রাজনৈতিক নেতা পেলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ। অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি গেল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। চিঠির নিচে স্বাক্ষর উপাচার্যের। অভিনন্দন বার্তায় শুধু উপাচার্যের নাম নয়, যুক্ত করা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদেরও। কোথাও আবার সেই শুভেচ্ছাবার্তা প্রকাশ করা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন ঘটনা সামনে আসার পর উপাচার্যদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
বিতর্কটি শুধু আটকে নেই কয়েকটি অভিনন্দনবার্তায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন করে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং দীর্ঘদিনের সেই পুরনো অভিযোগ— সরকার বদলায়, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় বদলায়, কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগের সংস্কৃতি বদলায় না। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগের পাশাপাশি দায়িত্ব পাওয়ার পর উপাচার্যরা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করছেন, সে প্রশ্নও এসেছে সামনে।
সাম্প্রতিক বিতর্কের শুরু গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক মো. নাজমুস সাদাতকে ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক প্যাডে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির নতুন চার সদস্য রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ডোনার ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে আলাদা অভিনন্দনবার্তা পাঠান তিনি। এসব বার্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয় শুভেচ্ছা।
এ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন অনেকেই। তাদের মতে, একজন উপাচার্য ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনীতিককে অভিনন্দন জানাতেই পারেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক প্যাডে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের নেতাকে অভিনন্দন জানানো ব্যক্তিগত সৌজন্যের পর্যায়ে থাকে না; এতে প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের বার্তা তৈরি হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অরাজনৈতিক চরিত্র ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
যদিও উপাচার্য নাজমুস সাদাতের ভাষ্য, নতুন দায়িত্ব পাওয়ায় শুধুই ‘কার্টেসি’ (সৌজন্য) হিসেবে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হওয়ায় ফরহাদ হালিম ডোনারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক প্যাডে অভিনন্দন জানালেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম। পরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা সম্মতি ছাড়াই ‘শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে’ রাজনৈতিক দলের একজন নেতাকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অরাজনৈতিক চরিত্র ও নিরপেক্ষতার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ায় রুহুল কবির রিজভীকে অভিনন্দন জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় বিজ্ঞপ্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের একাংশের সমালোচনার পর প্রায় ২ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাড ও জনসংযোগ দপ্তর ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের অভিনন্দন জানানোর নতুন সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উপাচার্যদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়; তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ব্যবহার করে দলীয় নেতাদের অভিনন্দন জানানোর প্রবণতা সেই বিতর্কে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন বললেন, ‘উপাচার্যের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাডে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকে অভিনন্দন জানান, তখন সেটি আর তার ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। কারণ সেখানে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্ব করার একটি বার্তা তৈরি হয়। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিচয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা থাকা জরুরি।’
‘শুধু উপাচার্য নিয়োগে দলীয় বিবেচনা আছে কি না, সেটি দেখলেই হবে না; দায়িত্ব পাওয়ার পর উপাচার্যরা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করছেন, সেটিও দেখতে হবে। রাজনৈতিক দলের নেতাদের পদ পাওয়া উপলক্ষে নিয়মিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো শুরু হলে ভবিষ্যতে সেটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজনের আশঙ্কা বাড়বে’— যোগ করলেন অধ্যাপক আলমগীর।
উপাচার্যদের কর্মকাণ্ড ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের পাশাপাশি তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়াও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। সরকার বদলেছে, ক্ষমতাসীন দল বদলেছে; কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
এ বছর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নতুন উপাচার্য। তাদের কয়েকজনের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রকাশ্যে থাকায় নিয়োগ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে ২০২৫ সালে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সার্চ কমিটি গঠনের। পরে ২০২৬ সালের এপ্রিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন করে পুনর্গঠন করে সার্চ কমিটি। কমিটির কাজ সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই করে তিনজনের তালিকা তৈরি এবং সেখান থেকে একজনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা। কিন্তু এই কমিটির গঠন ও কার্যকারিতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের নেতৃত্বে স্বাধীন ও স্বচ্ছ সার্চ কমিটি গঠিত হলে নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে পারত আরও গ্রহণযোগ্য।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে একক ও সুস্পষ্ট যোগ্যতার কাঠামো না থাকাও বিতর্কের অন্যতম কারণ। গবেষণা, প্রকাশনা, অ্যাকাডেমিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কিংবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মতো বিষয়গুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তার নেই অভিন্ন মানদণ্ড। ফলে নিয়োগের সময় রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা সহজেই সামনে চলে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যাটি কোনো একটি দলের নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা উপাচার্যসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ যেমন ছিল, তেমনি এখন বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তন হলেও যদি শুধু রাজনৈতিকবলয় পরিবর্তন হয়; কিন্তু নিয়োগের কাঠামো ও সংস্কৃতি একই থাকে— তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন।
রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের পাশাপাশি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে অভিনন্দন জানানোর সংস্কৃতিও। কোনো রাজনৈতিক নেতা দলীয় পদে দায়িত্ব পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হলে সেটি ভবিষ্যতে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের ক্ষেত্রেও একইভাবে করার প্রত্যাশা সৃষ্টি করতে পারে।
গোবিপ্রবি উপাচার্যের অভিনন্দনবার্তার প্রসঙ্গ টেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলছিলেন, ‘শুধু বর্তমান সরকার নয়, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও উপাচার্যদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার নজির ছিল।’
তার মতে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক বলয় বদলালেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয় প্রভাবের সংস্কৃতি বদলায়নি। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্যাড ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলের নেতাদের অভিনন্দন জানানোর ঘটনা সে প্রবণতারই প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক বলেছেন, ‘একজন লোকের রাজনীতি করা কি অপরাধ?’ তার দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় অনুযায়ী সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স (দক্ষতা) বিবেচনা করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।