Image description

ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প। বইয়ের বিক্রি, নতুন বই প্রকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বই কেনার সুযোগ কমে যাওয়া এবং কাগজ ও মুদ্রণ ব্যয় বৃদ্ধির চাপে পড়েছেন প্রকাশকরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাইরেসি, পাঠাভ্যাসের পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব এবং বইয়ের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি।

দেশে বই প্রকাশনা ও পাইকারি বিপণনের অন্যতম কেন্দ্র রাজধানীর বাংলাবাজার। সেখানকার চিত্রও উদ্বেগজনক। সম্প্রতি বাংলাবাজারে সরেজমিন গিয়ে খুব বেশি ক্রেতার দেখা মেলেনি। বেশিরভাগ প্রকাশনী ও বইয়ের দোকানগুলো ফাঁকা দেখা গেছে। প্রকাশক ও ব্যবসায়ীরা তাদের বেচাকেনা প্রায় ৬০-৮০ শতাংশ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও রিদম প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মো. গফুর হোসেন বলেন, ‘২০২৩ সালের পর থেকেই সৃজনশীল বইয়ের ব্যবসায় মন্দা চলছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে না ওঠা, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণে সৃজনশীল বইয়ের পাঠক এখন অনেক কম। আসলে গত ১৫-২০ বছর ধরেই সৃজনশীল খাতে তেমন কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি। প্রকাশকরা শুধু হাতেগোনা কয়েকজন জনপ্রিয় লেখকের বই নিয়ে ব্যবসায় ব্যস্ত থাকায় বাজারও বড় হয়নি। সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প রাজধানীর একুশে বইমেলাসহ ৭-৮টি বিভাগীয় মেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ঢাকার বাইরে প্রকাশকের সংখ্যাও ৪০-৫০ জনের বেশি নেই।’

সমিতির সভাপতি ও লাবণী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ইকবাল হোসেন সানু বলেন, ‘আমি ৩৫ বছর ধরে প্রকাশনা ব্যবসায় জড়িত। অতীতের তুলনায় আমার বই প্রকাশের সংখ্যা ও ব্যবসার আকার প্রায় ৯৫ শতাংশ কমেছে। ঠিকমতো কর্মচারীর বেতনও দিতে পারি না। সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পের এখন যে অবস্থা, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরে বেশিরভাগ প্রকাশনী বন্ধ হয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার পাশাপাশি বই বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে পাইরেসিও একটি বড় কারণ। অসাধু ব্যবসায়ীরা অন্য প্রকাশকদের বই ছাপিয়ে নিজেদের দোকানে বা অনলাইনে কম দামে বিক্রি করে। এতে প্রকৃত প্রকাশকদের বিক্রি কমে যায়।’

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বই কেনা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগে সরকারিভাবেও আমাদের কিছু বই কেনা হতো। এখন আর সেটাও নেই। বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রও এখন বেশি বই কেনে না।’

প্রথমা প্রকাশনীর ম্যানেজার কাউসার আহমেদ আশিক বলেন, ‘সার্বিকভাবে সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পে ২০২৩ সাল-পরবর্তী সময়ে বইয়ের ব্যবসা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমেছে। আসলে আমাদের সমাজে একদিকে যেমন সৃজনশীল বইয়ের পাঠক তৈরি হচ্ছে না, তেমনি ভালো লেখকেরও অভাব রয়েছে। প্রচুর বই প্রকাশ হয়, কিন্তু ভালো মানসম্মত বই লেখার লেখক কম।’

তিনি আরও বলেন, আমাদের ‘বিক্রিও ২০২৪ সালের পর অনেক কমেছে। ২০২৬ সালের বইমেলায় আমাদের ব্যবসায় মন্দা গেছে। অবশ্য এখন আমরা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছি। আশা করছি, সামনের বইমেলাতেও ভালো বিক্রি হবে।’

বইমেলার বিক্রিতে বড় পতন

সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পের সংকটের একটি দৃশ্যমান সূচক একুশে বইমেলায় বিক্রির হিসাব। একসময় এই বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশনা বাণিজ্যে যে গতি তৈরি হতো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাতে বড় ছন্দপতন ঘটেছে।

বাংলা একাডেমির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বইমেলায় মোট বিক্রি আনুমানিক ১৭ কোটি টাকায় নেমেছে। ২০২৫ সালেও বিক্রি ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ছিল আরও বেশি—৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে বই বিক্রি কমছে।

একুশে বইমেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিক্রি ছিল ২০২০ সালে—প্রায় ৮২ কোটি টাকা। করোনা মহামারির বিধিনিষেধের মধ্যে ২০২১ সালে তা কমে মাত্র ৩ কোটি ১২ লাখ টাকায় নেমে আসে। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০২২ সালে ৫২ কোটি ও ২০২৩ সালে ৪৭ কোটি টাকার বিই বিক্রি হয়।

বইমেলায় বিক্রির পাশাপাশি নতুন বই প্রকাশের সংখ্যাও কমেছে। ২০২৪ সালের বইমেলায় ৩ হাজার ৭৫১টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২৫ সালে সংখ্যাটি কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৯৯। ২০২৬ সালে আরও কম—২ হাজার ৭টি।

বাতিঘর প্রকাশনীর নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান সম্পাদক জাফর রাশেদ বলেন, ‘২০২৩ সাল পর্যন্তও আমাদের বই বিক্রি ভালো ছিল। এরপর থেকেই ক্রমাগত বিক্রি কমছ। ২০২৬ সালের একুশে বইমেলা সময়মতো না হওয়ায় আমরা আরও লোকসানে পড়ি। অবশ্য সম্প্রতি আমাদের ঢাকার বিক্রয় কেন্দ্রে বিক্রি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে ঢাকার বাইরের কেন্দ্রগুলোয় বিক্রি এখনো অর্ধেকের নিচে।’

বাতিঘরের সম্পাদক মোজাম্মেল মাহমুদ সৃজনশীল পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে কোচিং ব্যবসা, গাইড বইয়ের প্রসার ও ক্যারিয়ারমুখী পড়াশোনাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তার মতে এসব কারণে মৌলিক জ্ঞানার্জনের স্পৃহা গড়ে উঠছে না। এর সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় সব বয়সী মানুষ আরও বেশি বইবিমুখ হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

শোভা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান বলেন, ‘গত দুই-তিন মাস বিক্রি নেই বললেই চলে। এখন মাসে ৩০ হাজার টাকার বই বিক্রি করাও কঠিন হয়ে গেছে। আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি। নীলক্ষেতেও এখন বইয়ের বিক্রি নাই। আগে নীলক্ষেতে প্রচুর বই সরবরাহ করতাম। কিন্তু এখন অর্ডারই আসে না।’

বাংলাবাজারে মন্দা, বিপাকে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা

বাংলাবাজারের প্রকাশক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগে দৈনিক কয়েক লাখ টাকার সৃজনশীল বইয়ের লেনদেন হতো। বিশেষ কিছু মৌসুমে তা আরও বাড়ত। এখন অনেক ব্যবসায়ীর জন্য দিনশেষে অল্পসংখ্যক বই বিক্রিও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাবাজারের এই সংকট কেবল বইয়ের দোকান বা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বই প্রকাশের সঙ্গে লেখক, সম্পাদক, অনুবাদক, প্রুফরিডার, প্রচ্ছদশিল্পী, কম্পোজিটর, মুদ্রণকর্মী, বাঁধাইশ্রমিক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারাও সম্পৃক্ত। বই বিক্রি কমে গেলে সব অংশীজনই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাবাজারে প্রায় ৪ হাজার বই বিক্রির দোকান ও ৪০০টির বেশি সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই এবং গাইড ও নোটবই প্রকাশকদের অন্তর্ভুক্ত করলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার।

ব্যবসা কমেছে পাঠ্যবই এবং গাইড ও নোটবই প্রকাশকদেরও। তবে তা এখনো তুলনামূলক সহনশীল পর্যায়ে রয়েছে।

ঢাকেশ্বরী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী শম্ভুনাথ ঘোষ বলেন, ‘করোনা মহামারির পর জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার প্রায় ৪০ লাখ টাকার বই মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছি। এখন কিছু গাইড বই বিক্রি করে কোনোমতে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছি। উচ্চশিক্ষার রেফারেন্স বই আর ছাপাই না।’

কলেজ লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী মো. কাউছার হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে স্কুল-কলেজ আর চাকরির বই বেশি বিক্রি হয়। অনার্স লেভেলে শুধু গাইড বই চলে। উচ্চশিক্ষায় রেফারেন্স বই এখন আর কেউ কেনে না।’

কথাপ্রকাশের জনসংযোগ কর্মকর্তা জাফিরুল ইসলাম বলেন, ‘২০২৪ সালের পর থেকে আমাদের ব্যবসাতেও মন্দা নেমেছে। বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছি অফলাইনে বিক্রি কমায়। বর্তমানে অনলাইনে বিক্রির ওপর নির্ভর করে টিকে আছি।’

মূল্যস্ফীতি, মুদ্রণ ব্যয়বৃদ্ধি

বইয়ের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও প্রকাশনা শিল্পের সংকটকে তীব্র করছে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাগজ ও মুদ্রণসামগ্রীর দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এতে বই ছাপানোর খরচ বেড়েছে। উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে প্রকাশকরা বইয়ের দাম কিছুটা বাড়ালেও ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় সবক্ষেত্রে বাড়তি খরচ বিক্রয়মূল্যে সমন্বয় করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জন্য এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রকাশকদের সামনে কঠিন হিসাব—দাম বাড়ালে বিক্রি কমার ঝুঁকি; আর দাম না বাড়ালে আয় কমে যাওয়া অথবা লোকসান। বিশেষত সাহিত্য, অনুবাদ, প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী বইয়ের বাজারে সম্ভাব্য বিক্রির হিসাব করে আগাম বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে উঠছে। ব্যবসার ঝুঁকি কমাতে অনেক প্রকাশক ছোট সংস্করণে বই ছাপানোর দিকেও ঝুঁকছেন।

জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আবু হানিফ বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে আমাদের বিক্রি অন্তত ৬০ শতাংশ কমেছে। আমরা অনেক বই এখন আর ৩০০-৫০০ কপির বেশি ছাপাই না।’

বাজার ভালো থাকা ইসলামি বইয়ের বিক্রিও সম্প্রতি কমেছে। এখানেও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব রয়েছে। ইসলামি কনটেন্ট অনলাইনে সহজলভ্য হওয়ায় বইয়ের ওপর নির্ভরতা কমেছে।

ইসলামি সৃজনশীল প্রকাশনা গার্ডিয়ান প্রকাশনীর সেলস সেন্টারের নির্বাহী ফয়জুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘গত দুই বছরে আমাদের বিক্রি ৪০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। ২০২৬ সালের মেলায় বিক্রি ভালো হয়নি। ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আমরা ই-বুক, অডিও বুক ও ভিজ্যুয়াল বুকের দিকে যাচ্ছি।’

প্রকাশকদের মতে, বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের সংকট কেবল বইয়ের বিক্রি কমে যাওয়া নয়। লেখক তৈরির পরিবেশ, জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীল অর্থনীতি ও পাঠসংস্কৃতিও এর সঙ্গে যুক্ত। আসন্ন একুশে বইমেলা শিল্পটির জন্য নতুন করে বাজার তৈরির সুযোগ হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে মেলার বাইরে সারাবছর বই প্রকাশ, বিপণন ও পাঠক তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি সহায়তার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে দেশজুড়ে সৃজনশীল বইপড়া ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।