বলিউড মানেই আলো ঝলমলে রূপালি পর্দা আর গ্ল্যামার। কিন্তু এই রঙিন দুনিয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকে অনেক অন্ধকার ও বেদনার গল্প। এমনই এক অবিশ্বাস্য ও মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী অভিনেতা কামাল সদানাহ।
১৯৯০ সালের ২১ অক্টোবর। ২০ বছরে পা দেওয়া তরুণ অভিনেতা কামাল সদানাহ বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন কেক কেটে জন্মদিন উদযাপনের উদ্দেশ্যে।
কিন্তু কে জানত, সেই খুশির রাতই পরিণত হতে যাচ্ছে এক বীভৎস রক্তপাতে! মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নিজের চোখের সামনে বাবা, মা ও বোনকে হারিয়ে পুরোপুরি একা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
বলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী সদানাহ পরিবার ও বান্দ্রার বিখ্যাত বাংলো জল কামালের সেই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের গল্প তিন দশক পরও সমানভাবে থমকে দেয় মানুষকে।
সেদিন ২০তম জন্মদিনে বন্ধুদের নিয়ে ঘরে ফেরার পরপরই হঠাৎ বিকট দুটি গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে বাংলোটি। দৌড়ে পাশের ঘরে গিয়ে কামাল দেখতে পান, রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে। গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন তার মা প্রখ্যাত অভিনেত্রী সাঈদা খান এবং বোন নম্রতা সদানাহ। আর পাশে হাতে রিভলভার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা— প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ব্রিজ সদানাহ!
কামাল কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবার রিভলভার ঘুরে যায় তার দিকে। সরাসরি গুলি চালানো হয় তার ওপর! অলৌকিকভাবে বুলেটটি কামালের ঘাড়ে লেগে বের হয়ে যায়, যা গুরুত্বপূর্ণ কোনো নার্ভ বা রক্তনালিকে স্পর্শ করেনি।
নিজের ক্ষত ও তীব্র রক্তপাতের তোয়াক্কা না করে মা ও বোনকে বাঁচানোর আকুতি নিয়ে হাসপাতালে ছোটেন তরুণ কামাল। কিন্তু চিকিৎসকরা চেষ্টা করার আগেই সব শেষ!
অপারেশনের পর যখন কামালের জ্ঞান ফেরে, তখন ডাক্তাররা জানান— তার মা, বোন এবং বাবা কেউ আর বেঁচে নেই! পুলিশ জানায়, সবাইকে গুলি করার পর নিজের ঘরে গিয়ে একই রিভলভার দিয়ে আত্মহত্যা করেন নির্মাতা ব্রিজ সদানাহ।
এই গণহত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ আজও জানা যায়নি, কারণ মূল অভিযুক্ত ব্রিজ সদানাহ ঘটনাস্থলেই মারা যান। তবে বলিউড সূত্রে জানা যায়, পরপর বেশ কিছু সিনেমা ফ্লপ করায় চরম পেশাগত হতাশায় ভুগছিলেন তিনি। দিনে দিনে অতিরিক্ত মদ্যপ হয়ে পড়েছিলেন এবং স্ত্রীর প্রতি মানসিক সন্দেহ তৈরি হয়েছিল তার।
ঘটনার দিনও তিনি অতিরিক্ত মদ্যপ ছিলেন বলে পরবর্তীতে নিশ্চিত করেন ছেলে কামাল। তাছাড়াও পরিবারের সাথে আগে থেকেই নানা বিষয় নিয়ে তার ঝগড়া হতো এবং এর আগেও একাধিকবার তিনি শূন্যে গুলি চালিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
সেই অভিশপ্ত রাতে কামালের বন্ধু আবীস রিজভী উপস্থিত না থাকলে হয়তো কামালকে সেদিন বাঁচানো যেত না। তিনিই রক্তে ভেজা কামালকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে এই আবীসই কামালের পরিচালিত ‘রোর’ সিনেমার প্রযোজনা করেছিলেন।
কিন্তু নিয়তির চরম পরিহাস— যে বন্ধু কামালকে এক রাতে মৃত্যুর মুখ থেকে টেনে তুলেছিলেন, ২০১৭ সালে ইস্তাম্বুলের রেইনা নাইটক্লাবে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় সেই আবীস রিজভীও প্রাণ হারান!
বন্ধুকে হারিয়ে কামাল ভেঙে পড়ে বলেছিলেন, ‘ভেবেছিলাম এক রাতে পরিবার হারিয়ে জীবনের সব কষ্ট দেখে ফেলেছি, কিন্তু কষ্টের কোনো শেষ নেই।’
মায়ের মৃত্যুর ঠিক এক বছর পর ১৯৯১ সালের ২১শে অক্টোবর নিজের ডেবিউ সিনেমা ‘বেখুদি’-র শুটিং সেটে গিয়ে কাজলকে বাঁচাতে কাঁদছিলেন কামাল! নিজের ২০তম জন্মদিনে যেখানে মা-বোনকে বাঁচানোর করুণ আকুতি ছিল, ঠিক এক বছর পর পরিচালকের নির্দেশে সেই একই দৃশ্য পুনরায় অভিনয় করতে হয়েছিল তাকে।
ক্যারিয়ারে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোই দেখেছেন তিনি। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো— কামাল সদানাহ আজও বান্দ্রার সেই একই বাড়িতে বসবাস করেন, যেখানে একদিন তার পরিবারের রক্ত ভেসেছিল!
নিজের এই অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তি নিয়ে কামাল সদানাহ বলেছেন, ‘আমি পৃথিবীতে একা ট্র্যাজেডির শিকার নই। লাখ লাখ মানুষ এর চেয়েও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান। কিন্তু অতীত বা ঘৃণা বুকে চেপে বাঁচা যায় না, আপনাকে সামনে এগোতেই হবে।’