Image description

দেশে খেলাপি ঋণ ও পুনঃ তফসিল করা ঋণ—দুটোই বেড়েছে। অথচ ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়ার সময় বরাবরই বলা হয়েছে, এতে ব্যাংকের আটকে থাকা টাকা ফেরত আসবে, সমস্যায় পড়া ব্যবসা সচল হবে এবং খেলাপি ঋণ কমবে।

বাস্তবে ব্যাংকের খাতায় খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কমলেও সেই হারে আদায় বাড়েনি; বরং পুনঃ তফসিল করা ঋণের বড় অংশ আবার খেলাপি হয়েছে।

তাই পুরোনো প্রশ্নটিই আবার সামনে এসেছে—ঢালাওভাবে ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে কি সমস্যার সমাধান করা যায়, নাকি এতে কিছু ঋণগ্রহীতা শুধু বাড়তি সময় পান আর সমস্যাটি ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া হয়।

হাজার কোটি টাকার ঋণে ১৫ বছর

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩১ আগস্ট খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনের সুবিধা আরও বাড়িয়েছে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান বা শিল্পগোষ্ঠীর ঋণস্থিতি এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছরে ঋণ পরিশোধ করা যাবে। আগে এ সময় ছিল ১০ বছর।

এ সুবিধার জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। প্রয়োজনীয় কিস্তি বা ডাউন পেমেন্ট নিয়ে ব্যাংকগুলোকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে। ২০২৫ সালের নীতিসহায়তা বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বাছাই কমিটির মাধ্যমে যারা আগে সুবিধা পেয়েছে, তারাও আবার আবেদন করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানিসংকট, বাজারভিত্তিক সুদহারের কারণে ঋণের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ব্যবসার গতি কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে। খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৮ মাসের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

তাই পুরোনো প্রশ্নটিই আবার সামনে এসেছে—ঢালাওভাবে ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে কি সমস্যার সমাধান করা যায়, নাকি এতে কিছু ঋণগ্রহীতা শুধু বাড়তি সময় পান আর সমস্যাটি ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া হয়।

রহস্যের তিন মাস

ঋণখেলাপি
ঋণখেলাপিপ্রতীকী ছবি

সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন করে বিশেষ নীতিসহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। তখন ক্ষমতায় অন্তর্বর্তী সরকার। তখন ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে, দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়।

এরপর ২৪ নভেম্বর সুবিধার আওতা বাড়ানো হয়। ওই বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত খেলাপি হওয়া ঋণও এই সুবিধার যোগ্য হয়। অশ্রেণিকৃত ও আগে পুনঃ তফসিল করা মেয়াদি ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত দুই বছর এবং এক্সিট সুবিধায় আরও এক বছর সময় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।

এর তিন মাস পর, ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার নিয়ম আরও সহজ করা হয়। আবেদনের সময় নির্ধারিত ডাউন পেমেন্টের অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক পরবর্তী ছয় মাসে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।

 

এর তিন মাসের মধ্যে, ৭ মে আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ জুন করা হয়। আবার সেই গড়ে তিন মাস। সর্বশেষ ৩১ আগস্ট তা আবার বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের কম সময়ে কখনো সুবিধার আওতা, কখনো ডাউন পেমেন্ট, কখনো আবেদনের সময়, আবার কখনো ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আপাতত এটাই কি শেষ সুযোগ, নাকি তিন মাস পর আবার নতুন সুবিধা আসবে? একটি ছাড়ের অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকটি ছাড় এলে ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে আরও সুবিধা পাওয়ার আশা তৈরি হয়। কেউ কেউ তখন কিস্তি না দিয়ে অপেক্ষা করেন। কয়েক মাস পর হয়তো আরও ভালো সুযোগ আসবে।

এতে সময়মতো ঋণ পরিশোধের অভ্যাস নষ্ট হয়। যাদের ঋণ শোধ করার সামর্থ্য আছে, তারাও ভবিষ্যতের সুবিধার আশায় কিস্তি দেওয়া বন্ধ রাখে। নিয়মিত ঋণ শোধ করার চেয়ে খেলাপি হয়ে অপেক্ষা করাই যদি বেশি লাভজনক হয়, তাহলে ঋণ পরিশোধের আগ্রহ কমে যায়। অতীতেও এমনটাই দেখা গেছে।

এর তিন মাসের মধ্যে, ৭ মে আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ জুন করা হয়। আবার সেই গড়ে তিন মাস। সর্বশেষ ৩১ আগস্ট তা আবার বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের কম সময়ে কখনো সুবিধার আওতা, কখনো ডাউন পেমেন্ট, কখনো আবেদনের সময়, আবার কখনো ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বড় সুবিধা

বর্তমান নীতিতে বড় ঋণ গ্রাহকেরাই বেশি সুযোগ পাবেন। শুধু ঋণের অঙ্ক বড় বলেই বেশি সুবিধা দেওয়া হলে এ নিয়ে ন্যায্যতার প্রশ্নও ওঠে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সামান্য ঋণ খেলাপি হলেই ব্যাংকের স্বাভাবিক সুবিধা হারান। অথচ বড় ঋণগ্রহীতারা আরও বেশি সময় পাচ্ছেন। এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধের চেয়ে বড় খেলাপি হওয়াই বেশি লাভজনক মনে হতে পারে।

ব্যাংকের বিতরণ করা প্রায় প্রতি তিন টাকার এক টাকা খেলাপি। বাংলাদেশ এখন খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ দেশের একটি।

প্রতি তিন টাকার এক টাকাই খেলাপি

এমন এক সময়ে নতুন সুবিধা দেওয়া হলো, যখন দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ ব্যাংকের বিতরণ করা প্রায় প্রতি তিন টাকার এক টাকা খেলাপি। বাংলাদেশ এখন খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ দেশের একটি।

গত দুই বছরে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ার একটি কারণ হলো পুরোনো ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পাওয়া। রাজনৈতিক প্রভাব, আদালতের স্থগিতাদেশ, পুনঃ তফসিল, বিশেষ ছাড় ও ভুল শ্রেণীকরণের কারণে দীর্ঘদিন অনেক মন্দ ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর ঋণ পর্যালোচনা ও নিরীক্ষায় এসব ঋণের একটি অংশ সামনে চলে এসেছে।

পুনঃ তফসিল করেও আবার খেলাপি

পুনঃ তফসিল করলেও যে ফল পাওয়া যায় না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকই বলছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে পুনঃ তফসিল করা ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা বা ৩৮ দশমিক ৪২ শতাংশ আবার খেলাপি হয়ে গেছে, অর্থাৎ পুনঃ তফসিল করা প্রতি পাঁচটি ঋণের প্রায় দুটি আবার খারাপ হয়েছে।

২০২০ সালে পুনঃ তফসিল করা ঋণের মধ্যে খেলাপি হওয়ার হার ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। চার বছরের মধ্যে তা ৩৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে, অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়েও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

সাম্প্রতিক হিসাবেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। পরের তিন মাসে বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনের পর ডিসেম্বর শেষে তা ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় নামে; কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে আবার তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

২০২০ সালে পুনঃ তফসিল করা ঋণের মধ্যে খেলাপি হওয়ার হার ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। চার বছরের মধ্যে তা ৩৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে, অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়েও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

ছাড় দেওয়ার ইতিহাস দীর্ঘ

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করা নতুন ঘটনা নয়। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো সুদ মওকুফ ও সহজ কিস্তিতে খেলাপিদের ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর ২০০৩ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা কঠোর অবস্থান নেয়। কিস্তি বা ডাউন পেমেন্টের পরিমাণ বাড়ানো হয় এবং পুনঃ তফসিল করা ঋণগ্রহীতাদের নির্দিষ্ট সময় নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ রাখা হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে নিয়ম শিথিল করার অধ্যায় নতুন করে শুরু হয়। ২০১২ সালে সর্বোচ্চ তিনবার ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিশেষ সুবিধার আওতায় কোনো কোনো ঋণের পরিশোধের মেয়াদ ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

২০১৫ সালে বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ পুনর্গঠন কর্মসূচি চালু করা হয়। এ সময় ১১টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। তবে সুবিধাভোগীদের অধিকাংশই প্রথম কিস্তি সময়মতো দেয়নি।

প্রতিবারই বলা হয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও টেকসই ব্যবসা রক্ষায় এ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করার কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে সাময়িক সহায়তা ধীরে ধীরে নিয়মিত ছাড়ে পরিণত হয়েছে।

এরপর বড় পরিবর্তন আসে ২০১৯ সালে। মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। তখনো বলা হয়েছিল, এটি বিশেষ ও এককালীন ব্যবস্থা। কিন্তু সেই এককালীন ব্যবস্থা একবারে শেষ হয়নি। করোনার সময় নিয়ম আরও শিথিল করা হয়। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ চারবার ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়। আর বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা মিলিয়ে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২৯ বছর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সুবিধাও দেওয়া হয়।

প্রতিবারই বলা হয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও টেকসই ব্যবসা রক্ষায় এ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করার কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে সাময়িক সহায়তা ধীরে ধীরে নিয়মিত ছাড়ে পরিণত হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের নীতির সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর কিছু মিল ও অমিল রয়েছে। মিলটি হলো শর্ত সাপেক্ষে ঋণ নবায়নের সুযোগ তারাও দেয়। অমিল হলো এসব দেশে পুনঃ তফসিলের পর ঋণগ্রহীতার পরিশোধের রেকর্ড, ব্যবসার সক্ষমতা ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নেপালে ছয় মাস নিয়মিত কিস্তি দিলেই খেলাপি ঋণ সরাসরি নিয়মিত হয় না। সেটি আরও ছয় মাস ‘ওয়াচ লিস্টে’ থাকে। এ সময়ও কিস্তি নিয়মিত থাকলে ঋণটি নিয়মিত শ্রেণিতে ফেরে। দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কা মূলত সংকটে পড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সুবিধা দিয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ বছর সময় পাওয়া গেলেও ঋণগ্রহীতার পরিশোধ ক্ষমতা এবং ব্যবসা পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা থাকতে হয়। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

ভারতে সবার জন্য একই ডাউন পেমেন্ট বা মেয়াদ নেই। ব্যাংক যাচাই করে দেখে, সংকটটি সাময়িক কি না, ব্যবসা টিকবে কি না এবং পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত কি না। দেশটির ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের হার ১ দশমিক ৮ শতাংশ।

পাকিস্তানে পুনঃ তফসিল করলেই ঋণ নিয়মিত হয়ে যায় না। সাধারণ করপোরেট ও বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে নতুন শর্ত অন্তত এক বছর মেনে চলতে হয়। পাশাপাশি বকেয়ার কমপক্ষে ১০ শতাংশ পরিশোধ করতে হয়। দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কা মূলত সংকটে পড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সুবিধা দিয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ বছর সময় পাওয়া গেলেও ঋণগ্রহীতার পরিশোধ ক্ষমতা এবং ব্যবসা পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা থাকতে হয়। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

অন্য দেশের শিক্ষা

খেলাপি ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির সফল উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কোরিয়া অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন বা কেএএমসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে নেয়। টিকে থাকার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা হয়। অন্যগুলোর সম্পদ বিক্রি করে ঋণ নিষ্পত্তি করা হয়।

চীনে আদালতের নির্দেশে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের উড়োজাহাজ ও দ্রুতগতির ট্রেনে ভ্রমণ, বিলাসী সেবা গ্রহণ এবং নতুন ঋণ পাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংককে দ্রুত খেলাপি ঋণের ক্ষতি স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হয়। ইউরোপে খেলাপি ঋণ যত পুরোনো হয়, তার বিপরীতে তত বেশি সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হয়।

ভারতের আইনি ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। সেখানে ব্যাংক নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বন্ধকি সম্পদ দখল ও বিক্রি করতে পারে। বড় করপোরেট ঋণ দেউলিয়া আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ ফেরত না দেওয়া কিংবা সম্পদ সরিয়ে নেওয়া ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণা করে নতুন ঋণ পাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়।

চীনে আদালতের নির্দেশে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের উড়োজাহাজ ও দ্রুতগতির ট্রেনে ভ্রমণ, বিলাসী সেবা গ্রহণ এবং নতুন ঋণ পাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংককে দ্রুত খেলাপি ঋণের ক্ষতি স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হয়। ইউরোপে খেলাপি ঋণ যত পুরোনো হয়, তার বিপরীতে তত বেশি সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হয়।

অতীতের মতো যেন দেওয়া সুবিধার অপব্যবহার যেন না হয়, তা দেখতে হবে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি দরকার। একই সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারও থাকতে হবে। এর মাধ্যমের যদি ঋণ নবায়ন করে উদ্যোক্তারা অর্থনীতির গতি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটাই হবে এর ইতিবাচক দিক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী

শেষ কথা

দেশে বিনিয়োগে মন্দা চলছে। বড় ঋণখেলাপিদের বারবার সুবিধা দেওয়াকে অনেকে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু জ্বালানিসংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শুধু ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না।

একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন ব্যবসার প্রকৃত পুনর্গঠন। কারণ, শুধু সময় বাড়িয়ে কিংবা কাগজে ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সুবিধা পাওয়ার পর ব্যবসা ঠিকভাবে চলছে এবং নিয়মিত কিস্তি দিচ্ছে কি না, তারও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, অতীতের মতো যেন দেওয়া সুবিধার অপব্যবহার যেন না হয়, তা দেখতে হবে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি দরকার। একই সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারও থাকতে হবে। এর মাধ্যমের যদি ঋণ নবায়ন করে উদ্যোক্তারা অর্থনীতির গতি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটাই হবে এর ইতিবাচক দিক।