সরকারের জারি করা নীতিমালার ভিত্তিতে বেসরকারি ব্যাংকিং খাত থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ হতে পারে। এ রকম খবর ব্যাংকপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ায় পদোন্নতিপ্রত্যাশী শীর্ষ কর্মকর্তাদের আশা সংকুচিত হয়েছে। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতির খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সরকারি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বা ডিএমডি পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা মনে করছেন, বেসরকারি খাত থেকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের পদোন্নতির স্বাভাবিক সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
জানা গেছে, গত ১৯ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মহাব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৬ রহিত করে। প্রক্রিয়াটিকে যুগোপযোগী করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
ব্যাংকপাড়ায় আলোচনা রয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা নীতিমালায় বেসরকারি খাত থেকে কর্মকর্তা নিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ার পর শূন্য পদগুলোতে বেসরকারি ব্যাংকারদের বসানোর বিষয়ে সরকার আগ্রহ দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন শীর্ষ ব্যাংকারের নামও আলোচনায় এসেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, সরকারের এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে কর্মরত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেসরকারি ব্যাংক থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের অভিজ্ঞতা ও পদোন্নতির স্বাভাবিক পথ উপেক্ষিত হবে। অন্যদিকে, সরকারের যুক্তি হচ্ছে, বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ নির্বাহীদের দায়িত্ব দিলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অনিয়ম-দুর্নীতি কমানো সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারের সম্ভাব্য উদ্যোগের পক্ষে যুক্তি হচ্ছে, বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ নির্বাহীদের দায়িত্ব দেওয়া হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অনিয়ম-দুর্নীতি কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ‘কর্মদক্ষতা ও জ্ঞানের’ ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা দেশ-বিদেশে ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিষয়ে যে ধরনের বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ পান, বেসরকারি খাতের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তা সব সময় দেখা যায় না। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাত থেকে এমডি নিয়োগ দিলে নেতৃত্বে ফাটল ধরার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি অবসরপ্রাপ্তদের মধ্য থেকেও এমডি নিয়োগ দিলে এ দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া এমডি নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা হতে পারে, যা এই খাতের জন্য ক্ষতিকর।
এদিকে বেসরকারি খাত থেকে এমডি নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার মধ্যে কয়েকজন ব্যাংকারের নামও সামনে এসেছে। একটি সূত্রের দাবি, সাউথইস্ট ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আলমকে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসির (বিডিবিএল) এমডি পদে যমুনা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নুর মোহাম্মদের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব নিয়োগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সরকারি ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির দায় কেবল ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের ওপর চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ঋণ অনুমোদন, পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের প্রশ্ন, বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর যুক্তি থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা যোগ্য কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে কেন বাইরের ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের একজন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত বছর ব্যাংককে সেবা দিয়ে গেলাম। নিশ্চয়ই একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়, শেষ জীবনে এমডি হয়ে অবসরে যাব। কিন্তু সে সুযোগ আটকে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতির দায় কেবল ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নয়, এর পেছনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও পরিচালনা পর্ষদেরও দায় রয়েছে।’
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেসরকারি ব্যাংকে তুলনামূলক বেশি বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া শীর্ষ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অপেক্ষাকৃত কম বেতনের পদে আসতে আগ্রহী হচ্ছেন কেন? বেসরকারি খাতের একজন ডিএমডি বেতন পান ৭-৮ লাখ টাকা। সেখান থেকে একজন এমডি কীভাবে সরকারি ব্যাংকে ৫-৬ লাখ টাকা বেতনে চাকরি করবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পেশাগত আকাঙ্খা, সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কিংবা অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনা কাজ করছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
অর্থনীতি বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ খান জনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার যদি মনে করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে যোগ্য কর্মকর্তার অভাব রয়েছে, তাহলে এত বছর কাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে? নিশ্চয়ই তারা অযোগ্য, অথবা রাজনৈতিক বিবেচনায় আনা হয়েছে। ইতিমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপানা পরিচালক (এমডি) নিয়োগে যোগ্যতা শিথিল করে পুনরায় প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এখানে যে সব ডিএমডি, জিএম পদসহ কর্মসময় ৪ বছর অতিক্রম হয়েছে তাদের মধ্যে থেকে এমডি নিয়োগ দিলে যোগ্য এমডি পাওয়া যাবে। বেসরকারি খাত থেকে এমডি নিয়োগ দিলে খাতটি আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি ব্যাংক থেকে এমডি নিয়োগের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শুধু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতিই বাধাগ্রস্ত হবে না, বরং ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হলে যে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও চাকরির জ্যেষ্ঠতার মূল্য দেওয়া হচ্ছে না, তা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ও কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ব্যাংকের ভেতরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এমডি নিয়োগের বিষয়টির পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাখ্যা থাকলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের অনিয়ম বা দুর্নীতিতে অংশগ্রহণ যেমন বাদ দেওয়া যায় না, তেমনি এ থেকে পরিত্রাণ পেতে বিকল্প হিসেবে বেসরকারি খাত থেকে শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়ে আসাটাও সমাধান নয়। এতে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। উভয় পক্ষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে।