বগুড়ায় দিনের আলোতে মসলার বাজার যেন রঙিন এক উৎসব। জেলার রাজাবাজার, ফতেহ আলী বাজার কিংবা চেলোপাড়ার সরু গলিতে হাঁটলেই বাতাসে ভেসে আসে মরিচের ঝাঁজ, জিরার গন্ধ আর এলাচের সুবাস।
এসব স্থানে ক্রেতারা ভিড় করেন মসলা কিনতে। কিন্তু রাত গভীর হলেই পাল্টে যায় দৃশ্য। দোকানের শাটার নামার পর শুরু হয় অন্য কারবার।
গভীর রাতে শহরের বিভিন্ন মসলা মিল, গুদাম আর কারখানায় ঢুকতে থাকে বস্তাভর্তি নিম্নমানের মরিচ, পচা হলুদ, সস্তা বীজ ও রাসায়নিক রং। কোথাও মরিচের সঙ্গে ধানের তুষ, জিরার সঙ্গে ক্যারাসিড আবার কোথাও কাপড়ের বিষাক্ত রং মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে চকচকে মসলার গুঁড়া। কোরবানির ঈদে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই ভেজাল সিন্ডিকেট।
কয়েকদিন সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শহরের ফতেহ আলী বাজার, রাজাবাজার, বাদুড়তলা, চেলোপাড়া, মগলিশপুর, এরুলিয়া ও শাজাহানপুর এলাকায় গড়ে ওঠা অসংখ্য ছোট মিল ও গুদামকে কেন্দ্র করে চলছে এ কারবার।
দিনের বেলায় যেসব মসলা মানুষ বাজার থেকে কিনে বাড়ি যাচ্ছেন, তার ভেতরে কী মেশানো হচ্ছে, তা তাদের বোঝার সুযোগ নেই। কারণ ভেজাল এখন আর শুধু মিশ্রণ নয়, এটি হয়ে উঠেছে পরিকল্পিত প্রযুক্তি। গন্ধ, রং ও ঝাঁজ সবই কৃত্রিমভাবে ঠিক রাখা হচ্ছে।
অনুসন্ধানকালে গভীর রাতে ফতেহ আলী বাজারের ছাতাপট্টি এলাকায় দেখা যায়, ট্রলি ও ভ্যানে করে বস্তাভর্তি পুরোনো মরিচ, নিম্নমানের হলুদ ও বিভিন্ন গুঁড়া ঢোকানোর দৃশ্য। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী চলছে। তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলের ভেতর থেকে ভেসে আসে মেশিনের শব্দ, বস্তা টানাটানির আওয়াজ আর তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ।
সেখানের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভালো মরিচের সঙ্গে পচা মরিচ মেশায়। পরে রং দেয়। গুঁড়া করলে আর বোঝা যায় না। ঈদের সময় এ কাজ সবচেয়ে বেশি হয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফতেহ আলী বাজারের দোলন মসলা স্টোর ও বগুড়া হলুদ মিলসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তুষ ও নিম্নমানের উপাদান মেশানো হয়। মরিচ গুঁড়া করার আগে বস্তার ভেতরে আলাদা করে ধানের তুষ ঢোকানো হয়। পরে সব একসঙ্গে গুঁড়া করে বাজারে ছাড়া হয়।
সেখানে কাজ করা এক শ্রমিক বলেন, এক বস্তা মরিচে কয়েক কেজি তুষ মেশালে লাভ অনেক বেড়ে যায়। গুঁড়া হওয়ার পর কেউ বুঝতে পারে না।
বগুড়া হলুদ মিলের মালিক কাঞ্চন সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ভেতরে প্রবেশে অনীহা দেখান। তিনি দাবি করেন, আমরা নিয়ম মেনেই কাজ করি। বাজারে আরও অনেক দোকান আছে, সেগুলো দেখেন।
রাজাবাজারের পাশে বাদুড়তলা এলাকায় গিয়ে পাওয়া যায় আরও ভয়ংকর তথ্য। সেখানে কয়েকটি গুদামে জিরার সঙ্গে বালু ও পানি মিশিয়ে ওজন বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশের এক আড়তদার বলেন, এক কেজি ভালো জিরা আর ভেজাল জিরার পার্থক্য সাধারণ মানুষ ধরতে পারবে না। গন্ধ থাকলেই অনেকে ধরে নেয় জিনিস ভালো।
সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর এলাকায় শাহিন আলমের মসলার গুদামে গিয়ে দেখা যায়, আমদানিকৃত দামি জিরার সঙ্গে কম মূল্যের ‘ক্যারাসিড’ মিশিয়ে বাজারজাত করার প্রস্তুতি। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতের বেলায় সেখানে নকল মোড়ক লাগানোর কাজও চলে।

গুদামের এক কর্মচারী বলেন, ক্যারাসিড দেখতে জিরার মতোই। গন্ধও কাছাকাছি। সাধারণ মানুষ বুঝবে না। কম দামের এই বীজ মিশিয়ে বাজারে ছাড়লে কয়েকগুণ লাভ হয়। তবে শাহিন আলম দাবি করেন, আগে কিছু কর্মচারী গোপনে এসব করত। এখন সতর্ক আছি।
চেলোপাড়া এলাকায় কালো এলাচের বাজারেও চলছে কারসাজি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যবসায়ী জগদীশ প্রসাদের প্রতিষ্ঠানে শুকনা এলাচে পানি স্প্রে করে ওজন বাড়ানো হয়। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী বলেন, রাতে মোটর চালিয়ে পাইপ দিয়ে এলাচে পানি দেওয়া হয়। কয়েকঘণ্টা পর ওজন বেড়ে যায়। ভোর হওয়ার আগেই বাজারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জগদীশ প্রসাদ বলেন, আমরা বহু পুরোনো ব্যবসায়ী। মান ঠিক রেখেই পণ্য বিক্রি করি।
শুধু পানি নয়, মগলিশপুর এলাকায় তৈরি হচ্ছে পুরোপুরি নকল কালো এলাচও। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জংলি ফল, খয়ের ও কেমিক্যাল মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এলাচের মতো দেখতে দানা। শুকানোর পর সেগুলো বাজারে বিক্রি হচ্ছে আসল এলাচ হিসেবে।
শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়নের কাজীপাড়া এলাকায় আরএসি ইন্ডাস্ট্রি নামের একটি কারখানায় পচা কাঁচামাল ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রং দিয়ে মসলা তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

কারখানার এক কর্মচারী বলেন, পুরোনো জিনিসে রং দিলেই নতুন লাগে। পরে গুঁড়া করলে আর বোঝা যায় না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব কারখানায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে শিল্পকারখানার ভয়ংকর কছিু রাসায়নিক রং। এর মধ্যে রয়েছে ‘সুডান ডাই’। এটি মূলত কাপড়, জুতা পালিশ ও তেলজাত পণ্যে ব্যবহৃত লাল রং। মরিচের গুঁড়া উজ্জ্বল দেখাতে এটি মেশানো হয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় এ রঙকে ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন শরীরে গেলে লিভার ও মূত্রথলির ক্ষতি হতে পারে। ইউরোপসহ অনেক দেশে খাদ্যে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
‘মেটানিল ইয়েলো’ নামের আরেকটি রং ব্যবহার করা হচ্ছে হলুদের গুঁড়ায়। এটি আসলে টেক্সটাইল ও কাগজ শিল্পের রং।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন এটি গ্রহণ করলে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। শিশুদের মেধা বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া ‘লেড ক্রোমেট’ নামের রাসায়নিকও ব্যবহার করা হয় হলুদকে আরও উজ্জ্বল ও ভারী দেখাতে। এতে সিসা থাকায় এটি অত্যন্ত বিষাক্ত। শরীরে জমে কিডনি বিকল, রক্তদূষণ ও স্নায়বিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশেও মারাত্মক ক্ষতি করে।
উজ্জ্বল লালচে আভা আনতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘রোডামিন-বি’। এটি মূলত কাপড় ও কাগজ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। খাদ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা মসলায় এটি মেশাচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, এই রাসায়নিক দীর্ঘদিন শরীরে গেলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট ও ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের ছাত্র ফরহাদ হোসেন বলেন, আমরা তো খোলা মসলাই কিনি। কম দামে পাওয়া যায়। কিন্তু এখন শুনছি কী কী মেশানো হয়, ভয় লাগছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আসাফুদ্দৌলা বলেন, আগের মতো রান্নার গন্ধ আর স্বাদ পাই না। এখন মনে হয় আমরা অজান্তেই বিষ খাচ্ছি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক ফজিলাতুন্নেছা ফৌজিয়া বলেন, মরিচে রং, জিরায় ক্যারাসিড, গোলমরিচে পেঁপের বীজ, দারুচিনির নামে গাছের বাকল সবই এখন বাজারে চলছে। শুধু জরিমানা করে এই অপরাধ থামানো যাবে না।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, বিভিন্ন সময় মসলা মিল ও গুদামে অভিযান চালিয়ে ভয়ংকর চিত্র পাওয়া গেছে। অনেক স্থানে মসলার বস্তার ভেতরে মরা ইঁদুর, টিকটিকি ও পোকামাকড় পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এছাড়া পচা কাঁচামাল, কাপড়ের রং ও তুষ মেশানোর প্রমাণও মিলেছে।
তিনি বলেন, এদের শুধু জরিমানা করে থামানো যাচ্ছে না। একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করছে। মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত এই অপরাধে এখন আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল বলেন, সবচেয়ে বেশি ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে পাউডার মসলায়, বিশেষ করে হলুদ ও মরিচের গুঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে ভেজাল এমনভাবে মেশানো হয় যে সাধারণ মানুষের তো দূরের কথা, পরীক্ষাগারেও শনাক্ত করতে সময় লাগে, বলেন তিনি।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমুল হক বলেন, এসব বিষাক্ত রং ও রাসায়নিক দীর্ঘদিন শরীরে গেলে কিডনি, লিভার ও মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এছাড়া ক্যানসার, স্নায়ুরোগ, শ্বাসকষ্ট ও শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব রাসায়নিক তাৎক্ষণিকভাবে সবসময় অসুস্থ করে না। ধীরে ধীরে শরীরে জমে বড় রোগ তৈরি করে।