Image description

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নেন মূলত উদ্যোক্তা-পরিচালকরা। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোনো ভূমিকাই থাকে না। অথচ পাঁচ ব্যাংক ও চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়ার পর তার আর্থিক মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের।

প্রতিষ্ঠানগুলোর দুরবস্থায় শেয়ারের দাম কমে আগেই বিনিয়োগকারীদের মূলধন ক্ষয়ে গেছে। এরপর শেয়ার লেনদেন বন্ধ, প্রতিষ্ঠান অকার্যকর ঘোষণা, কিংবা অবসায়নের উদ্যোগে বিনিয়োগের অবশিষ্ট অর্থ ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ, যেসব সিদ্ধান্ত ও অনিয়মের সঙ্গে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোনো ভূমিকা ছিল না, শেষ পর্যন্ত সেসব দায়ের বড় অংশই এসে পড়ছে তাদের ঘাড়ে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এমন অনিশ্চয়তায় পড়ার বড় উদাহরণ হলো গত বছর একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক। একীভূত করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রায় এক বছর আগে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন স্থগিত করা হয়। পরে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর আওতায় ব্যাংকগুলোর শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা করা হয়। কারণ, এসব ব্যাংকের সম্পদের তুলনায় দায় বেশি ছিল। ফলে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না বলে জানানো হয়।

গত বছরের নভেম্বরে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে বাংলাদেশ ব্যাংক দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএসই ও সিএসই শেয়ার লেনদেন বন্ধ করে দেয়। এসব ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের পাশাপাশি শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হাজারো সাধারণ বিনিয়োগকারীও ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, উল্লিখিত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটির মূল্য ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ায় শেয়ারের মূল্য শূন্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ব্যাংকগুলোর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক ৩৫০ থেকে ৪২০ টাকা পর্যন্ত ছিল। নতুন করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারও পুরোনো শেয়ারহোল্ডারদের না দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তখন জানানো হয়।

কিন্তু ব্যাংকগুলোর অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও এ সিদ্ধান্তের কারণে তাদের বিনিয়োগ হারানোর মুখে পড়েন। তখন প্রশ্ন ওঠে, অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত নন এমন শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কি না। শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা নিয়ে সমালোচনার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির বিষয়টি সরকারের আলোচনায় আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তখন জানান, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। কীভাবে এই অর্থ ফেরত দেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে অর্থ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে বলেও তিনি জানান। কিন্তু সেই ঘোষণার প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এর সুরাহা হয়নি। বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে তিনটি তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারদের সামনে একই প্রশ্ন এসেছে—প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক-পরিচালকদের অনিয়মের দায় তাদেরও বহন করতে হবে কি না এবং তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা কোথায়?

গত ৯ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (এনবিএফআই) অকার্যকর ঘোষণা করে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। এর মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্স ছাড়া বাকি তিনটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংক চার প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নিজেদের কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুরবস্থা, পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পরদিন, ১০ আগস্ট থেকে তালিকাভুক্ত তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয় ডিএসই ও সিএসই। এতে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাদের বিনিয়োগের কোনো অংশ ফেরত পাওয়া যাবে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের আর্থিক দুরবস্থা সাম্প্রতিক নয়। এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছিল না। তারপরও কোনো কোনো সময়ে শেয়ারবাজারে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন গুঞ্জনে শেয়ারের দাম বাড়লেও দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগকারীরা কোনো রিটার্ন পাননি।

এনবিএফআই খাতের সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসায়ন উদ্যোগে থাকা ৯টি এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশ। এ ৯টির মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংও ছিল। এ ছাড়া পিকে হালদারের বিরুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্সসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ অবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন, যারা ঋণ বিতরণ, অর্থ স্থানান্তর কিংবা পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাদের কেন একই ক্ষতির দায় নিতে হবে।

দুর্বল এনবিএফআইগুলোর ক্ষেত্রে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়টি এখন তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ছয়টি সংকটাপন্ন এনবিএফআইয়ের ১২ হাজারের বেশি আমানতকারী দীর্ঘদিন ধরে তাদের টাকা ফেরতের দাবি জানিয়ে আসছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট আমানতের একটি অংশ ব্যক্তি আমানতকারীদের।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই আমানতকারীদের অর্থ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দুই ধাপে বা বিশেষ স্কিমের মাধ্যমে ফেরত দেওয়ার কথা। তবে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি না, তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অবসায়নের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তা-পরিচালকরা কিছুই পাবেন না। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিছু পাবেন কি না, তা শিগগির ঘোষিত স্কিমে স্পষ্ট করা হবে।

এখানেই আমানতকারী ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরাতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে মালিক বা পরিচালকদের অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিএসইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি অবসায়ন করা হলে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকলে এ বিষয়ে বিএসইসির তেমন কিছু করার সুযোগ থাকবে না।

সাধারণ অবসায়নের নিয়মে প্রথমে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে দায় পরিশোধ করা হয়। সব দায় পরিশোধের পর অর্থ অবশিষ্ট থাকলে শেয়ারহোল্ডাররা তা পাওয়ার সুযোগ পান। তবে এই তিন এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে সম্পদ বিক্রি করে দায় পরিশোধের পর অর্থ অবশিষ্ট থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে আমানতকারীদের স্বার্থে সরকার যদি অর্থ দেয়, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে মনে করে বিএসইসি।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়নের স্কিম করার সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনেক আগেই চিঠি দেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হলে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো পক্ষের জন্য রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ রাখা হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্যও যেন বরাদ্দ রাখা হয়, চিঠিতে তা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, কোনো কোম্পানিতে না বুঝে, না দেখে বা বিবেচনা না করে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। যে কোম্পানি বিনিয়োগযোগ্য নয়, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সেখানে বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকা উচিত। তিনি বলেন, যেসব দুর্বল কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মানুষ লাখ লাখ টাকা আমানত রেখেছিলেন, তারা নিজেরাই এখন টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। আমানতকারীরাই যেখানে তাদের টাকা পাচ্ছেন না, সেখানে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা কীভাবে টাকা ফেরত পাবেন, সেটি অত্যন্ত জটিল বিষয়।

তার মতে, সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কিছু দিতে হলে সে সিদ্ধান্ত সরকারকেই উদারভাবে নিতে হবে। তবে সাধারণ জনগণের করের টাকা দিয়ে এই লোকসান মেটানো যৌক্তিক হবে না। মাত্র কয়েক লাখ মানুষের লোকসানের ভার দেশের ১৮ কোটি সাধারণ মানুষ কেন বহন করবে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তবে শুধু প্রচলিত আইন দিয়ে বিষয়টির বিচার না করে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের দুর্দশার দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন। তিনি বলেন, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের কোনো ব্যক্তিগত দায় বা দোষ থাকে না। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শুধু চিঠি আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সবাইকে নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাস্তবসম্মত সুরক্ষা কীভাবে দেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করা উচিত।

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ বা সুরক্ষার জন্য বর্তমানে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানির শেয়ারের মূল্য ঋণাত্মক হয়ে গেলে শেয়ারহোল্ডার বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কিছু পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু লুটপাটের কারণে দুরবস্থায় পড়া এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা প্রয়োগ ঠিক হবে না।

কালবেলা