ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) তারিখ সাধারণত অন্তত দুই সপ্তাহ আগে প্রার্থীদের জানানোর রীতি রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে কখনো ১০ দিন সময় দেওয়া হলেও এবার আরবি বিভাগের প্রভাষক নিয়োগে দেখা গেছে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। ভাইভার মাত্র ছয় দিন আগে প্রার্থীদের জানানো হয়েছে নির্ধারিত তারিখ। এতে বিপাকে পড়েছেন বিদেশে উচ্চশিক্ষারত প্রার্থীরা। তাদের কেউ কেউ অক্সফোর্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে ফেরা, ভ্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
এ ঘটনায় বিভাগের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভাগসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়োগকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই একধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে। এ ছাড়া কারও পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এমন তাড়াহুড়ো করে ভাইভার আয়োজন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে একটি স্থায়ী ও দুটি অস্থায়ীসহ মোট তিনটি পদের কথা উল্লেখ ছিল। পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হলেও অজানা কারণে কয়েক দিন আগে তা স্থগিত করা হয়। সেই স্থগিত পরীক্ষা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর গত ১১ অক্টোবর নতুন করে ভাইভার তারিখ নির্ধারণ করা হয় আগামী ১৮ অক্টোবর। অর্থাৎ, পরীক্ষার এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে প্রার্থীদের বিষয়টি জানানো হয়। বিভাগের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে নতুন তারিখ উল্লেখ করা হলেও প্রার্থীরা ১২ অক্টোবর ই-মেইলের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন।
বিভাগসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অন্তত তিনজন প্রার্থী বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। জানুয়ারিতে ভাইভার তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পর বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন প্রার্থী দেশেও ফিরে আসেন। পরে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় তাদের সেই আসাটায় বিফলে যায়।
এবারও অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন তারিখ নির্ধারণ করায় তাদের জন্য একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বিদেশে অবস্থানরত এক প্রার্থী গতকাল রবিবার প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনার মাধ্যমেই প্রথম জানলাম, আমার ভাইভার বিষয়টি। মাত্র সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব?’
বিদেশে অবস্থান করা আরেক প্রার্থী আগামীর সময়কে বলেন, ‘আজ সোমবার ই-মেইলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে, আগামী ১৮ অক্টোবর সকাল ১১টায় উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) মহোদয়ের অফিস কক্ষে উপস্থিত থাকতে হবে। মাত্র ছয় দিন আগে ভাইভার কথা জেনেছি। এখন কীভাবে কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। প্রস্তুতির জন্য অন্তত কিছুটা সময় দেওয়া উচিত ছিল। ভাইভা যদি অন্তত এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের সবার জন্যই ভালো হয়।’
প্রার্থীদের ভাষ্য, বিদেশে অবস্থানরত কারও পক্ষে এত অল্প সময়ে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা সহজ নয়। বিমানের টিকিট, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম, ভিসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হয়। ফলে পর্যাপ্ত সময় না পেলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন। এতে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সব প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বিভাগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, জানুয়ারিতে ভাইভা স্থগিতের বিষয়টি নিয়েও তখন অস্পষ্টতা ছিল। কেন পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রার্থীদের কাছে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পৌঁছায়নি বলে তাদের দাবি। এবারও নতুন তারিখ ঘোষণার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ায় শিক্ষক ও প্রার্থীদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করছি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভাইভা আয়োজনের নজির আগে কখনো দেখিনি। সাধারণত শিক্ষার্থীদের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে জানানো হয়’।
‘এই নিয়োগ নিয়ে নানা ধরনের কানাঘুষা রয়েছে। এর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা বলা কঠিন। তবে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য অবস্থানরত প্রার্থীদের জন্য বিষয়টি অবশ্যই কষ্টদায়ক’, যোগ করেন এই শিক্ষক।
এ বিষয়ে আরবি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান গতকাল ১১ অক্টোবর আগামীর সময়কে বলেন, ‘আজ দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামী ১৮ তারিখ ভাইভার ডেট দিয়েছেন উনারা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, সাধারণত ভাইভার জন্য দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় দেওয়া হয়। জরুরি কোনো পরিস্থিতি হলে ১০ দিন সময় দেওয়া হতে পারে। তবে আরবি বিভাগের নিয়োগের বিষয়টি তাঁর জানা নেই বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। নিয়মের মধ্যে হলে হবে, আর না হলে হবে না। বিষয়টি আমি দেখব। আর কেউ যদি বিদেশ থেকে আবেদন করে, তাকে অবশ্যই সুযোগ দেওয়া উচিত।’
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের কার্যকর পদ্ধতি নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের অভিযোগ, কিছু নিয়োগে পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব বিতর্ক এড়াতে নিয়োগের প্রতিটি ধাপে স্পষ্ট নীতিমালা অনুসরণ এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশে, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে অনেক বছর ধরেই আলোচনা রয়েছে। আমরা অনেকবার বলেছি, শুধু ভাইভার মাধ্যমে প্রকৃত ও যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন করা যায় না। নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন করা উচিত। এর সঙ্গে লিখিত পরীক্ষা ও ব্যবহারিক মূল্যায়নের বিষয়ও যুক্ত করা প্রয়োজন।’