Image description

মাওলানা শাহীদুর রহমান – এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের অবসর।

লিখেছেন: নাসির উদ্দীন খান দাখিল-২০০৫, পাটকেলঘাটা আল-আমিন ফাজিল মাদরাসা।

আমাদের জীবন-আকাশের আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র যেন ধীরে ধীরে আড়ালে সরে গেল। পৃথিবীর শুরু থেকে নবী-রাসুলগণের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি এমন কিছু মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে, যারা সারাজীবন উম্মাহকে নিয়ে ভাবেন, তাদের ছাত্রদের নিয়ে ভাবেন, ভালোবাসেন। যাদের চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পথহারা মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া। সেই মহান সাধকদের কাতারের একজন বলেই আমি মনে করি-আমার প্রিয় উস্তায মাওলানা শাহীদুর রহমান হুজুরকে। ৪ মার্চ ২০২৬, বুধবার আমাদের প্রিয় উস্তায হযরত মাওলানা শাহীদুর রহমান হুজুর দীর্ঘ কর্মজীবনের ইতি টেনে পাটকেলঘাটা আল-আমিন ফাজিল মাদরাসা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

তাঁর বিদায়ে ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ যেন আবেগে ভারী হয়ে ওঠে। শৈশব থেকে মধ্যবয়স পর্যন্ত তাঁর স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁর সান্নিধ্যে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি আজও হৃদয়ের গভীরে আলোড়ন তোলে। অবসরের পর সেই স্মৃতিগুলো আরও ঘন ঘন ফিরে আসে-কখনো মধুর অনুভূতি জাগায়, আবার কখনো মনকে অকারণ বিষণ্ন করে তোলে।

হুজুরকে আমি শিক্ষক হিসেবে পাই মূলত ২০০১ সালের পর, আল-আমিন মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে। তবে হুজুরের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা আরও আগে-পাটকেলঘাটা বাজারের পশ্চিম পাশে চৌগাছা মাঠে, তীব্র রোদের মধ্যে ইস্তিসকার নামাজ আদায়ের এক মর্মস্পর্শী মুহূর্তে। সেদিন তাঁর অশ্রুসজল চোখে করা মুনাজাত আমার হৃদয়ে এমন এক গভীর ছাপ ফেলেছিল, যা আজও অমলিন হয়ে আছে। মনে হয়েছিল-এ যেন শুধু একটি দোয়া নয়, বরং আল্লাহর দরবারে এক নিবেদিত বান্দার আকুল আর্তি। এছাড়াও সাংগঠনিক কাজে তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে-যা সময়ের সাথে আরও গভীর হয়েছে। হুজুরের শৈশব: হুজুরের শৈশব ছিল খুবই সাধারণ ও সরল। ছোটবেলা থেকেই তাঁর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল এবং দ্বীনের প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তিনি মনোযোগ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের পথ তৈরি করেছেন।

মাওলানা শাহীদুর রহমান হুজুর ৪ মার্চ ১৯৬৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটা থানার কুমিরা ইউনিয়নের কুমিরা গ্রামে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় কলারোয়া হামিদিয়া মাদরাসায়। তিনি ১৯৮০ সালে দাখিল, ১৯৮২ সালে আলিম, ১৯৮৬ সালে হাদীসে কামিল এবং ১৯৯০ সালে ফিকহে কামিল সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী। নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি, মসজিদে আজান দেওয়া এবং খণ্ডকালীন ইমামতির দায়িত্ব পালন করতেন। একই সঙ্গে সংগঠনের কাজেও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। সাংগঠনিক জীবন: ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে তিনি ইসলামী ছাত্র শিবিরের সমর্থক, কর্মী, সাথী এবং ১৯৮৫ সালের দিকে সদস্য হন। বিভিন্ন উপশাখার দায়িত্ব পালন শেষে তিনি তালা উপজেলার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে খুলনা জেলা দক্ষিণের (কয়রা-পাইকগাছা) সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ছাত্ররাজনীতি করার সময় তিনি বিরোধী পক্ষের হাতে নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৮৮ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং ১৯৮৯ সালে রুকনিয়াতের শপথ গ্রহণ করেন। তিনি সরুলিয়া ইউনিয়ন ও কুমিরা ইউনিয়নের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে তালা ও পাটকেলঘাটা থানা ও উপজেলা শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি তালা উপজেলার নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাংগঠনিক জীবনে তিনি ছিলেন সাহসী, দৃঢ়চেতা ও আপসহীন। স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে তিনি বহুবার কারাবরণ করেছেন এবং একাধিক মামলার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতাই তাঁকে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কর্মস্থলে যোগদান: মরহুম মাওলানা কাজী শামছুর রহমান (রহ.)-এর নির্দেশে এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে তিনি পাটকেলঘাটা আল-আমিন ফাজিল মাদরাসায় সহকারী মৌলভী হিসেবে যোগদান করেন। সেই দিন থেকেই শুরু হয় তাঁর এক বরকতময় খেদমতের সফর-ইলমে দ্বীনের খেদমত, নাসিহত ও তারবিয়াতের এক অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কুরআনুল কারীম, হাদীসে এবং আরবি সাহিত্য পাঠদানের মাধ্যমে অসংখ্য তালিবুল ইলমকে নূরের পথে পরিচালিত করেছেন। তাঁর দারস ছিল শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়-বরং ছিল তাযকিয়া, তারবিয়াত এবং রুহানিয়াতের এক জীবন্ত মজলিস। সহকারী মৌলভী পদে নিয়োজিত থাকলেও তাঁর খেদমতের পরিধি ছিল অনেক বিস্তৃত। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন আদব, ইখলাস, ইহতেসাব ও ইলমের প্রতি ভালোবাসা। কীভাবে মানুষকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে ইলম অর্জন করতে হয়-এসব তিনি শুধু ভাষায় নয়, নিজের আমল ও আখলাকের মাধ্যমে আমাদের মাঝে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।

সত্যি বলতে কী-এমন উস্তাযই তো হওয়া উচিত, যারা শুধু কিতাব নয়, কিতাবের রুহও শিক্ষা দেন। কী পরিপূর্ণ ও বরকতময় একটি জীবন! কত জীবনকে তিনি ছুঁয়েছেন, কত হৃদয়কে জাগ্রত করেছেন; কত মানুষকে হেদায়াতের পথে অনুপ্রাণিত করেছেন-সেই হিসাব হয়তো আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কারও জানা নেই। হুজুরের দারসে অংশ নেওয়া মানে ছিল এক ধরনের ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া-ইলম ও আমল, দুনিয়া ও আখিরাত, জ্ঞান ও চরিত্রের এক অপূর্ব সমন্বয়। তিনি আজীবন এই ভারসাম্য শিক্ষাই দিয়ে গেছেন। বিশেষ করে কুরআন ও হাদীসের ওপর তাঁর দারস ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র। সাধারণ দারসকারীদের মতো নিছক পাঠদান নয়-বরং তাঁর দারসে ছিল গভীর আন্তরিকতা, খুশু-খুযু এবং এক ধরনের রুহানিয়াত, যা শ্রোতার অন্তরকে নাড়িয়ে দিত, চোখকে সিক্ত করত এবং অন্তরে ইলমের প্রতি মহব্বত জাগিয়ে তুলত। জ্ঞান, ভাষা ও ব্যক্তিত্ব: মাওলানা শাহীদুর রহমান হুজুরের শব্দচয়ন ছিল অত্যন্ত মার্জিত, প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী। তাঁর উচ্চারণ ছিল স্পষ্ট, সাবলীল ও আকর্ষণীয়। আরবি ব্যাকরণে তাঁর দখল ছিল অসাধারণ; পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপরও ছিল গভীর জ্ঞান। তিনি অসংখ্য কবিতা মুখস্থ বলতে পারতেন এবং প্রাসঙ্গিক মুহূর্তে সেগুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতেন। তাঁর বক্তব্যে কুরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতি এমনভাবে উপস্থাপিত হতো-যা শুধু শ্রেণিকক্ষেই নয়, বাইরের বক্তব্যেও শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর প্রভাব বিস্তার করত। শিক্ষকতা ও চরিত্র: তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ও দায়িত্বশীল শিক্ষক।

মাদরাসার দরস ও অন্যান্য দায়িত্ব পালনে সর্বদা সচেতন ও যত্নবান ছিলেন। দায়িত্বে কখনো অবহেলা করেননি। মাদরাসার উন্নয়নমূলক কাজেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে-বিশেষ করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় উপস্থিতি। নামাজের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর ও আন্তরিক। ছাত্রদের শুধু উপদেশ দিতেন না, বরং একপ্রকার বাধ্য করতেন নামাজ আদায়ে। কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি জামাতে নামাজ আদায় করতেন এবং তাহাজ্জুদ নামাজ তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল। পোশাক, খাদ্যাভ্যাস ও চলাফেরায় ছিল সংযম, বিনয় ও আন্তরিকতা। তিনি ছিলেন নিরহংকার, লৌকিকতামুক্ত এবং পরম মানবিক। ছাত্রদের প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল অপরিসীম। তিনি তাদের উৎসাহ দিতেন, পথ দেখাতেন এবং প্রয়োজনে ছায়ার মতো পাশে দাঁড়াতেন। অনেকের জীবনেই তিনি এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস। বিদায় হে আলোর দিশারী । বিদায়লগ্নে অশ্রু চোখে, আনত মাটির পানে, কেমনে জানাই বিদায় হুজুর, এ বিষাদ ভরা মনে।

জ্ঞানের আলোয় গড়লেন মোদের, আঁধার চিরতরে, স্নেহ-শাসন আর দোয়ায় রাঙালেন কত আহারে…. আপনি আমাদের অসংখ্য অবিস্মরণীয় স্মৃতি উপহার দিয়েছেন, যা আমরা চিরকাল লালন করব! ছাত্রদের স্মৃতিতে প্রিয় শিক্ষক: আমাদের প্রাণপ্রিয় শিক্ষক মাওলানা শাহীদুর রহমান হুজুর শুধু একজন শিক্ষকই নন-তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষাগুরু, একজন নির্মাতা। মাহফুজ লিখেন: ক্লাসে তিনি অত্যন্ত যত্নসহকারে আমাদের ভাষাগত ভুলগুলো সংশোধন করতেন। আমরা যখন ভুল করে বলতাম-“পেলান্টিক”, “সাইকেলের মাঠঘাট” বা “সোয়েটারের চেইন”-তখন তিনি ধৈর্যের সাথে শুদ্ধ শব্দ শিখিয়ে দিতেন-“পেনাল্টি”, “মাডগার্ড”, “রানার”।

 এভাবেই তিনি আমাদের ভাষাকে শুদ্ধ করতেন, চিন্তাকে পরিশীলিত করতেন। আপনি একজন প্রকৃত শিক্ষাগুরু, একজন নিবেদিত সংগঠক-আপনার জন্য রইল অফুরন্ত দোয়া ও ভালোবাসা। হাফেজ জহির লিখেন: আমি হুজুরের কাছে প্রাইভেট পড়তাম। একবার মাসিক বেতন দেওয়ার পর হুজুর সেই টাকা দিয়ে তাঁর স্ত্রীর জন্য একটি শাড়ি কিনেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই শাড়িটি তাঁর ব্যাগ থেকে চুরি হয়ে যায়। ঘটনাটি আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল-আজও তা বেদনাময় স্মৃতি হয়ে আছে। আরেকটি স্মৃতি: সম্ভবত ২০০৬ সালের ঘটনা। হুজুর ঢাকায় আসবেন এবং আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ওখানে থাকা যাবে?” আমি বিনা দ্বিধায় বললাম, “জি হুজুর।” অথচ তখন আমি নিজেই মিল্লাত হোস্টেলে থাকতাম-থাকার কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা ছিল না। তবুও হুজুর আসবেন শুনে আমার আনন্দের সীমা ছিল না। শিক্ষকদের সাথে সুসম্পর্ক থাকার কারণে সাহস করে বিষয়টি জানাই। আল্লাহর রহমতে একজন শিক্ষক দেশের বাড়িতে থাকায় তাঁর কক্ষে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়।

 সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও একটি কষ্টের স্মৃতি থেকে গেছে -ছারপোকার কারণে হুজুর সারারাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। সকালে মৃদু হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “হুমায়ূন, কী যেন কামড়েছে-সারারাত ঘুমাতে দিল না!” মো. শহীদুজ্জামান লিখেন: আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি-২০০৩ সালের কথা। একদিন হুজুর ক্লাসে এসে ফজরের নামাজের হিসাব নিলেন। আমি বললাম, “হুজুর, আমি তো ফজরের নামাজ পড়িনি।” তিনি বললেন, “শহীদুজ্জামান, তুমি আগে ফজরের নামাজ পড়ে এসো, তারপর ক্লাসে বসবে।” এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো আজও মনে পড়লে একদিকে কষ্ট লাগে, অন্যদিকে হৃদয় ভরে যায় অমলিন ভালোবাসায়। এইভাবেই অসংখ্য স্মৃতি, শিক্ষা ও ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে আজও আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছেন-এবং থাকবেন আমাদের সকলের প্রিয় উস্তায মাওলানা শাহীদুর রহমান হুজুর।

আল্লাহ তাঁকে সুস্থতা, দীর্ঘায়ু এবং তাঁর জীবনের সকল খেদমত কবুল করুন। আমিন। তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন: হাফেজ জহির, হুমায়ুন, শহীদুজ্জামান, মাসুম, মাহফুজ, খায়রুল ও সাব্বির। ডিজাইন ও প্রুফরিডিং: শাওন।