একসময় ঘড়ির প্রধান কাজ ছিল সময় দেখানো। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সেই ধারণা বদলে গেছে। এখন হাতের ঘড়িই হয়ে উঠছে ব্যক্তিগত প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্মার্টওয়াচের মাধ্যমে শুধু সময় দেখা নয়, ফোনের বার্তা ও কলের খবর পাওয়া, দৈনন্দিন চলাফেরার হিসাব রাখা, ব্যায়ামের তথ্য পর্যবেক্ষণসহ নানা কাজ করা যায়।
তবে বাজারে বিভিন্ন দামের অসংখ্য স্মার্টওয়াচ থাকায় অনেকেরই প্রশ্ন, এসব সুবিধার মধ্যে আসলে কোনগুলো প্রতিদিনের জীবনে কাজে আসে? স্মার্টওয়াচ কেনার আগে তাই এর বাস্তব ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।
ফোন হাতে না নিয়েও নোটিফিকেশন দেখা
স্মার্টওয়াচের অন্যতম জনপ্রিয় সুবিধা হলো ফোনের নোটিফিকেশন কবজিতে পাওয়া। নতুন বার্তা, কল, ক্যালেন্ডারের মনে করিয়ে দেওয়া কিংবা বিভিন্ন অ্যাপের গুরুত্বপূর্ণ খবর অনেক ক্ষেত্রে ফোন পকেট থেকে বের না করেই দেখা যায়।
কাজের সময় বারবার ফোন হাতে নেওয়ার অভ্যাস থাকলে এই সুবিধা বেশ কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে বৈঠক, ক্লাস কিংবা বাইরে চলাফেরার সময় গুরুত্বপূর্ণ নোটিফিকেশন দ্রুত দেখে নেওয়া সম্ভব হয়।
হাঁটা ও দৈনন্দিন চলাফেরার হিসাব
অনেক স্মার্টওয়াচে হাঁটার ধাপ, দূরত্ব এবং দৈনন্দিন চলাফেরার হিসাব রাখার সুবিধা রয়েছে। ফলে একজন ব্যবহারকারী প্রতিদিন কতটা সক্রিয় ছিলেন, তার একটি ধারণা পেতে পারেন।
দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাজ করেন এমন মানুষের জন্য এই সুবিধা নিজের দৈনন্দিন চলাফেরা সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পরপর উঠে হাঁটার অভ্যাস তৈরি করতেও এটি মনে করিয়ে দিতে পারে।
ব্যায়ামের সময় বাড়তি সহায়তা
দৌড়ানো, হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা অন্যান্য শরীরচর্চার সময় স্মার্টওয়াচ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কিছু মডেল ব্যায়ামের সময়, দূরত্ব, গতি এবং হৃদস্পন্দনের মতো তথ্য দেখায়।
ফলে যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তারা নিজেদের দৈনন্দিন কার্যক্রমের একটি হিসাব রাখতে পারেন। তবে স্মার্টওয়াচের এসব তথ্যকে চিকিৎসকের পরামর্শ বা চিকিৎসা পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ঘুমের অভ্যাস সম্পর্কে ধারণা
কিছু স্মার্টওয়াচ ঘুমের সময় এবং ঘুমের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে আনুমানিক তথ্য দেখায়। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী নিজের ঘুমের সময়সূচি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
প্রতিদিন কখন ঘুমাতে যাচ্ছেন, কতক্ষণ ঘুমাচ্ছেন এবং ঘুমের নিয়মিততা কেমন, এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে নিজের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জরুরি পরিস্থিতিতেও কাজে আসতে পারে
কিছু উন্নত স্মার্টওয়াচে পড়ে যাওয়া শনাক্ত করা, জরুরি যোগাযোগের সুবিধা কিংবা অবস্থান জানানোর মতো ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি বা একা চলাফেরা করেন এমন মানুষের ক্ষেত্রে এসব সুবিধা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উপকারী হতে পারে।
তবে এসব সুবিধা মডেলভেদে ভিন্ন এবং সব দেশে একইভাবে কাজ নাও করতে পারে। তাই কেনার আগে নিজের অঞ্চলে সংশ্লিষ্ট সুবিধাগুলো চালু আছে কি না, তা যাচাই করা উচিত।
ফোনের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে
স্মার্টফোনের কারণে অনেকেই অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার ফোনের পর্দা দেখেন। স্মার্টওয়াচে প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন দ্রুত দেখা গেলে প্রতিটি বার্তায় ফোন হাতে নেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।
অবশ্য এর বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে। অতিরিক্ত নোটিফিকেশন চালু রাখলে স্মার্টওয়াচ নিজেই মনোযোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশনগুলো বেছে চালু করাই ভালো।
ব্যাটারি ও সামঞ্জস্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
স্মার্টওয়াচ কেনার সময় শুধু নকশা বা দাম দেখলেই হবে না। ব্যাটারি কতক্ষণ চলে, ফোনের সঙ্গে কীভাবে সংযুক্ত হয় এবং আপনার ব্যবহৃত ফোনের সঙ্গে এটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেসব বিষয়ও দেখতে হবে।
কিছু ঘড়ি নিয়মিত চার্জ দেওয়ার প্রয়োজন হয়, আবার কিছু মডেল তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় চলে। তাই কেনার আগে নিজের ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী ব্যাটারির স্থায়িত্ব বিবেচনা করা উচিত।
সব সুবিধা সবার জন্য দরকার নেই
স্মার্টওয়াচে যত বেশি সুবিধা থাকবে, সেটি তত ভালো হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। কেউ যদি শুধু নোটিফিকেশন, সময় এবং হাঁটার হিসাব চান, তাহলে অনেক বেশি দামের ঘড়ি কেনার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
অন্যদিকে নিয়মিত ব্যায়াম করেন এমন ব্যক্তির জন্য উন্নত শরীরচর্চা পর্যবেক্ষণ সুবিধা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই অন্যের পছন্দ অনুসরণ না করে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী স্মার্টওয়াচ বেছে নেওয়াই ভালো।
কেনার আগে যে বিষয়গুলো দেখবেন
স্মার্টওয়াচ কেনার আগে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই যাচাই করা উচিত।
প্রথমত, আপনার ফোনের সঙ্গে ঘড়িটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। দ্বিতীয়ত, ব্যাটারি কতক্ষণ স্থায়ী হয়। তৃতীয়ত, আপনার প্রয়োজনীয় শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সুবিধা রয়েছে কি না। পাশাপাশি ঘড়িটির পানি প্রতিরোধের সক্ষমতা, পর্দার মান, আরামদায়ক ব্যবহার এবং বিক্রয়োত্তর সেবার বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত।
স্মার্টওয়াচ এখন আর শুধু সময় দেখার যন্ত্র নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি দৈনন্দিন কাজের হিসাব রাখা, ফোনের নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ, শরীরচর্চার অভ্যাস পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত সময় ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে।
তবে স্মার্টওয়াচ কেনার ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা আছে এমন মডেল বেছে নেওয়াই মূল বিষয় নয়। বরং নিজের প্রয়োজন, বাজেট, ফোনের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং যে সুবিধাগুলো সত্যিই ব্যবহার করবেন, সেগুলো বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তাহলেই স্মার্টওয়াচ হয়ে উঠতে পারে দৈনন্দিন জীবনের সত্যিকারের সহায়ক প্রযুক্তি।