একসময় ব্যাংক খাতে চাকরি পেতে মেধাবীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। সময়ের সঙ্গে তা কমে আসছে। অনিয়ম-দুর্নীতি, চাকরির নিরাপত্তা না থাকা, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা ব্যাংকিং পেশা সম্পর্কে তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনার মুখে ফেলেছে
একসময় দেশের মেধাবী তরুণদের কাছে ব্যাংকের চাকরি ছিল অন্যতম আকর্ষণীয় পেশা। বিশেষ করে ব্যবসায় প্রশাসন ও অর্থনীতিতে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশের স্বপ্ন ছিল ব্যাংকার হওয়া। ভালো বেতন, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও ক্যারিয়ারে উন্নতির সুযোগ—সব মিলিয়ে ব্যাংকের চাকরি ছিল পছন্দের শীর্ষে। কিন্তু গত এক দশকে দেশের অনেকগুলো ব্যাংকের বিপর্যয়ে ক্রমেই আকর্ষণ হারাচ্ছে এ খাতের চাকরি। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বিদেশী ব্যাংকের চাকরিও এখন আর আগের মতো তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারছে না।
দেশের ব্যাংকগুলোয় গত বেশ কয়েক বছর ধরে অনিয়ম-দুর্নীতি, খেলাপি ঋণের বিস্তার, সুশাসনের ঘাটতি ও আর্থিক বিপর্যয়ের খবর ব্যাংকিং পেশা সম্পর্কে তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনার মুখে ফেলেছে। অনিয়মে যুক্ত থাকার অভিযোগে দেশের অনেক নামি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা কারাগারে গেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাকরির নিরাপত্তার অভাব, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা। ‘সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম-দুর্নীতি ও হতাশার চাপে’ বেশ কয়েকজন ব্যাংকারের আত্মহত্যার ঘটনাও বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। একসময় যে খাতের চাকরি পেতে মেধাবীদের তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল, তা সময়ের সঙ্গে কমে আসছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে মেধাবী তরুণদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বাড়ছে বিদেশযাত্রার প্রবণতা।
অনেক বেসরকারি ব্যাংক ও সেগুলোর কর্মকর্তাদের অবস্থা নাজুক। লুটপাটের শিকার হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত হওয়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের কর্মীদের দিন কাটছে হতাশায়। অনেক কর্মী এরই মধ্যে চাকরি ছেড়েছেন। পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্ট-বঞ্চিত এ ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসে কয়েক ভাগে বেতন-ভাতা তুলতেও বাধ্য হচ্ছেন। একই ধরনের পরিস্থিতি চলছে দেশের বেসরকারি খাতের আরো কয়েকটি ব্যাংকে।
অনিয়ম-দুর্নীতির চাপে কার্যক্রম শুরুর মাত্র চার বছরের মধ্যে ২০১৬ সালে ভেঙে পড়ে চতুর্থ প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংক। নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক হলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দেয়া বেসরকারি এ ব্যাংক আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দেউলিয়াত্বের মুখে পড়া এ ব্যাংকের কর্মীরা পাঁচ-সাত বছর ধরে ঠিকমতো বেতন-ভাতা তুলতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
চাকরির নিশ্চয়তা থাকলেও ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, ভাবমূর্তি সংকটে মানসিকভাবে হতাশায় দিন পার করছেন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি লুটপাটের শিকার জনতা ও বেসিক ব্যাংকে। এ দুটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০ শতাংশ ছুঁয়েছে। আর রাষ্ট্রায়ত্ত সবক’টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের গড় হার এখন ৪৭ শতাংশের বেশি। উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে সোনালী ব্যাংক ছাড়া বাকি আটটি ব্যাংকই এখন লোকসানি। বিপুল পরিমাণ মূলধন ঘাটতির চাপেও ভাবমূর্তি সংকটে রয়েছে এ ব্যাংকগুলো।
দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও নিরাপদ মনে করা হতো বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসিতে চাকরি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এ দুটি ব্যাংকের অনেক কর্মীর চাকরিও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। গত বছরের মাঝামাঝি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং বন্ধের ঘোষণা দেয় এইচএসবিসি। এরপর অনেক কর্মী চাকরিচ্যুত হন। চলতি বছরের ৪ জুলাই রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকটির সংক্ষুব্ধ কর্মীরা বলেন, রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একযোগে এইচএসবিসির ২৫৭ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের অনেকেই ১৫ থেকে ২৫ বছর ধরে ব্যাংকটিতে কর্মরত ছিলেন।
এইচএসবিসির পথ অনুসরণ করে সম্প্রতি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং বিক্রি করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এ ঘোষণার ফলে ব্যাংকটির প্রায় ১ হাজার ৫০০ কর্মীর চাকরি ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য ক্রেতা ব্যাংককে এ কর্মীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে—এমন শর্ত দিয়েছে বহুজাতিক ব্যাংকটি। একসঙ্গে উচ্চ বেতনের এত কর্মী অধিগ্রহণ ও বেতন কাঠামোর পার্থক্য নিয়ে ক্রেতাদের আপত্তি থাকায় আলোচনা এগোতে বিলম্ব হচ্ছে। আর বিষয়টি নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যেও হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিও আগের আকর্ষণ হারিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। বিগত শাসনামলে দেশের ব্যাংক খাতের বিপর্যয়ের পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বসহ বহু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকার সমালোচনা রয়েছে। ব্যক্তিগত অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি আর্থিক খাত লুণ্ঠনে সহযোগিতার অপরাধে ডেপুটি গভর্নরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহীরাও কারাগারে যাচ্ছেন। আসামি হয়ে অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। অতীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, কিংবা বিসিএসের চাকরি ছেড়েও বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দিয়েছিলেন অনেক মেধাবী তরুণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও মনে করেন মেধাবীদের মধ্যে ব্যাংকার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কমেছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ছাত্র ছিলাম। স্নাতকোত্তর থিসিস গ্রুপে আমার পজিশন ছিল প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুযোগও ছিল। কিন্তু আমি যোগ দিয়েছিলাম কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিসিএস ক্যাডারের মতো সরকারি চাকরি ছেড়ে আমার বহু সহকর্মী কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হয়েছেন। অনেক মেধাবী ছাত্র এখনো আসছে, তবে আমার মনে হয় সংখ্যাটি কমেছে।’
আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘দেশের বেসরকারি খাতের অনেক ব্যাংক যথাযথ কারণ দর্শানো ছাড়াই কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করেন। চাকরির বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পর ৩৫-৪০ বছর বয়সে কাউকে চাকরিচ্যুত করাটা অমানবিক। এইচএসবিসি রিটেইল ব্যাংকিং বন্ধ করে দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যাদের চাকরিচ্যুত করেছে, তারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। কিন্তু অনেক বেসরকারি ব্যাংক ঠিকমতো ক্ষতিপূরণও দিচ্ছে না। এ পরিস্থিতি মেধাবীদের ব্যাংকার হতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের ৬১টি সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার ৮১৮। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৯৮ জন কর্মরত ছিলেন বেসরকারি খাতের ৪৩টি ব্যাংকে। আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন ৫৫ হাজার ৫১৭ জন। বিশেষায়িত তিনটি সরকারি ব্যাংকে আরো ১২ হাজার ৬৫১ জন কর্মরত ছিলেন। বিদেশী ৯ ব্যাংকে কর্মরত রয়েছেন ৩ হাজার ৭৫২ জন কর্মী। এসব কর্মীর মধ্যে ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ নারী।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতের ক্ষত সামনে আসতে থাকে। অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ লোপাটে সহযোগী হওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হন অন্তত চারটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীসহ অনেক ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালক ও কর্মকর্তা। গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা ব্যাংক নির্বাহীদের মধ্যে রয়েছেন জনতা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ, সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওবায়েদ উল্লাহ মাসুদ, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সাবেক এমডি মনিরুল মওলা ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় আসামি হয়ে তারা কারাগারে গিয়েছেন।
কারাগারে থাকা শীর্ষ নির্বাহীদের বাইরে আরো ডজন খানেক ব্যাংক এমডির বিরুদ্ধে এরই মধ্যে দুদক মামলা করেছে। আর অভিযোগ অনুসন্ধান ও মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে আরো ১০-১২টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর বিরুদ্ধে। এমডিরা ছাড়াও প্রতিটি মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বহু কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে এএমডি, ডিএমডি, বিভাগীয় প্রধান, শাখাপ্রধানসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা রয়েছেন। গ্রেফতার ও শাস্তি এড়াতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের এমডি-ডিএমডিরা বিদেশে পালিয়েছেন। চাকরিচ্যুত হয়েছেন এমন এমডিরা দেশে থাকলেও লোকচক্ষুর অন্তরালে দিন কাটাচ্ছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে যারা এখনো কর্মরত, তাদের দিন কাটছে আতঙ্কে।
দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, তাতে মামলার সংখ্যা হাজার ছাড়াতে পারে। আর আসামির সংখ্যা হতে পারে অন্তত ২০ হাজার। কারণ একটি ঋণের প্রস্তাব ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ১৫-২০ কর্মকর্তা যুক্ত থাকেন। মামলায় ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকার, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাকে আসামি করা হচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংকের এমডির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা অর্ধশত ছাড়াতে পারে।
দুদকের তদন্তের মুখে পড়েছেন ২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকজুড়ে দায়িত্ব পালনকারী তিন গভর্নর। তাদের সঙ্গে তদন্তের জালে জড়িয়েছেন বিভিন্ন সময়ের সাতজন ডেপুটি গভর্নর, অনেক নির্বাহী পরিচালকসহ অন্তত ৫৫ জন কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত, সম্পদ জব্দ ও নথিপত্র তলবের মতো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর (এস কে) চৌধুরী ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস গ্রেফতার হয়েছেন। সাবেক গভর্নরদের মধ্যে ড. আতিউর রহমান ও আব্দুর রউফ তালুকদারের কোনো হদিস নেই। আর অনেক সাবেক ডেপুটি গভর্নরও লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়েছেন।
মেধাবী তরুণদের সামনে বর্তমানে উজ্জ্বল ভাবমূর্তির কোনো ব্যাংকার নেই বলে মনে করেন শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। কিন্তু সে চাকরিতে যোগ না দিয়ে ব্যাংকার হতে এসেছি। সে সময় আমাদের সামনে অনুসরণীয় ও বরেণ্য অনেক ব্যাংকার ছিলেন। যাদের দেখে আমরা ব্যাংকার হতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। আর সরকারি চাকরির তুলনায় বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকের বেতন বেশি ছিল। ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি ও ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে মামলা-গ্রেফতারের সংবাদ মেধাবীদের এ পথে আসতে নিরুৎসাহিত করছে।’
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরো বলেন, ‘পারিপার্শ্বিক বহু কারণে ঋণ খেলাপি হতে পারে। কিন্তু আমরা দেখছি, ১০-১২ বছর আগের কোনো ঋণের জন্যও ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। এ ধরনের তৎপরতা ব্যাংকারদের আরো বেশি নিরুৎসাহিত করছে। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র যদি মাফিয়া বা দুর্বৃত্তদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলেও ভালো থাকতে পারে না। বিগত সময়ে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে যা হয়েছে, সেটি রাষ্ট্রীয় মাফিয়াতন্ত্রের ফল।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি, যা গোটা বিশ্বের মধ্যেই সর্বোচ্চ। ২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকে ব্যাংক খাতে সংগঠিত অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুণ্ঠনে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের কারণে দেশের অন্তত দুই ডজন ব্যাংক এখন লোকসানি। মূলধন খুইয়ে এ ব্যাংকগুলো সংকটে পড়েছে। আর যে ব্যাংকগুলো ভালো আছে, সেগুলোতেও নতুন জনবল নিয়োগ খুবই কম। কর্মসংস্থানে তীব্র চাহিদায় দেশের ব্যাংক খাত ছিল অন্যতম আকর্ষণীয় চাকরিদাতা। কিন্তু সে খাতও তার আকর্ষণ হারাচ্ছে, সংকুচিত হয়েছে চাকরির সংখ্যা।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখন প্রায় ২৯ শতাংশ। একই সঙ্গে উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করা কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই এমন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন, যেখানে তাদের অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না।
উপযুক্ত চাকরি না থাকায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে বলে জানান বিডিজবসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) একেএম ফাহিম মাশরুর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের এক-তৃতীয়াংশ বেকার। তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিত তরুণরা বিদেশে গিয়ে ভালো চাকরি পাবেন এমন আত্মবিশ্বাসও নেই।’
ফাহিম মাশরুর আরো বলেন, ‘বিকল্প ভালো কর্মসংস্থান না থাকায় দেশের মেধাবী তরুণদের মধ্যে এখনো ব্যাংকার হওয়ার প্রচেষ্টা আছে। অনেক ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে থাকলেও সরকার সেগুলো বন্ধ হতে দেয়নি। এটিও ব্যাংকের প্রতি অনেক তরুণের আগ্রহকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে।’