ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিবাদে ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। অভিনেত্রীর ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি হামলার শিকারে বাঁধনের প্রতি সংহতি জানিয়ে নিজের ফেসবুক পোস্টে শিল্পীদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
সামাজিক মাধ্যমে এ ঘটনায় দীর্ঘ ও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মঙ্গলবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাদের জায়গা করে দেওয়া এবং এ বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তোলেন।
আওয়ামী লীগের ‘সফট পাওয়ার’কে এখনো বিভিন্নভাবে জায়গা করে দেওয়ার কারণেই দেশে-বিদেশে জুলাই সমর্থকদের সঙ্গে এমন আচরণ করার সাহস তৈরি হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের এ সংস্কৃতি উপদেষ্টা।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, আওয়ামী লীগ ‘অনুশোচনায় না ভুগে’ দেশে-বিদেশে যে আচরণ করছে, এর দায় তাদেরও, যারা জুলাই গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পুনর্বাসনের পক্ষে গণমাধ্যমে লিখছেন। তিনি বলেন, এই দায় ওইসব মানুষের, যারা জুলাই গণহত্যার সম্মতি উৎপাদনকারীদের এবং সিমপ্যাথাইজারদের টেলিভিশন মিডিয়ায় স্পেস দিছিলেন গণহত্যাকারী দল আর অন্যদের এক পাল্লায় তুলে কথা বলার জন্য।
এ নির্মাতা বলেন, যাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এই কথা বলার জন্য যে— আচ্ছা তারেক রহমান লন্ডন থেকে রাজনীতি করতে পারলে খুনি হাসিনা কেন ভারত থেকে সেটি করতে পারবে না? যেন তারেক রহমান জুলাই গণহত্যা করে, হাজার হাজার মানুষ গুম-খুন করে জনতার দৌড়ানি খেয়ে পালিয়ে লন্ডন গেছিলেন?
'ফ্যাসিবাদের মূলশক্তি হচ্ছে এর কনসেন্ট উৎপাদনকারীরা’— এমনটি জানিয়ে এ নির্মাতা বলেন, এই দায় আমাদের জুলাইয়ের পক্ষ শক্তির সবার, যারা নিজেদের পাওয়ার স্ট্রাগলে আপার হ্যান্ড নেওয়ার জন্য, যার যার মতো করে এসব নুইসেন্সকে উসকে দিছি। এই দায় আমাদের অন্তর্বর্তী এবং বিএনপি সরকারের।
তিনি বলেন, কারণ আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধীদের বিচার বা তিরস্কারের আওতায় আনতে পারিনি। এদের একটা কমিশনের সামনে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি না করার ফলে এরাই দেশে বসে বসে কুঁই কুঁই করার মধ্য দিয়ে বিদেশে থাকা আওয়ামী জঙ্গিদের ফুয়েল জোগাচ্ছে।
গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে কড়া সমালোচনা করে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, বিএনপি সরকারের একটি অংশ ‘মিডিয়া এবং কালচারকে আওয়ামী ও সিআরআইয়ের হেফাজতে তুলে দিচ্ছে’।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে সরকারের ভেতরে কারা ‘ফ্যাসিবাদের সফট পাওয়ারকে স্পেস দিচ্ছে’ এবং কারা তাদের ক্ষমতায়িত করছে, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে এ নির্মাতা বলেন, 'এই দায় আমাদের বিএনপি সরকারের একটা অংশেরও, যারা মিডিয়া ও কালচারকে আওয়ামী এবং সিআরআইয়ের হেফাজতে তুলে দিছে ও দিচ্ছে। '
তিনি বলেন, 'আপনি বিপ্লবপরবর্তী সরকার চালাবেন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে, আর আপনার মিডিয়া এবং কালচার ক্যানন হবে বাকশাল আর সিআরআই— এটি একটি অবিশ্বাস্য কম্বিনেশন।'
ফারুকী বলেন, 'এই দায় আমাদের কালচারাল অঙ্গনের তাদের, যারা পুরো জুলাই মাসে চুপ থাকে, ফ্যাসিবাদী অপকর্ম নিয়ে একটা কথাও বলে না, আর আগস্টের ১৫ তারিখ এলে বলে— ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’। এর মধ্য দিয়ে তারা বিদেশে থাকা এই জঙ্গিদের এ বার্তাই দেয় যে, তোমরা কোনো অপরাধবোধে না ভুগেই তোমাদের কাজ চালাতে পারো। শুধু একটা কথা লিখে রাখেন— একাত্তরের রাজাকারকে মানুষ যেমন ঘৃণা করে, চব্বিশের এই রাজাকারদেরও মানুষ একই চোখে দেখবে।
সরকারের সংশ্লিষ্টব্যক্তিরা সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কী ধরনের আলোচনা ও পরিকল্পনা হয়, সেগুলো সম্পর্কে জানেন কিনা। তার দাবি, এসব পরিকল্পনা কীভাবে পরে গণমাধ্যমে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে আসে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন এ সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা।
জুলাইয়ের ঘটনাকে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা না করার আহ্বান জানিয়ে ফারুকী বলেন, 'যারা এটা করছে তারা ভুলে যাচ্ছে, জুলাই একটা ওয়ান ইলেভেন মার্কা সরকার পরিবর্তন ছিল না যে বলবে— ‘যা হয়েছে হয়েছে, এসো মিলেমিশে খেলি’।
তিনি বলেন, তারা এটা ভুলে যাচ্ছে— জুলাইতে গণহত্যা হয়েছে, জুলাইয়ের আগে ষোলো বছর গুম-খুন ছাড়াও দেশটা লিটারালি অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়া হইছিল। তারা ভুলে যাচ্ছে, বাকশালীরা এখনো প্রতিমুহূর্তে অপেক্ষা করছে— একটা ছোবল মারার। মনে রাখবেন, ‘হৃদয়ে বাকশাল’র কাছে বিএনপিই হইলো আসল শত্রু।
সরকারপ্রধানের কাছে আহ্বান জানিয়ে ফারুকী বলেন,'আপনাকে প্রতিহিংসার আশ্রয় নিতে বলছি না। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং ইন্টেলেকচুয়াল অপরাধের জন্য তিরস্কার বরাদ্দ রাখার কথা বলছি। এদের এমপাওয়ার বা সেলিব্রেট না করার কথা বলছি।