Image description

উচ্চশিক্ষার জন্য বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর প্রধান পছন্দ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় সেগুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে ব্যবসায় শিক্ষার ওপর জোর দিলেও গত এক দশকে ‘বিবিএ মডেল’ থেকে বের হয়ে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

শিক্ষার্থীদের পছন্দের জগতেও পরিবর্তন এসেছে; এখন কৃষি, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিষয়ক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির প্রবণতা বাড়ছে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী কমার পেছনে দুইটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান।

তিনি বলেন, ব্যবহারিক কাজ ও কোর্সের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সময় অনেক শিক্ষার্থীই আর বিজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেয় না। কারণ, এতে বিষয়ভিত্তিক চাকরির নিশ্চয়তা নেই। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যেকোনো একটি বিষয়ে ভর্তি হয়ে সরকারি চাকরির প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দেয়।

অধ্যাপক মজিবুর আরও বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি পরিশোধ করে শিক্ষার্থীরা সাধারণত তাদের পছন্দের বিষয়ে পড়তে পারে। অথচ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে ভর্তি হওয়াটা মূলত ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে, ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নয়। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে সুযোগ না পেয়ে অন্য বিষয়ে পড়তে বাধ্য হয়।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিকে আসন বাড়ছে

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১৮টি নতুন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মোট শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ২০ লাখ। তবে এই সময়কালে বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিভাগে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর অনুপাত কমেছে।

গত এক দশকে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীর হার অন্তত আট শতাংশ বেড়েছে। সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের অনুপাত প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীর হার অন্তত ছয় শতাংশ কমেছে।

২০১৪ সালে ৩৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধিত ২৫ লাখ ৮৫ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র তিন লাখ শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, কৃষি ও কারিগরি বিষয়ে পড়াশোনা করত, যা মোট শিক্ষার্থীর ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ। ২০২৩ সাল নাগাদ ৫৩টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫ লাখ ৭৮ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান ও কারিগরি বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৭৩ জনে, যা মোট পরিমাণের মাত্র ৯ দশমিক ৯ শতাংশ।

২০১৪ সালে মানবিকে ৩৩ দশমিক ৬২ শতাংশ, সামাজিক বিজ্ঞানে ২৭ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। ২০২৩ সাল নাগাদ মানবিকে এই অনুপাত বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৬৯ শতাংশে। অন্যদিকে, সামাজিক বিজ্ঞানে ২৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র

২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। এই সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে ভর্তির হার ৩৪ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৫৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

শুরুর দিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হতো। তবে ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীর হার ২০১৪ সালের ৩৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

গত এক দশকে ২৮টি নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও, সে অনুপাতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়েনি; বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ২৭ হাজারের মতো।

২০১৪ সালে ৭৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় তিন লাখ ৩১ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত ছিল। ২০২৩ সাল নাগাদ ১০৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ ৫৮ হাজারে।

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন টাইমস’কে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবসময়ই যেসব বিষয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। যখন ব্যবসায় শিক্ষায় স্নাতকদের চাকরির নিশ্চয়তা বেশি ছিল, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবসায় শিক্ষায় মনোযোগ দিয়েছে। এখন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ক্যারিয়ারের সুযোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বিষয়গুলোতে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

তার মতে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় না, যা তাদের মানবিক বিভাগে বেশি জোর দেওয়ার কারণ। বিজ্ঞান শিক্ষার পাশাপাশি সমাজ ও মানবতা বিকাশের জন্য এই বিষয়গুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন তিনি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়েছে গবেষণার সক্ষমতা

গত এক দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণকালীন শিক্ষক এবং পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা তাদের শক্তিশালী গবেষণা সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।

ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্তত সাড়ে তিন হাজার পূর্ণকালীন শিক্ষক এবং প্রায় এক হাজার পিএইচডিধারী শিক্ষক যুক্ত হয়েছেন।

২০১৪ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১৪ হাজার ২১৯ জন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন, যাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে নয় হাজার জন ছিলেন পূর্ণকালীন। এ ছাড়া দুই হাজার ৭১৯ জন পিএইচডিধারী শিক্ষকের মধ্যে এক হাজার ৭৭ জন পূর্ণকালীন এবং এক হাজার ৬৪২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

২০২৩ সাল নাগাদ মোট শিক্ষকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪৮৯ জনে, যার মধ্যে প্রায় ১৩ হাজারই পূর্ণকালীন। পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যাও বেড়ে হয়েছে তিন হাজার ৬০৩ জন, যার মধ্যে দুই হাজার ৭২ জন পূর্ণকালীন এবং এক হাজার ৫৩১ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক।

একই সময়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার থেকে বেড়ে ১৭ হাজার হয়েছে। উভয় বছরেই পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা ছিল মোট শিক্ষক সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের ক্ষেত্রেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবধান কমিয়ে এনেছে। গত এক দশকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অনুপাত ১:১৯ থেকে উন্নত হয়ে ১:১৮ হয়েছে, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অনুপাত ১:২৩ থেকে উন্নত হয়ে দাঁড়িয়েছে ১:২১-এ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স সেল (আইকিউএসি)-এর পরিচালক অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান টাইমসকে বলেন, একটি দেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় যত বেশি জোর দেবে, জাতীয় উন্নয়নে তার অবদান তত বেশি হবে। উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশে পরিণত হতে হলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে।

শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে এক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়ছে আগ্রহ

সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় শিক্ষার্থীরা দিন দিন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বেশি বেছে নিচ্ছে।

২০১৪ সালে দেশের ৩২টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১১টি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি ছিল, আর বাকি ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করত।

২০২৩ সাল নাগাদ ৫০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫টি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ১৪ শতাংশে। অন্যদিকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর অনুপাত বেড়ে হয়েছে ৩৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১০টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ, ১১টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ৫টি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ৫টি চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ এবং বাকি ৪টি অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দশমিক ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পিছিয়ে নারী শিক্ষার্থীরা

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তবে নারীদের অংশগ্রহণ সেখানে তুলনামূলকভাবে এখনো কম।

এক দশক আগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ছিলেন মাত্র ২৬ জন। ২০২৩ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লিঙ্গভিত্তিক এই ব্যবধান কিছুটা কম। ২০১৪ সালে প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন ৩২ জন, যা এক দশক পর বেড়ে হয়েছে ৩৯ জন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ আরও বেশি দেখা যায়। এক দশক আগে যেখানে প্রতি ১০০ জনে নারী শিক্ষার্থী ছিলেন ৪৩ জন, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে।

অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, একাধিক সন্তান রয়েছে এমন অনেক পরিবারে ছেলেদের এখনো বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাবা-মা যদি মাত্র একজন সন্তানকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সামর্থ্য রাখেন, তবে তারা মেয়ের চেয়ে ছেলের পেছনে বিনিয়োগ করতেই বেশি পছন্দ করেন।