কুমিল্লার মাইশা ইসলাম উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা একটি মাত্র হলে সিট হয়নি তার। আবাসনের সমস্যা মাইশার একার নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর।
যাত্রার শুরু থেকেই আবাসন সংকট প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের। ১০ বছরে সেখানে ছাত্রদের জন্য কোনো নতুন হল নির্মাণ হয়নি। ছাত্রীদের জন্য একটি হল থাকলেও সেটি চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। তবে এখন নতুন তিনটি হল নিয়ে আশার দিন গুনছেন শিক্ষার্থীরা। এগুলোর দুটি নির্মাণাধীন, একটি নির্মাণ শুরুর অপেক্ষায়।
পুরান ঢাকায় দুটি, কেরানীগঞ্জে একটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কিছুটা আশা দেখাচ্ছে পুরান ঢাকায় নির্মাণাধীন বাণী ভবন ও ড. হাবিবুর রহমান হল। এর মধ্যে ড. হাবিবুর রহমান হল হচ্ছে বংশালে ৯ দশমিক ৩৯ কাঠা জমিতে। আর বাণী ভবন নির্মাণ হচ্ছে সূত্রাপুরে ১০ দশমিক শূন্য ৯ কাঠা জমির ওপর।
অর্পিত সম্পত্তির ওপর হল দুটি নির্মাণে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছয়তলা দুটি ভবনে ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে। তবে এগুলো ছাত্র নাকি ছাত্রীদের জন্য, তা এখনো নির্ধারণ হয়নি।
সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইফতেখার আলম জানান, ভবন দুটির প্রথম তলার ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে ভবন দুটি দৃশ্যমান হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীন বলেন, ‘আমরা কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করছি। আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সবার সহযোগিতায় আগামী তিন বছরের মধ্যে আবাসিক হল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আমি আশাবাদী।’
এদিকে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাত একর জমিতে ছাত্রদের জন্য নতুন একটি ১০-তলা হল নির্মাণ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বরাদ্দকৃত ২০ কোটি টাকা দিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তবে শুরুতে এই হল নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল না। ২০২৫ সালের মে মাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই জমিতে অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর আওতায় গত বছরের ১ জুন জমিতে বালু ভরাটও শুরু হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় টিনশেড পদ্ধতিতে প্রায় ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করার কথা ছিল। সে অনুযায়ী নকশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এক বছরেও প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় পরে প্রকল্পের ধরনে পরিবর্তন আনা হয়।
অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে সেখানে স্থায়ী হল নির্মাণে গত ২৯ জুন একটি ই-টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১০-তলা নতুন ভবনে ৬০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাস এখনো বহুদূর
জগন্নাথ কলেজ থেকে রূপান্তরের মাধ্যমে ২০০৫ সালে যাত্রা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে আবাসন সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ রয়েছে প্রথম থেকেই। এ নিয়ে কয়েক দফায় আন্দোলনও করেছেন শিক্ষার্থীরা। ২০১৬ সালে তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় প্রায় ২০০ একর জমিতে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১ হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই ধাপে ভূমি অধিগ্রহণ, বালু ভরাট ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করার কথা। কিন্তু গত আট বছরেও বালু ভরাটের কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পের ধীরগতির এটি একটি বড় কারণ। বালু ভরাট শেষ না হওয়ায় অন্যান্য কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের চুক্তি হয়। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এর কাজ এক বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তা পুরোপুরি শেষ হয়নি। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রাচীর নির্মাণের কাজ এখন বন্ধ আছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক আমিরুল ইসলামের দাবি, কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং দ্রুতই তা সম্পন্ন হবে।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পের ধীরগতির কারণে শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের আন্দোলন আরও জোরালো হয়। প্রকল্পের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের দাবিতে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি শিক্ষার্থীরা গণঅনশনে বসেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসে অনশন প্রত্যাহার করেন তারা। ওই মাসের মাঝামাঝিতেই সেনাবাহিনীর হাতে কাজ হস্তান্তরের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এরপর কাজের গতি বাড়াতে এবং বাজেটের দাবিতে ২০২৫ সালের ১৪ মে ‘লং মার্চ টু যমুনা’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কেরানীগঞ্জের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে এখনো বালু ভরাটের কাজ চলছে। সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইফতেখার আলম জানান, প্রথম ধাপের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ কাজ হস্তান্তরের লক্ষ্য তাদের। তবে বালু ভরাট শেষ না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো সব সাইট সেনাবাহিনীকে বুঝিয়ে দিতে পারেনি।
কিন্তু প্রথম দফার কাজ শেষ হলেও শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন নিয়ে কোনো সুখবর থাকবে না। কারণ এই ধাপে কোনো আবাসিক হলের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এজন্য দ্বিতীয় ধাপের প্রকল্প প্রয়োজন। এই ধাপের পরিকল্পনায় আবাসিক হল নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেটি এখনো একনেকে অনুমোদন পায়নি।
দ্বিতীয় ধাপের অধীনে কয়টি হল নির্মাণ করা হবে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক আমিরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাবে না। যথাসময়ে অনুমোদন পেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস দৃশ্যমান হতে পারে।