Image description

প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগে অভিনেত্রী তানজিন নাহার তিশার বিরুদ্ধে করা মামলায় পুলিশের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেছেন বাদী। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেফাতুল্লাহের আদালতে এ আবেদন করা হয়।

আবেদনের বিষয়ে আংশিক শুনানি শেষে বিচারক বাদীকে মামলার সব সাক্ষী হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নারাজি আবেদনের পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২০ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজির দরখাস্ত দেওয়া হয়েছে। বিচারক আংশিক শুনে সাক্ষীদের আগামী ২০ অক্টোবর হাজিরের নির্দেশ দিয়েছেন।’

এর আগে ২০২৫ সালের ১০ মে পিবিআই এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়। তদন্তে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে বাদীর আনা প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগের কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি বলে মত দেওয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলার বাদী একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। তার গুলশানের ১২৭ নম্বর রোডে একটি ফ্যাশন হাউজ ও স্টুডিও রয়েছে। অন্যদিকে তানজিন তিশা মডেল ও অভিনেত্রী। বিভিন্ন ফ্যাশন ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশ নেওয়ার সূত্রে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তানজিন তিশা তার সাবেক ড্রাইভারের মাধ্যমে বাদীর কাছ থেকে একটি শাড়ি নেন। বাদীর দাবি, শাড়িটির মূল্য ৭৫ হাজার টাকা। অনুষ্ঠান শেষে পরদিনই শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা আর ফেরত দেওয়া হয়নি।

শাড়িটি ফেরত চেয়ে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিশাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান বাদী। তবে উভয়ের মেসেঞ্জার স্ক্রিনশট পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান, তিশা ওই বার্তাগুলো সিন করেননি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যস্ততার কারণে তিশা নিয়মিত ফেসবুক মেসেঞ্জার ব্যবহার করতেন না।

পরে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বাদী তিশাকে পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা জানান। ১৮ মে একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তাদের দেখা ও কুশল বিনিময় হয়। এরপর ফ্যাশন হাউজের ট্রায়াল রুম ও ব্যক্তিগত বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা ও মনোমালিন্য তৈরি হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বাদী আবার তিশাকে মেসেঞ্জারে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন। সেখানে প্রায় এক বছর ধরে শাড়িটি ফেরত না পাওয়ার কথা জানিয়ে লোক পাঠিয়ে সেটি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। জবাবে তিশা শাড়িটির বিষয়ে জানতে চান। পরে বাদী শাড়িটির ছবি পাঠান।

এরপর তিশা বাদীকে মেসেঞ্জারে কল করলেও বাদী তা রিসিভ করতে পারেননি। পরবর্তী কথোপকথনে তিশা শাড়িটির কথা মনে করতে পারছেন না এবং খুঁজে দেখে জানাবেন বলে জানান।

তদন্তে বলা হয়, তিশা জানান, তার সাবেক ড্রাইভারের শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই ড্রাইভার শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এ নিয়ে তিশা ও বাদীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।

এরপর ৭ নভেম্বর বাদী তিশাকে মেসেঞ্জারে ইংরেজিতে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে আগের বার্তাগুলো দেখতে এবং শাড়িটি ফেরত দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে তাকে হুমকি দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও উল্লেখ করা হয়।

জবাবে ১০ নভেম্বর তিশা ব্যক্তিগত সমস্যা ও পেশাগত বিষয় আলাদা রাখার অনুরোধ করেন। তাদের একসময় ভালো সম্পর্ক ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, শাড়ির বিষয়ে তার লোকজন ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বাদীর লোকজন যেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বার্তার পর ১২ নভেম্বর বাদী গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে বিষয়টি জানতে পেরে তিশা গুলশান থানা পুলিশের মাধ্যমে শাড়িটি ফেরত দিতে চাইলেও বাদী তা গ্রহণ না করে মামলা করেন।

মামলার তদন্তের সময় তানজিন তিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি জানান, বাদীর সঙ্গে একসময় তার খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এর আগে বাদীর কাছ থেকে আরও শাড়ি নিয়ে পরার পর সেগুলো ফেরত দিয়েছেন। এসব শাড়ির বিনিময়ে তিনি কোনো টাকা নেননি বলেও জানান।

তিশা তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা না হওয়ায় তিনি শাড়িটির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। তার আগের ড্রাইভার শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায় বিষয়টি জটিল হয়। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বাদীর ঠিকানা জানার চেষ্টা করেও তা পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

মামলার বিষয়টি জানার পর তিশা ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠান। নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তিনি শাড়িটি ডাকযোগে ফেরত পাঠান।

তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বাদীকে নোটিশ দিয়ে এবং তদন্তের সময় সরাসরি ও মোবাইল ফোনে মামলার অভিযোগের পক্ষে দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণ দিতে বলা হলেও তিনি কোনো দালিলিক প্রমাণ দেননি। অন্যদিকে তিশা শাড়িটি ফেরত পাঠিয়েছেন। এ কারণে শাড়ি নিয়ে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে মত দেন তদন্ত কর্মকর্তা।

হুমকির অভিযোগের বিষয়েও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর তিশার পাঠানো বার্তার শেষাংশে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার ঠিকানা জানতে চাওয়া এবং বাদীর সুন্দর জীবন কামনা করা হয়েছিল। ফলে ওই বার্তার মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সবশেষে তদন্ত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বাদী ও বিবাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে বাদীর আনা অভিযোগের বিষয়ে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।