Image description

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হতে চললেও পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর বর্তমান ডাকসুর এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্বাচন কমিশন গঠন, তফসিল ঘোষণা কিংবা ভোটের সম্ভাব্য তারিখ কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে পরবর্তী নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র বলছে, গত ২০ আগস্ট ডাকসুর পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রস্তুতিমূলক বৈঠক হলেও সেটি ছিল কেবল প্রাথমিক ‘আইসব্রেকিং’ আলোচনা। এই বৈঠক থেকে বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষদের ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর মতামত নেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি কার্যক্রম শুরু হয়নি। এমনকি নির্বাচনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটেও পৃথক কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।

উপাচার্য ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আমরা ডাকসু নির্বাচন দিতে চাই। তবে নির্বাচন কবে হবে, নির্বাচন কমিশন কবে গঠন করা হবে কিংবা তফসিল কখন ঘোষণা হবেÑ এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। হল প্রশাসন, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অংশীজন ডাকসু নির্বাচন দাবি করলে প্রক্রিয়া শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ডাকসু নির্বাচন আয়োজনে প্রশাসনের আগ্রহ রয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। শিগগিরই বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আগের নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

এদিকে পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন আয়োজন পরিকল্পনা এবং বাজেট সংক্রান্ত ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে মুখ খোলেননি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

দীর্ঘ বিরতির পর জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ২০২৫ সালে ডাকসু, রাকসু, চাকসু ও জাকসুসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা ফের শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছেÑ নিয়মিত নির্বাচনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তৈরি হবে, নাকি আবারও দীর্ঘ বিরতির পথে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে ১৪ বার এবং পাকিস্তান আমলে হয়েছে ১৬ বার। অর্থাৎ স্বাধীনতার আগে মোট ৩০ বার ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিপরীতে স্বাধীনতার ৫৫ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৯ বার। ফলে স্বাধীনতার পর থেকেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন ক্রমেই অনিয়মিত হয়ে পড়ে।

নির্বাচন না হওয়ার ঝুঁকি

নির্বাচন আয়োজন করা দলীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও নির্বাচন না দেওয়ার ঝুঁকিও একেবারে কম নয়। কার্যত নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি না থাকলে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের বাইরে বিভিন্ন সংগঠনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে আবাসিক হল এবং একাডেমিক এরিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য তৈরি হয়।

ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং গত ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মেঘমল্লার বসু বলেন, ডাকসু শুধু নেতা তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়; সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব এবং তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলারও প্রতিষ্ঠান। তাই ডাকসুর প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিয়মিত নির্বাচনের বিকল্প নেই।

ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় প্রশাসন আসার পর থেকে ডাকসুর কার্যক্রম ব্যাহত করার জন্য প্রশাসন চেষ্টা চালাচ্ছে। ডাকসুর উদ্যোগে চলমান একাধিক প্রজেক্টের কাজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসুকে অকার্যকর করে দিতে চায়।

তিনি বলেন, ডাকসুকে নিয়মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ডাকসুর বর্তমান কার্যনির্বাহী পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানাব। ডাকসুকে অকার্যকর করার পাঁয়তারা করা হলে শিক্ষার্থীরা এর জবাব দেবে।

এদিকে ডাকসুর পাশাপাশি রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের মেয়াদও পর্যায়ক্রমে শেষের দিকে। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রনেতারাও যথাসময়ে নির্বাচন আয়োজনের উপর জোর দিচ্ছেন।

রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ মনে করেন, নিয়মিত নির্বাচন না হলে ক্যাম্পাসে অনিয়ম ও আধিপত্যের রাজনীতি শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ছাত্রসংসদগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি।

ডাকসুর সাবেক ভিপি ও চাকসুর সাবেক জিএস মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখা এবং ভবিষ্যতের যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে নির্ধারিত সময়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। অতীতে দীর্ঘ সময় নির্বাচন বন্ধ থাকার সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

রয়েছে ৯০ দিন বাড়ানোর সুযোগ

ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ ৩৬৫ দিন। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর এই মেয়াদ পূর্ণ হবে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৯০ দিন মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এরপরও নির্বাচন না হলে ডাকসু স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়ার বিধান রয়েছে।

কাজেই প্রশাসন প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করলেও দ্রুত সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না করলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।