চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের সময় উত্তরপত্রে পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের বড় ধরনের অসংগতি ধরা পড়েছে। এক শিক্ষার্থীর পদার্থবিজ্ঞানের খাতায় সৃজনশীল অংশে নম্বর ছিল শূন্য। অথচ প্রকাশিত ফলাফলে ওই অংশে ৪৫ নম্বর দেখানো হয়েছে। পরে শিক্ষার্থীর আরও কয়েকটি বিষয়ের উত্তরপত্র যাচাই করে একই ধরনের অমিল পাওয়া যায়।
ঘটনার কারণ ও এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখতে গত ২৫ আগস্ট তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (উচ্চমাধ্যমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ দিদারুল আলম এবং সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল আজিজ।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ ওঠা বিজ্ঞান বিভাগের ওই শিক্ষার্থী প্রকাশিত ফলে জিপিএ-৪.৯৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তিনি পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য বোর্ডে আবেদন করেছিলেন। পুনর্নিরীক্ষণে তিন বিষয়ের নম্বরে অমিল ধরা পড়ার পর শিক্ষার্থীর অন্য উত্তরপত্রগুলোও তলব করা হয়। তদন্তে সেগুলোতেও নম্বরের অসঙ্গতি পাওয়া যায়। পুনর্নিরীক্ষণের সময় একজন পরীক্ষক পদার্থবিজ্ঞানের উত্তরপত্রে বিষয়টি শনাক্ত করেন। খাতায় ওই অংশে নম্বর ছিল শূন্য, অথচ প্রকাশিত ফলাফলে ৪৫ নম্বর দেখানো হয়। পরে বিষয়টি যাচাই করে কম্পিউটার সেন্টারে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গেও উত্তরপত্রের নম্বরের অমিল পাওয়া যায়।
বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে অবহিত করেন। এরপর ঘটনা অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে ওই শিক্ষার্থীর নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলও সংগ্রহ করেছে কমিটি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীর নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলের পূর্ণাঙ্গ কপি বোর্ডে জমা দিয়েছে।
এবার এসএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন। ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছে ৩৯ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তদন্ত কমিটির বাকি দুই সদস্যও প্রতিবেদন প্রকাশের আগে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে তদন্ত কমিটির প্রধান ও বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন জানিয়েছেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তাধীন বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা যাবে না। আমাদের তদন্তের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তদন্ত প্রতিবেদন আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেব। এরপর বিস্তারিত জানানো হবে।’
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের সময় ৩৪টি খাতার নম্বরপত্র বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পুনর্নিরীক্ষণের ফল জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তে তখন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বোর্ডও তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এর আগে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফলাফলে ১১টি পত্রের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মামলাও হয় এবং গত মাসে মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। তবে সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথ দাবি করেছেন, এ ঘটনায় তাঁকে ও তাঁর ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে।
বোর্ডের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পরীক্ষার হল থেকে উত্তরপত্রের প্রথম অংশ আগেই কম্পিউটার সেন্টারে পাঠানো হয়। সেগুলো স্ক্যান করে সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়। পরে প্রধান পরীক্ষকদের কাছ থেকে নম্বর পাওয়ার পর সেগুলোও স্ক্যান করে সার্ভারে যুক্ত করা হয়। ফলাফল প্রকাশের কয়েক দিন আগে নম্বর মিলিয়ে শিক্ষার্থীর ফলাফল নির্ধারণ করা হয়। এ পর্যায়েই শিক্ষার্থীর পরিচয় জানা সম্ভব হয়। এরপরই নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ থাকে।
বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, আগের জালিয়াতির ঘটনায় কম্পিউটার শাখা ও পরীক্ষা শাখার একটি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। এবারও কম্পিউটার শাখার বিষয়ে কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জমা হয়নি। ফলে এখনই বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। বোর্ডের কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে নিষেধ করা হয়েছে।