Image description

রাজধানীর শাহবাগ মোড়। তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে হাসানুর রহমান আখের রস খেলেন। একরাশ স্বস্তির ঢেকুরও তুললেন এই রিকশাচালক। তাঁর কাছে স্ট্রিমের জিজ্ঞাসা– রসে মেশানো বরফ সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন? হাসতে হাসতে হাসানুরের জবাব, গরমে সবাই খাই, আমিও খেলাম। এত ভাবি না। ঠান্ডা রসে দিলে শান্তি পাই।

গবেষণা বলছে, সড়কের ধারে ভ্যানগাড়ির আখের রসে ‘ই. কোলাই’, ‘সালমোনেলা’, ‘ভিব্রিও এসপিপির’ মতো ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। এসব মানুষের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শুধু আখের রস নয়, স্ট্রিট ফুড তকমার ঝালমুড়ি, স্যান্ডউইচ, চটপটি, মিক্স সালাদ, অ্যালোভেরাসহ নানা ধরনের শরবতে ভয়ানক সব ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। ২০২৪ সালে ‘প্রিভ্যালেন্স অব মাইক্রোবিয়াল হ্যাজার্ডস ইন স্ট্রিট ফুড অ্যান্ড রেডি-টু-ইট সালাদ আইটেমস ইন রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড দেয়ার প্রবাবল রিস্ক অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, সড়কের ধারের আখের রসে ৮৯ দশমিক ৩ শতাংশ নমুনায় ‘ই. কোলাই’, ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশে ‘সালমোনেলা’ এবং ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ নমুনায় মিলেছে ‘ভিব্রিও এসপিপি’। আখের রস সংগ্রহে ব্যবহৃত মগ, পরিবেশনের গ্লাসেও এসব ব্যাপক উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষণা দলের প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড নিউট্রিশন অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান গবেষক লতিফুল বারী স্ট্রিমকে বলেন, আখের রসের মতো স্ট্রিট ফুডে সাধারণত ডায়রিয়া হয়। অনেকেই বলতে পারেন– খেয়েও তিনি সুস্থ আছেন। হ্যাঁ, আপনার শরীর আপাতত এই দূষণ সয়ে নিয়েছে। শরীরে থেকে যাওয়া এসব জীবাণু থেকে পরে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে। তখন ওষুধেও কাজ হবে না।

ভয়ংকর ঝালমুড়ি-স্যান্ডউইচ

গবেষণার তথ্য বলছে, সড়কে ঝালমুড়ি ও স্যান্ডউইচে উচ্চমাত্রার ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যা তৈরি করতে পারে ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকি। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, ঝালমুড়িতে পাওয়া গেছে উচ্চমাত্রায় ‘এসচেরিচিয়া কোলাই’, যা প্রমাণ করে– নমুনাগুলো মলের মাধ্যমে দূষিত উপাদানে তৈরি। নমুনায় ‘সালমোনেলা এসপিপি’ এবং ‘ভিব্রিও এসপিপি’ উপস্থিতি বলে দেয়– সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির দূষণ প্রবেশ করেছে খাদ্যপণ্যে। একে তো নিম্নমানের ঝালমুড়ি; তার ওপর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সরঞ্জামগুলো জীবাণুমুক্ত করা হয়নি।

অন্যদিকে, সড়কে বিক্রি হওয়া স্যান্ডউইচের ৮.০ শতাংশ নমুনায় ‘ই. কোলাই’ এবং ৪.০ শতাংশ নমুনায় ‘সালমোনেলা’ পাওয়া গেছে। আর সব স্যান্ডউইচ নমুনাতে মিলেছে ‘ভিব্রিও এসপিপি’ দূষণ। গবেষকদের ভাষ্যে, পরীক্ষা করা স্যান্ডউইচে শেলফ লাইফ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। অস্বাস্থ্যকর স্থানে প্রস্তুত, মলজাত উপাদানের উপস্থিতি, মলের দূষণ, দূষিত পানি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

চটপটি, মিক্স সালাদে মলের উপাদান

গবেষকরা জানিয়েছেন, ফুটপাতের অধিকাংশ চটপটি বিক্রেতা আগের রাতে আলু সেদ্ধ করে পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি করেন। চটপটিতে ব্যবহৃত সবজি কাটা কিংবা চটপটি তৈরির সময় হাতে সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করেন না। শত শত গ্রাহককে একইভাবে খাবার পরিবেশন করেন, যাতে দূষণ বাড়ছে।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, নমুনার চটপটি ছিল নিম্নমানের এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি। তৈরির সময় ব্যবহৃত সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করা হয়নি। চটপটির নমুনায় মলমূত্রের দূষিত উপাদানের উপস্থিতি মিলেছে।

অ্যালোভেরা শরবতের ৯৬.০ শতাংশ নমুনায় ‘ই. কোলাই’ পাওয়া গেছে। ২১ দশমিক ৩ শতাংশ নমুনায় ‘সালমোনেলা’, ৮৫ দশমিক ৩ শতাংশে ‘ভিব্রিও এসপিপি’ এবং ৯ দশমিক ৩ শতাংশ নমুনায় ‘লিস্টেরিয়া এসপিপি’ মিলেছে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, অ্যালোভেরা শরবত তৈরির মগ এবং পরিবেশনের জন্য ব্যবহৃত গ্লাস ব্যাপকভাবে ‘ই. কোলাই’, ‘সালমোনেলা’ এবং ‘ভিব্রিও এসপিপি’– এর মাধ্যমে দূষিত। দেশে স্ট্রিট ফুডের মধ্যে বর্তমানে মিক্স সালাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে গবেষণা বলছে, এসব সালাদের ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ নমুনায় ‘ই. কোলাই’ পাওয়া গেছে। ‘সালমোনেলা এসপিপি’ ১৬ ও ৩৬.০ শতাংশে মিলেছে ‘ভিব্রিও এসপিপি’।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, এসব ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি প্রমাণ করে, মিক্স সালাদে ব্যবহৃত সবজিগুলো মলের উপাদানে দূষিত, যা খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া হতে পারে।

গবেষক লতিফুল বারী আরও বলেন, ‘এসব জীবাণু ছড়ায় মূলত পানি এবং বিক্রেতার অসচেতনতার কারণে। বিক্রেতাকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে এসব খাবারের ক্ষতিকর উপাদান অনেকটা কমানো সম্ভব হবে।’

সুপারিশ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, সবজি বিপণন চ্যানেলে প্রবেশের আগেই জীবাণুমুক্ত করতে হবে। স্ট্রিট ফুডের গুণমান নিশ্চিত করার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্যানিটেশন পদ্ধতি চালু করা আবশ্যক করতে হবে।

লতিফুল বারীর ভাষ্যে, স্ট্রিট ফুড আমাদের সংস্কৃতি। এগুলো খেয়ে আমরা বেড়ে উঠি। চাইলেও এ থেকে আমরা বের হতে পারব না। আমি মনে করি, তার প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের স্ট্রিট ফুডে হাইজিন ও স্যানিটেশনে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে পারলে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে