাদ একে একে ৭ জন নারী বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন হন। তবে এর ৪ জনকেই নানা অনিয়মের অভিযোগে আন্দোলনের মুখে পদ ছাড়তে হয়।
এর মধ্যে প্রথম নারী ভিসি হিসেবে ২০১৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পান অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি হন তিনি। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি থাকাকালে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতিসহ নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এসব নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন আন্দোলন করলেও জাবির প্রথম উপাচার্য হিসেবে দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন সম্পন্ন করেন তিনি। ২০২২ সালের ১ মার্চ তার দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্যের সময়সীমা শেষ হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পর নারী ভিসি পায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ও বুয়েটের প্রথম নারী ভিসি হিসেবে চার বছরের জন্য ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পান অধ্যাপক খালেদা একরাম। তবে দায়িত্ব পাওয়ার দুই বছরের মধ্যেই ২০১৬ সালের ২৪ মে মারা যান তিনি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে ২০১৯ সালের ১৩ জুন নিয়োগ পান ড. শিরীণ আখতার। প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে লাগাতার আন্দোলন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। আন্দোলনের মুখে ১৯ জানুয়ারি নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। দায়িত্বের শেষ দিনেও ৩৭ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন ড. শিরীণ আখতার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী উপাচার্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাদের তিনজনকেই ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদ ছাড়তে হয়েছে। তারা হলেন—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক সাদেকা হালিম, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. সেলিনা আখতার ও পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. হাফিজা খাতুন।
তথ্য বলছে, ২০২২ সালের ১২ এপ্রিল পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন। হাসিনা সরকার পতনের ১৬ দিনের মাথায় ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। এর আগে ১০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এসএম মোস্তফা কামাল খান, ট্রেজারার ড. কেএম সালাহ উদ্দিন পদত্যাগ করেন। ১৪ আগস্ট প্রক্টর ড. মো. কামাল হোসেন এবং ছাত্র উপদেষ্টা নাজমুল হোসেনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উপাচার্য ড. হাফিজা খাতুনের পদত্যাগের দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে একদল শিক্ষার্থী।
২০২২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেলিনা আখতার। তবে জুলাই বিপ্লবের পর তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের মুখে ওই বছরের ১৮ আগস্ট উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
আর জবি ভিসি সাদেকা হালিম নিয়োগ পেয়েছিলেন ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের তিন দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট তিনি পদত্যাগ করেন। এর আগে, আওয়ামী দোসর হিসেবে তিনিসহ রেজিস্ট্রার, প্রক্টরসহ পুরো প্রক্টরিয়াল বডি এবং হল প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। পদত্যাগ না করলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণাও দিয়েছিলেন তারা। আন্দোলনের মুখে ওইদিনই ভিসি পদ থেকে পদত্যাগ করেন সাদেকা হালিম। অবশ্য হাসিনা সরকার পতনের পর আর একদিনও বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেননি তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অল্প কিছুুদিনের ব্যবধানে তিন নারী উপাচার্যের পদত্যাগের পর ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. শুচিতা শারমিনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে এ পদে আট মাসও টিকতে পারেননি তিনি। অনিয়ম ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের টানা ২৯ দিনের আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের ১৩ মে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরে নারী উপাচার্যের যাত্রা শুরু হয়। এরপর এ পর্যন্ত একে একে অন্তত ১১ জন নারী এই দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন ৪ জন।
তথ্য বলছে, ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হওয়ার পর ১৯৯৩ সালে দেশের প্রথম নারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক বেগজাদী মাহমুদা নাসির দায়িত্ব পালন করেন। সেই হিসেবে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী উপাচার্য।
এরপর ১৯৯৭ সালে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) ভিসি নিয়োগের পর ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত একাধিক মেয়াদে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন ড. কারমেন জেড লামাগনা। তার পর প্রতিষ্ঠানটির ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। তিনি এখনও ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেশের দ্বিতীয় নারী উপাচার্য ড. আনোয়ারা বেগম ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এরই মধ্যে ২০১০ সালে নতুন করে যাত্রা শুরু করে সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি। সে সময় থেকে অদ্যাবধি প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করে আসছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. পারভীন হাসান।
এদিকে ২০১২ সালের এপ্রিলে ড. ফাহিমা আজিজ চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উপাচার্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি ২০১২ সালের মে থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ড. ফাহিমা আজিজের পর বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর নির্মলা রাও এই পদে স্থলাভিষিক্ত হন। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রধান একাডেমিক ও নির্বাহী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২২ সালের শুরুতে অবসর গ্রহণ করেন তিনি।
একই বছরের প্রতিষ্ঠানটির ভিসির দায়িত্ব পান ড. রুবানা হক। ২০২৬ সালের জুনে ৪ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করার পর তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. সঙ্গীতা রায়মাঝী।
এর আগে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক ড. জান্নাতুল ফেরদৌস। ২০২৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. খায়ের জাহান সোগরা।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল পরবর্তী চার বছরের জন্য উত্তরা ইউনিভার্সিটির উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা লেখা। একই বছর ২০ ডিসেম্বর সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয় অধ্যাপক শামীম আরা হাসানকে।