সুকুমার রায়ের ‘এক বছরের রাজা’ গল্পটি আমাদের অনেকেরই পরিচিত। হাস্যরস আর ব্যঙ্গের মোড়কে লেখা সেই গল্পে এক বছরের জন্য রাজা হয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের কাহিনী আছে। কিন্তু চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) গল্পটা একটু অন্যরকম। এখানে একজন উপাচার্যের সমগ্র চুয়েটের মন জয় করতে লেগেছে কেবল ৫৬ দিন।
২৮ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান। একজন উপাচার্যের জন্য ৫৬ দিন খুব বেশি সময় নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান তো দূরের কথা, অনেক সময় সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো বুঝে উঠতেই কয়েক মাস লেগে যায়। কিন্তু অধ্যাপক সায়েমের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার গল্পটা ছিল ভিন্ন।
ওই ৫৬ দিনে কী এমন করেছিলেন সায়েম যে তার বিদায়ের পরও তাকে পুনর্বহালের দাবিতে ক্যাম্পাসে আন্দোলন চলছে?
একটি ফোনকল, বদলে দিয়েছিল ধারণা
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইফতেখার উদ্দিনের অভিজ্ঞতাটি তেমনই একটি গল্প। ক্লাব ফেস্টের কিছু ছবি দেখে অধ্যাপক সায়েম নিজেই ইফতেখারকে ব্যক্তিগতভাবে মেসেজ করেন। সেটি ছিল ছুটির দিন। পরদিন ফোন করে প্রায় ১০ মিনিট কথা বলেন ইফতেখারের সঙ্গে। ওই শিক্ষার্থীর কাছে উপাচার্যের ফোন পাওয়ার বিষয়টি বেশ অপ্রত্যাশিতই ছিল বটে। কোনো উপাচার্য একটি ক্লাবের কিছু ছবি দেখে একজন শিক্ষার্থীকে উৎসাহ দিতে নিজে ফোন করবেন—এমন অভিজ্ঞতা তার আগে হয়নি।
ইফতেখারের ভাষায়, সেদিনই তিনি অধ্যাপক সায়েমের সহজ-সরল ও বিনয়ী আচরণের অন্য রকম পরিচয় পান। তার মতে, অধ্যাপক সায়েমের চিন্তাভাবনা ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরকে সামনে রেখে। চুয়েটের বিভিন্ন ক্লাবের মধ্যে জ্ঞানের আদান-প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বিষয়ে তিনি আগ্রহী ছিলেন।
উপাচার্যের চেয়ারে বসেও শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফ্রিদা আহমেদের অভিজ্ঞতাতেও উঠে আসে একই বিষয়। তার কাছে সায়েম ছিলেন এমন একজন উপাচার্য, যিনি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং শিক্ষার্থীদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ছিল তার ভাবনার কেন্দ্রে
সাবেক উপাচার্য সায়েমের পরিকল্পনার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল চুয়েটের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়া। প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীকে পূর্ণ বৃত্তিতে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগের কথা তিনি জানিয়েছিলেন।
নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব আগদারের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল তার।
শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও তার উদ্যোগ ছিল। সায়েমের সহযোগিতায় ইতালির স্টিল কোম্পানি ড্যানিয়েলিতে চুয়েটের পাঁচজন সাবেক শিক্ষার্থী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ও ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনেও তার সহযোগিতা ছিল।
টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক সায়েম বলেন, ‘আমি আমার শিক্ষার্থীদের ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটিকে কাজে লাগাতে চেয়েছি। আমি তাদের একটি ভিশনারি পথ দেখাতে চেয়েছি, যাতে তারা পুরো বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।’
এই কথার মধ্যেই তার ভাবনার একটি বড় জায়গা স্পষ্ট হয়—শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রস্তুত করা।
২০০৩-এর শিক্ষার্থী, ২০২৬-এর উপাচার্য
সায়েমের সঙ্গে চুয়েটের সম্পর্কটা অন্য অনেক উপাচার্যের চেয়ে আলাদা। কারণ তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কেউ নন। ২০০৩ সালে চুয়েটের স্নাতকোত্তর প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে তার যাত্রা শুরু। পরে ২০০৫ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন।
জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং অস্ট্রেলিয়ার সিকিউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করার পরও তিনি বিদেশে স্থায়ী হননি। ফিরে এসেছেন নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বিদেশে থেকে নিজের জন্য অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব হলেও সেই অর্জন যদি শিক্ষার্থীদের কাজে না লাগে, যে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে প্রকৌশলীর পরিচয় দিয়েছে তার জন্য কিছু করতে না পারেন, তাহলে সেই অর্জনের মূল্য তার কাছে কম—সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছিলেন তিনি।
সমস্যা দেখেছেন, পরিকল্পনাও করেছিলেন
সায়েমের ভাবনায় শুধু আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছিল না, ছিল চুয়েটের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো নিয়েও পরিকল্পনা। শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক হলের সংকট, বাস সংকট, জনবলস্বল্পতা এবং মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর উল্লেখ করেছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে স্মার্ট ক্লাসরুম ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন।
গবেষণার ক্ষেত্রে নবীন গবেষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, ভালো গবেষণাকে পুরস্কৃত করা এবং সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি দাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আকর্ষণের কথা বলেছিলেন এই সাবেক উপাচার্য। চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমুদ্রবন্দর ও তেল শোধনাগারসহ শিল্পভিত্তিক অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে শিল্প গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন।
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়েও সক্রিয় ছিলেন
সায়েম উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই চুয়েট ক্যাম্পাসের পুকুরে পানিতে ডুবে শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর পুকুরে বেষ্টনী, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও পানি সেচের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব কাজ তিনি নিজে উপস্থিত থেকে তদারকি করেছিলেন জানা যায়।
র্যাগিং ও মাদকের ক্ষেত্রেও তিনি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়েছিলেন। এ জন্য ভিজিলেন্স টিম গঠন ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন।
ছাত্র সংসদ থেকে অ্যালামনাই—ভাবনায় ছিল পুরো ক্যাম্পাস
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশের জন্য ছাত্র সংসদ থাকা ভালো বলে মন্তব্য করেছিলেন অধ্যাপক সায়েম। তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। অন্যদিকে, চুয়েটের প্রতিটি বিভাগে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠনের আহ্বান জানান। টিএসসিতে অ্যালামনাইদের জন্য অফিস দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ তার পরিকল্পনায় শুধু শ্রেণিকক্ষ বা গবেষণাগার নয়, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অ্যালামনাই এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান—সব পক্ষকে একটি বৃহত্তর একাডেমিক নেটওয়ার্কের মধ্যে আনার চিন্তা ছিল।
দেশের বাইরেও ছিল তার কাজের স্বীকৃতি
সায়েমকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের সমর্থনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও তার পক্ষে সমর্থন এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন অধ্যাপক তার পুনর্বহালের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি ও চিঠি দিয়েছেন।
এসব বিবৃতিতে অধ্যাপক সায়েমের একাডেমিক নেতৃত্ব, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে তার ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অধ্যাপক মাসুদ খান তার চিঠিতে সায়েমের পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করার কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একাডেমিক যোগাযোগ তৈরিতে তার সক্রিয় ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
চুয়েটে সায়েমকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, আন্তর্জাতিক শিক্ষকদের এসব সমর্থন সেই আলোচনাকে ক্যাম্পাসের বাইরেও নিয়ে যায়।
দায়িত্বে ৫৬ দিন, কিন্তু প্রত্যাশার গল্পটা বড়
অল্প সময়ে অধ্যাপক সায়েম উপাচার্য হিসেবে যা করেছেন, সেই প্রত্যাশার প্রতিফলনই দেখা গেছে তার অপসারণের পর। তাকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন। শুরু হয়েছে শাটডাউন, মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর ও গণঅবস্থান কর্মসূচি। ২৮ সেপ্টেম্বর সেই আন্দোলন সপ্তম দিনে গড়িয়েছে, একই দিনে শিক্ষকরা সর্বাত্মক কর্মবিরতিও পালন করেন।
একজন উপাচার্য কত দিনে একটি ক্যাম্পাসের মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারেন—এর কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে চুয়েটের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, কখনো কখনো ৫৬ দিনও একটি দীর্ঘ গল্পের শুরু হয়ে যেতে পারে।