সাত বছরে অডিট নেই। আট মাসে সভা নেই কমিটির। অথচ প্রতি মাসে অফিস খরচের নামে হাত ঘুরছে ২০ হাজার টাকা। নিয়োগ থেকে শুরু করে স্থায়ীকরণ, বেতন আদায় থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—প্রতিটি সিদ্ধান্তেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে। ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া হয়েছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এমন সব ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার মোহরা এলাকায় অবস্থিত সিডিএ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে। আর প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তানজিনা চৌধুরীর বিরুদ্ধে উঠেছে নানা অনিয়মের অভিযোগ।
দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ের নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির তদারকি নিয়েও।
সিডিএ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং তাদের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, কলেজে বর্তমানে ১৭ জন স্থায়ী, ২ জন অস্থায়ী, ১১ জন খণ্ডকালীন, ৪ জন চুক্তিভিত্তিক ও ৫ জন ব্লকভুক্ত শিক্ষক কর্মরত আছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ৭ জন স্থায়ী, ৬ জন অস্থায়ী ও একজন খণ্ডকালীন।
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যোগ্যতা পূরণের পরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্থায়ী করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে সাত-আট বছর ধরে অস্থায়ী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ বিষয়ে একাধিকবার লিখিত আবেদন করেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ মেলেনি বলে তাদের দাবি।
পাঁচজন কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ১০ বছর পার হলেও তাদের স্থায়ী করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এ বিষয়ে একাধিকবার নির্দেশ দিলেও তা ব্যবস্থাপনা কমিটির রেজুলেশনে অনুমোদন পায়নি।
এর বিপরীত চিত্রও আছে। দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ছয় শিক্ষককে ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়াই স্থায়ী করে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। পরে কমিটির অন্য সদস্যদের আপত্তির মুখে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। তবে বর্তমানে তাদের আবার স্থায়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে শিক্ষকদের একাংশ জানিয়েছেন।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তানজিনা চৌধুরী নিয়োগ পেয়েছিলেন সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে। তার সেই নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি, নিয়োগের সময় সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ১০ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা তার ছিল না। সিটি করপোরেশনের খণ্ডকালীন শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা দেখিয়ে তিনি ওই যোগ্যতা পূরণ করেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তানজিনা চৌধুরী। তাঁর দাবি, বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদন করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েই তিনি নিয়োগ পেয়েছেন।
বেতন আদায়ের পদ্ধতি নিয়েও ক্ষোভ আছে শিক্ষক-কর্মচারীদের। একাধিক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে অনলাইনে বেতন নেওয়া হলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজ উদ্যোগে সেই পদ্ধতি বন্ধ করে ম্যানুয়াল পদ্ধতি চালু করেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত শ্রেণিশিক্ষকদের দিয়ে বেতন রেজিস্টারে এন্ট্রি করানো হয়েছে বলেও তারা জানান।
তাদের দাবি, অনলাইন পদ্ধতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন নেওয়া হয়নি। বেতন আদায় ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আগের পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষকরা আরও বলছেন, প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের মতামত নেওয়া হয় না; ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজেই বই নির্বাচন করেন। প্রকাশকদের কাছ থেকে এ ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার কথাও উঠেছে তাদের কথায়, যদিও এর স্বপক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ মেলেনি।
প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। অফিসের বিভিন্ন খরচের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা উত্তোলন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। প্রত্যয়নপত্র, ট্রান্সফার সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ফি বাবদ আদায়কৃত অর্থের ব্যবস্থাপনাতেও তার সম্পৃক্ততা আছে।
জানা গেছে, গত সাত বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অডিট হয়নি। এতে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।
বিধি অনুযায়ী বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে একবার হওয়ার কথা। অথচ দীর্ঘ প্রায় আট মাস ধরে একটি সভাও হয়নি।
২০২৫ সালের ১ থেকে ৩ জুন সরকারি ছুটির সময়ে অনুপস্থিত থাকার কারণ দেখিয়ে তিন কর্মীর বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তারা বলছেন, অফিস খোলা থাকবে—এমন কোনো লিখিত বা মৌখিক নির্দেশনাই ছিল না, তবু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শাস্তির আগে নিয়ম অনুযায়ী ১০ কর্মদিবস সময় দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে মাত্র তিন দিন।
শাস্তি পাওয়া ওই তিন কর্মী হলেন—অ্যাডমিন অফিসের এস. এম. আসাদুজ্জামান, কম্পিউটার অপারেটর মো. আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী এবং খণ্ডকালীন কম্পিউটার অপারেটর শেখ হাসনাত আবেদীন মির্জা।
তাদের মধ্যে একজনকে চাকরিচ্যুত, একজনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং অপরজনের এক বছরের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখা থেকে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট জারি করা এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, স্বীকৃত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যথায় নির্ধারিত সময় শেষে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজ পদে পূর্ববহাল হয়ে বিধি মোতাবেক পূর্ণ বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন।
তবে ওই তিন কর্মীকে শাস্তির ঘটনার ১৪ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তাদের পুনর্বহাল করা হয়নি, যা সরকারি নির্দেশনার সরাসরি লঙ্ঘন।
এদিকে, কম্পিউটার অপারেটর মো. আশরাফ উদ্দীন চৌধুরীকে কলেজ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহাল না করেই ডেকে ডেকে কাজ করাচ্ছে, কারণ এই কর্মীকে ছাড়া অ্যাকাউন্টস শাখার নিয়মিত কার্যক্রম চালানো কার্যত অসম্ভব। তবে এতেও তার চাকরির অবস্থান স্পষ্ট হয়নি; বাকি দুজনের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থাও অপরিবর্তিত রয়েছে।
শিক্ষকদের ভাষ্য, স্থায়ী শিক্ষকরা ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা পেলেও অস্থায়ী শিক্ষকরা পান ২৫ শতাংশ। অস্থায়ী শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের তাদের। এ ছাড়া ১০ বছর চাকরির মেয়াদ পূর্ণ করা কয়েকজন শিক্ষক গত দুই বছর ধরে টাইম স্কেল থেকে বঞ্চিত বলেও জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগী আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী জানান, ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২৩ সেপ্টেম্বর সভার রেজুলেশন অনুমোদন করা হয়। ওই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পরিচালনা কমিটির আরেকটি সভা হয়, যার রেজুলেশন অনুমোদন করা হয় একই বছরের মে মাসে। তার বক্তব্য, ওই সভার সিদ্ধান্তগুলো ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তানজিনা চৌধুরী নিজের সুবিধা অনুযায়ী পরিবর্তন করে নেন।
প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া আটকে থাকার তথ্য উঠে এসেছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও তার ঘনিষ্ঠ একটি বলয়ের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না—এমন অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
তিন শিক্ষক-কর্মচারীর বরখাস্ত সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তানজিনা চৌধুরী বলেন, চলতি মাসেই সিডিএ তাদের বিরুদ্ধে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁদের বরখাস্তের চিঠি ইস্যু করা হয়। তবে ১৮০ দিনের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, রেজুলেশন করা হলেও তা এখনো চূড়ান্তভাবে পাস হয়নি। তা সত্ত্বেও ফাইলে কেন বরখাস্ত দেখানো হলো, জানতে চাইলে তানজিনা চৌধুরী পুরো দায় তদন্ত কমিটির সদস্যদের ওপর চাপিয়ে দেন।
বরখাস্তের পরও কম্পিউটার অপারেটর আশরাফ উদ্দীনকে ডেকে নিয়ে অফিসের কাজ করানোর বিষয়টি তানজিনা চৌধুরী অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, আশরাফকে ডেকে কাজ করানো হয়নি, বরং তিনি স্বেচ্ছায় এসে কাজ করেছেন। তবে বরখাস্তকৃত ব্যক্তি এভাবে বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ করতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এছাড়া বিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশে ঘষামাজার অভিযোগকে তিনি সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করেন।
বিদ্যালয়ের অডিট রিপোর্ট প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তানজিনা চৌধুরী বলেন, তাঁর আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কাজ না করে থাকলে সে দায় তাঁর নয়। অন্যদিকে দীর্ঘ ৮ মাস কমিটির কোনো সভা না হওয়া প্রসঙ্গে প্রথমে কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব না দিলেও পরে তিনি জানান, শিগগিরই সভা ডাকা হয়েছে। একইসঙ্গে গত মে মাসের রেজুলেশনে সভার তথ্য রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, সিডিএ স্কুলের প্রধান সমস্যা হলো শিক্ষক ও অভিভাবকদের দুটি পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে পড়া। পরস্পর বিরোধী অবস্থানের কারণে একে অপরের পেছনে লেগে থাকার এই প্রবণতা প্রতিষ্ঠানের কারও জন্যই কল্যাণকর নয় এবং এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। বিদ্যালয়টির চলমান সংকট দূর করতে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যকে (এমপি) সঙ্গে নিয়ে খুব শিগগিরই স্কুলের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটি সভা আহ্বান করা হবে। উদ্ভূত সব সমস্যার শিগগিরই সমাধান করা হবে।