শিবলি সাদিক পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘অন্তরে অন্তরে’ মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। সালমান শাহ ও মৌসুমী অভিনীত রোমান্টিক ঘরানার এই চলচ্চিত্র ছিল ব্যবসাসফল। ‘অন্তরে অন্তরে’ চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্যের চিত্রায়ণ হয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিনে। বিশেষ করে একটি গানের চিত্রায়ণ হয় প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের ছেঁড়াদিয়ায়। ‘অন্তরে অন্তরে’ চলচ্চিত্রে দেখা সেন্ট মার্টিন ও ছেঁড়াদিয়া ৩২ বছরে অনেকখানি পাল্টে গেছে। বিশেষ করে ছেঁড়াদিয়ার প্রাকৃতিক পাথর, বিশাল কেয়াবনের অনেকটুকুই নষ্ট হয়ে গেছে।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা ফিরোজ আহমদ খান ‘অন্তরে অন্তরে’ চলচ্চিত্রের শুটিং কাছ থেকে দেখেছিলেন। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালে সালমান শাহ ও মৌসুমীর একটি গানের দৃশ্যের শুট হয় সেন্ট মার্টিনের ছেঁড়াদিয়ায়। সে সময় ছেঁড়াদিয়াজুড়ে ছিল কেয়াবন। সৈকতে ছিল বড় বড় পাথর। এমন একটি পাথরের ওপর দাঁড়ানো অবস্থায় নায়িকা মৌসুমীর চিত্র ধারণ করা হয়। ছিল বেশ কয়েকটি ঝাউ ও কাঠবাদামগাছ। তবে কয়েক দশকে ছেঁড়াদিয়ায় কেয়াবনের বেশির ভাগই বিলুপ্ত হয়েছে। নেই ঝাউ ও কাঠবাদামগাছ। ক্ষয় হয়ে গেছে বড় পাথরও।

সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা মুজিবুর রহমানও সালমান শাহ-মৌসুমীর চলচ্চিত্রের শুটিং দেখেছিলেন দ্বীপে। ‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমায় দেখা দৃশ্যচিত্রের সঙ্গে এখনকার সেন্ট মার্টিনের তুলনা করতে বললে তিনি বলেন, তখন সেন্ট মার্টিন বাজার ঘাট থেকে স্পিডবোট ও কাঠের ট্রলার নিয়ে ছেঁড়াদিয়ায় যেতে হতো। ভাটার সময় সাগরের পানি নেমে গেলে পাথরখণ্ড ভেসে উঠত। সিনেমায় যে কেয়াবন দেখা গেছে, সেটি ধীরে ধীরে পর্যটকের ভিড়ে হারিয়ে গেছে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের ধাক্কায় দ্বীপের বড় পাথর ক্ষয়ে ছোট হয়ে গেছে।
সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই বছর ধরে ছেঁড়াদিয়ায় কেউ যেতে পারছেন না। এ কারণে দ্বীপের ওই অংশ আবারও আগের রূপে ফিরছে। সামুদ্রিক জীব, প্রবালসহ জীববৈচিত্র্য বেড়েছে। ফিরে আসছে শামুক-ঝিনুকমুজিবুর রহমান, সেন্ট মার্টিন দ্বীপের বাসিন্দা।
মুজিবুর রহমান আরও বলেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই বছর ধরে ছেঁড়াদিয়ায় কেউ যেতে পারছেন না। এ কারণে দ্বীপের ওই অংশ আবারও আগের রূপে ফিরছে। সামুদ্রিক জীব, প্রবালসহ জীববৈচিত্র্য বেড়েছে। ফিরে আসছে শামুক-ঝিনুক।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা প্রথম আলোকে বলেন, দুই বছর ধরে ছেঁড়াদিয়াতে পর্যটকের যাতায়াত নিষিদ্ধ। সেখানে নতুন করে গাছপালা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। সামুদ্রিক কাছিম ডিম পাড়তে আসছে। তবে বালুচরে পড়ে থাকা মৌসুমি পাথর দেখার সুযোগ নেই।

চার ভাগে বিভক্ত হচ্ছে সেন্ট মার্টিন
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ রক্ষা করতে সরকার একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, দ্বীপটিকে চারটি অঞ্চল বা জোনে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাংশ নিয়ে গঠন করা হয় ‘জেনারেল ইউজ জোন’। এই অংশে পর্যটনসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো যাবে। সব হোটেল–রিসোর্ট থাকবে এই অংশে। দ্বীপের মধ্যভাগে গলাচিপা এলাকায় হবে ‘ম্যানেজড রিসোর্স জোন’। এখানে কাছিমের প্রজনন হয়। এই অংশে পর্যটকেরা দিনের বেলায় ঘুরে বেড়াতে পারবেন, তবে রাতে থাকতে পারবেন না। দ্বীপের সর্বদক্ষিণের দিয়ার মাথা নিয়ে হবে ‘সাসটেইনেবল ইউজ জোন’। এখানে প্রাকৃতিক ঝোপঝাড়, প্যারাবন, কেয়াবন, জলাধার রয়েছে। এখানেও পর্যটকেরা দিনে ঘুরতে পারবেন, তবে রাতে থাকা যাবে না। আর সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণে ছেঁড়াদিয়া, গোলদিয়া নিয়ে হবে ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই জোনে কাউকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে না।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহিনা আহমেদ বলেন, দ্বীপের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য মূলত এ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক স্বাভাবিক নিয়মেই গড়ে উঠবে, দ্বীপের ক্ষতি করার অধিকার কারও নেই।