Image description

প্রতিটি মা নরমাল বা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতে চায়। যোনিপথে সন্তান জন্মদানই হলো পৃথিবীতে একটি শিশুর আগমনের সবচেয়ে প্রাকৃতিক ও প্রচলিত পদ্ধতি। চিকিৎসকদের মতে, মা ও শিশু সুস্থ থাকলে এবং গর্ভাবস্থায় বড় ধরনের কোনো জটিলতা না থাকলে স্বাভাবিক প্রসবই সবচেয়ে নিরাপদ। এ ছাড়া মা ও শিশুর জন্যেও উপকারী। 

গাজীপুরের এক গৃহিণী জান্নাতুল মাওয়া ২০১৯ সালে প্রথম সন্তান জন্মদানের সময় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকের কাছ থেকে সন্তান জন্মের এক মাস আগেই সিজারের পরামর্শ পান। মাওয়াকে তখন চিকিৎসক জানান, তার গর্ভের পানি কমে গেছে, তাই  ১৮ মে সিজারের তারিখও দেন। 

বিষয়টি নিয়ে মাওয়া ও তার পরিবারের সন্দেহ হওয়ায় পরিবার তাকে চাঁদপুরের একটি সরকারি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, সামান্য পানি কম থাকলেও স্বাভাবিক প্রসবে কোনো সমস্যা হবে না। পরে নির্ধারিত সময়ের ১৯ দিন আগেই প্রসববেদনা উঠলে হাসপাতালে গিয়ে তিনি নরমাল ডেলিভারিতে সন্তান জন্ম দেন।

চিকিৎসকদের মতে, সন্তান প্রসবের পদ্ধতি নির্ভর করে মায়ের শারীরিক অবস্থা, আগের চিকিৎসা ইতিহাস, গর্ভাবস্থার জটিলতা এবং শিশুর অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।

স্বাভাবিক প্রসবের পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে প্রসববেদনা শুরু হয় এবং জরায়ুমুখ ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে থাকে। দ্বিতীয় ধাপে শিশুর জন্ম হয় এবং শেষ ধাপে প্লাসেন্টা বের হয়ে আসে। অস্ত্রোপচার ছাড়াই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় অনেক মা এটিকে বেশি স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ মনে করেন।

চিকিৎসকরা বলেন, স্বাভাবিক প্রসবের অন্যতম বড় সুবিধা হলো দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা। সিজারিয়ান অপারেশনের তুলনায় এতে সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা অস্ত্রোপচারজনিত জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। একই সঙ্গে জন্মের পরপরই মা ও শিশুর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি এবং বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা সহজ হয়

বিশেষজ্ঞরা জানান, যেসব গর্ভবতী নারীর গর্ভাবস্থা স্বাভাবিকভাবে এগোয়, শিশুর অবস্থান মাথা নিচের দিকে থাকে এবং মা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো জটিলতায় ভোগেন না, তাদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনা বেশি থাকে। এছাড়া গর্ভকাল ৩৭ সপ্তাহ বা তার বেশি হলে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য তা উপযুক্ত সময় হিসেবে ধরা হয়।

অবশ্য সব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হয় না। কিছু শারীরিক জটিলতা থাকলে চিকিৎসকেরা সিজারিয়ান প্রসবের পরামর্শ দেন। যেমন প্ল্যাসেন্টা প্রেভিয়া, শিশুর অস্বাভাবিক অবস্থান, যমজ সন্তান, গুরুতর মাতৃস্বাস্থ্য সমস্যা কিংবা প্রসবের সময় শিশুর হৃদস্পন্দনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে ঝুঁকি এড়াতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

নরমাল ডেলিভারির জন্য কী কী প্রস্তুতি নেবেন? 
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের গাইনী বিশেষজ্ঞ এমবিবিএস ডা. শারমিন সুলতানা সাথী বলেন, নরমাল ডেলিভারির জন্য একজন মায়ের সন্তান গর্ভে আসার পর থেকে কিছু প্রস্তুতি নিতে হয়।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
গর্ভাবস্থায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। এর মাধ্যমে রক্তচাপ, রক্তশর্করা, হিমোগ্লোবিন, শিশুর অবস্থান সবকিছু জানা যায়।

সুষম ও পুষ্টিকর খাবার
গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টিকর খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভকালীন সময়ে পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার (ডিম, মাছ, ডাল), আয়রন ও ক্যালসিয়াম, ফল ও সবজি। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা।

হালকা ব্যায়াম ও হাঁটা
গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের অনুমতি থাকলে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটা জরুরি। প্রেনাটাল এক্সারসাইজ পেলভিক মাংসপেশি শক্ত করে, যা নরমাল ডেলিভারিতে সহায়ক।

শ্বাস-প্রশ্বাস ও রিল্যাক্সেশন টেকনিক
লেবার পেইন সহ্য করতে ব্রিদিং এক্সারসাইজ খুব উপকারী। 

মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসুতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল বলছিলেন, মাকে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে স্বাভাবিক প্রসব জিনিসটা কী? নরমাল ডেলিভারির রিস্ক নিতে সে সক্ষম কি না সে বিষয়ে ভাবতে হবে। তবে, যে কোনো ধরনের পরিস্থিতির জন্য রোগী ও রোগীর পরিবারকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে উল্লেখ করেন তিনি।
এই চিকিৎসক জানান, কোনো বিপদ হলে জরুরি সিজার করতে হবে, সেই বিষয়ে রোগীর পরিবারকে রাজি থাকতে হবে যেন এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন চিকিৎসক।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
অতিরিক্ত ওজন গর্ভকালীন জটিলতা বাড়াতে পারে। তাই সঠিক ডায়েট ও লাইফস্টাইল অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। 

কখন সতর্ক হবেন?
গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, শিশুর ভুল পজিশন, আগের জটিল ডেলিভারির ইতিহাস এমন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধান আরও বেশি জরুরি। এসব কিছুর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি গর্ভাবস্থা আলাদা। কারো ক্ষেত্রে নরমাল ডেলিভারি সম্ভব, কারো ক্ষেত্রে সিজারিয়ান প্রয়োজন হতে পারে। সবকিছু নির্ভর করে মা ও শিশুর নিরাপত্তার ওপর। (সূত্র:বিবিসি)