জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নতুন সংসদের সদস্যরা প্রথম ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের সময় এ নিয়ে তৈরি হয় ধোঁয়াশা। বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে আপত্তি জানান। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সদস্যরা দুটি শপথই গ্রহণ করেন।
সরকারদলীয় সদস্যরা সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় গণভোটে দেওয়া মানুষের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে বিরোধী দলে থাকা জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো ছাড় না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আদালতে আইনিভাবে ও রাজপথে কর্মসূচির মাধ্যমে মোকাবিলার কথা বলছেন দলের নেতারা।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট হয়। জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নে বেশিরভাগ ভোটার সম্মতি দিয়েছেন। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ সংসদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত চতুর্থ গণভোটে অংশ নিয়েছেন ৭ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ৫৬ জন। ভোটের হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটে রায় দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। আর সংস্কার বাস্তবায়নে অসম্মতি জানিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন।
এরই মধ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অবৈধ ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সনদটির কার্যকারিতা স্থগিতের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে রিটে। গতকাল বুধবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্য হিসেবে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নয়। যেহেতু সংবিধানে এ বিধানটি নেই এবং সংবিধানের তপশিলেও এরকম কোনো পদে শপথের কোনো ফরম নেই, তাই তারা এখনই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারছেন না।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘যদি সংবিধান সংশোধন করে এরকম একটি বিধান যুক্ত করা হয়, তাহলেই কেবল তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেন।’
এদিকে জামায়াত এবং এনসিপির পক্ষ থেকে জুলাই সনদের বিষয়ে এক চুলও ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মাধ্যমে জুলাই সনদ ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ‘গাদ্দারি’ বলেও মন্তব্য করেছেন তারা। দল দুটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাই সনদ কার্যকর করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবেন তারা। এ নিয়ে প্রয়োজনে রাজপথে কর্মসূচিও পালন করার কথা জানান তারা।
গতকাল এক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যে জুলাইয়ের কারণে ২০২৬-এ জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, সে জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে সবাইকে সংসদে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জামায়াত সোচ্চার থাকবে। জুলাই না আসলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না এবং আমিও বিরোধী দলীয় প্রধান হতে পারতাম না। তাই আমাদের সবার উচিত সংসদে জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়ন করা। এ নিয়ে আমরা কোনো ধরনের ছাড় দেব না।’
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘জুলাই সনদে না ভোট ও ধানের শীষের ভোট সমান হয়েছে অনেক কেন্দ্রে। তারা না ভোটের ক্যাম্পেইন করেছে। নির্বাচনের পর পেইড বুদ্ধিজীবীরা বলছে সরকার (জুলাই সনদ) মানতে বাধ্য নয়। ফ্যাসিবাদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যদি জনরায় অমান্য করা হয়, তাহলে ওদের ফ্যাসিবাদের পরিণতি বরণ করতে হবে। নতুন রাষ্ট্র গঠনের সনদ মেনে নিতে হবে। একচুল পরিবর্তনও জনগণ মেনে নেবে না।’
এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ-গণভোট চ্যালেঞ্জ করলে আইনিভাবে মোকাবিলার ঘোষণা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি শিশির মনির। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের এক পোস্টে তিনি লিখেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ-গণভোট ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ করে যত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, আইনজীবী বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে দক্ষতার সঙ্গে আমরা আদালতে মোকাবিলা করব, ইনশাআল্লাহ। এ বিষয়ে দয়া করে কেউ উদ্বিগ্ন হবেন না।’
এ বিষয়ে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “গণভোট যে আদেশের ভিত্তিতে হয়েছে—অর্থাৎ জুলাই জাতীয় সনদ সংস্কার আদেশ, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের যে সার্বভৌম অভিপ্রায় ও সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা, সে অনুযায়ীই এই গণভোট হয়েছে। আদেশে সুস্পষ্টভাবে লেখা আছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে একই ব্যক্তির কাছে শপথ অনুষ্ঠিত হবে। সেই আদেশ কিন্তু তারা মেনে নিয়েছিল এবং গণভোটে অংশ নিয়েছিল। তাই তারা বর্তমানে যে ব্যাখ্যাটি দিচ্ছে, সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
সংবিধান সংস্কার নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গণভোট বিষয়টি সংবিধানে ছিল না। এই গণভোটের বৈধতা হচ্ছে সেই নির্দিষ্ট আদেশটি। সেই আদেশ আমরা সবাই মেনে নিয়েই এ নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নিয়েছি। ফলে বর্তমানে একটি সাংবিধানিক ও আইনি সংকট তৈরি হলো। আমরা জানি না এর নিরসন কীভাবে হবে। আমরা আহ্বান জানাব, তারা যেন দ্রুততম সময়ে শপথ নিয়ে এ সংকট নিরসন করে এবং জনগণের কাছে সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা বাস্তবায়নে কাজ করে।’
নাহিদ আরও বলেন, “সরকারি দল হিসেবে বিএনপি যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিল না, এটি গণভোটের ‘হ্যাঁ’ জয়কে সরাসরি অবজ্ঞা করা। জনগণের দেওয়া গণরায়কে এর মাধ্যমে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখানো হয়েছে। যে কোনো মূল্যে গণভোটের রায় কার্যকর করতে হবে।’
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ আমাদের জন্য একটা পাওয়া। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়বার একটা সুযোগ আমরা পেয়েছি। এটা একেবারেই মুক্ত একটা বাংলাদেশ। জুলাই সনদের মধ্য দিয়ে আমরা যতটুকু অর্জন করতে পেরেছি, সে অর্জনকে যেন পূর্ণমাত্রায় আমাদের ওপর পেতে পারি, বাংলাদেশ যেন জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ সুফল পেতে পারে, আমরা এ নিয়ে কাজ করব।’
জুলাই সনদ ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ‘গাদ্দারি’ করে বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিম আলম। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশয় দূর করে জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার আহ্বান জানান।