চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এদিন কারাগারে থেকে আসামি ডনকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর পুলিশ প্রহরায় তাকে কাঠগড়ায় তোলা হয়। এ সময় তার গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট ও হাতে হাতকড়া ছিল। এরপর তার উপস্থিতিতে রিমান্ড শুনানি শুরু হয়। শুনানির সময় তার হেলমেট খুলে দেওয়া হয়। এ সময় তিনি নিরব ছিলেন।
রিমান্ড শুনানিতে যা উঠে এলো
শুনানিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক মো. মুজিবুর রহমান জানান, আসামি ডনসহ অন্যরা মিলে ভিকটিম সালমান শাহকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে তথ্য এসেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বিচারকের উদ্দেশে বললেন, ৩০ বছর আগে জনপ্রিয় নায়ক সালমানকে হত্যা করা হয়েছে।
এই মামলায় খলনায়ক ডন ছাড়া অপর আসামিরা পলাতক রয়েছেন। তাদেরকে চিহ্নিত করা, অবস্থান বের করা এবং হত্যায় কার কী ভূমিকা ছিল—এসব জানতে হবে। এছাড়া তাকে পালিয়ে যেতে কারা ইন্ধন দিয়েছে, সেটিও বের করতে হবে। সালমান শাহ হত্যা মামলার বিচার নিয়ে দেশবাসী উদ্বিগ্ন। তাই সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামি ডনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবুল কামাল খানসহ অন্য আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। তারা জানান, আমাদের সমাজে জজ মিয়া নাটক হয়েছে। থানা, ডিবি, সিআইডি ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে। সামগ্রিক তদন্তে এসেছে এটা আত্মহত্যা।
তারা আরও উল্লেখ করেন, রিমান্ডে নেওয়ার কোন যৌক্তিকতা নেই। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তার করে সম্মানহানি করা হচ্ছে। এতে তো ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হবে না। প্রয়োজন হলে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি প্রার্থনা করছি। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামি ডনের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আসামি ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় গত ২০ আগস্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক মো. মুজিবুর রহমান তার সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এ বিষয়ে আসামির উপস্থিতিতে শুনানির জন্য ২৭ আগস্ট দিন ধার্য করেন।
গত ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন আদালত। এই নির্দেশের পর ওইদিন মধ্যরাতে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাবেক স্ত্রী সামীরা হক ও খলনায়ক ডনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন— সামীরা হকের মা লতিফা হক লুছি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুসি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু, রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে চিত্রনায়ক সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই সময় প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়। এ বিষয়ে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলা হয়।
পরে ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। তবে প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক।
ওই প্রতিবেদনেও সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু বলা হয়। তবে কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর ছেলে হত্যা মামলার বাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজির আবেদন করেন। সর্বশেষ মামলাটি পিবিআই তদন্ত করে। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন। ২০২২ সালের ১২ জুন এই আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের হয়।