ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং ও ক্যান্টিনে দীর্ঘদিন ধরেই অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের অভিযোগ রয়েছে। দামের তুলনায় খাবারের মান ও পুষ্টিগুণ এতটাই নাজুক যে, তা খেয়ে প্রতিনিয়তই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। এই সমস্যার কার্যকর সমাধান না হওয়ায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে উদাসীনতার অভিযোগ তুলেছেন উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা।
ঢাবির আবাসিক শিক্ষার্থীদের বড়া অংশই আসেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। বাইরে থেকে নিয়মিত দামি খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় হলের ক্যান্টিনই তাদের ভরসা। কিন্তু সেখানেও হতাশা। সরেজমিন কয়েকটি হলের ক্যান্টিন ঘুরে দেখা গেছে, স্যাঁতসেঁতে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার রান্না করা হচ্ছে। রান্নায় নিয়োজিতদের বেশিরভাগই শিশু, যাদের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে ন্যূনতম কোনো ধারণা নেই। অভিযোগ রয়েছে, রান্নায় নিম্নমানের তেল, ক্ষতিকর টেস্টিং সল্টসহ নানা অস্বাস্থ্যকর উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এমনকি ভাত বা তরকারিতে পোকা পাওয়ার ঘটনাও ক্যাম্পাসে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবি সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী কানিজ ফাতেমার মতে, নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবেই ক্যান্টিন মালিকরা এই স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ নিচ্ছেন।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী ফাহাদ সানজিদ বলেন, ‘হলের খাবারের মান এতটাই নিচে নেমেছে যে, তা খেয়ে আমাদের পুষ্টির চাহিদা তো পূরণ হয়-ই না, উল্টো পেটের পীড়াসহ নানা রোগে ভুগতে হয়।’ যেমন বুধবার বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলে খাবার খেয়ে কিংবা পানি পানে বিষক্রিয়ায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন অর্ধশতাধিক ছাত্রী। হল প্রশাসন এখনও এই অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি। হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মাহবুবা সুলতানা বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, হলের পানি থেকে এই দুর্ঘটনা। পরীক্ষাগারে পানি পাঠানো হয়েছে। ফলাফল এলে কারণ জানা যাবে।’
খাবারের দাম ও মান নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলোর মাঝেও। ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘একসময় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্যান্টিনগুলোতে বিনামূল্যে খেতেন বলে মালিকরা ভালো খাবার দিতে পারতেন না। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি না থাকলেও মান বাড়েনি, যার মূল দায় প্রশাসনের উদাসীনতার।’ তিনি হলের ডাইনিংগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে এনে ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানান।
তবে ছাত্রদলের ঢাবি শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিএম কাওসার মনে করেন, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ক্যান্টিন মালিকরা আন্তরিক হলে এই দামেই মানসম্মত খাবার দেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নেতাদের ব্যর্থতারও সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, ‘ডাকসুর আগে ও পরে খাবারের মানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ডাকসু নেতৃবৃন্দ খাবারের মানের বিষয়ে অনেক ইশতেহার দিয়েছেন। কিন্তু তারা তাদের ইশতেহার বাস্তবায়নে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।’
অন্যদিকে ক্যান্টিন মালিকদের দাবি, নির্ধারিত কম দামে খাবার বিক্রি করে মান ধরে রাখা কঠিন। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যান্টিন মালিক জমির উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে ভালো খাবার দিতে গেলে আমাদের আর কোনো লাভ থাকে না।’
জানতে চাইলে ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা প্রশাসনের অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত তদারকি করছি এবং ক্যান্টিনগুলোতে ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছি, কিন্তু প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমরা টিসিবি থেকে পণ্য কেনার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর টিসিবি আর তাতে সাড়া দেয়নি।’
ভর্তুকি ও টিসিবি পণ্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘টিসিবি থেকে পণ্য কিনতে পারলে আমাদের আর খাবারে আলাদা করে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। তখন বর্তমান দামেই শিক্ষার্থীরা মানসম্মত খাবার পাবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আগামী প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় আলোচনা করব।’
