Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর আবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। এখন শপথের অপেক্ষা। এই জয়ে উল্লসিত দলের নেতাকর্মী, সমর্থকরা। 
এই বিজয়ে দলে স্বস্তি ফিরলেও জয়-পরাজয়ে ভোটের হার নিয়ে বিস্মিত বিএনপি। প্রতিটি আসনের ফলে প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। অন্তত ৮০টি আসনে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ী হতে হয়েছে দলের প্রার্থীকে। অনেক আসনে নিশ্চিত জয় ধরা হলেও সেখান থেকে এসেছে দুঃসংবাদ। ভোটের ফল নিয়ে দলের ভেতরে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। 

ঘরোয়া বিবাদ, বিদ্রোহী প্রার্থী ছাড়াও দলের সাংগঠনিক ব্যর্থতাকে দুষছেন অনেকে। এর সঙ্গে ভুল প্রার্থী বাছাই, প্রতিপক্ষের কৌশলের বিপরীতে পাল্টা কৌশল না থাকার দুর্বলতাকেও চিহ্নিত করছেন অনেকে। 
যদিও বিএনপির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেছেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক সব সময় সর্বোচ্চ। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তাদের সমর্থকদের অনেক ভোট ধানের শীষে পড়ার প্রত্যাশা ছিল। সেই হিসাবে ভোটের ব্যবধান বড় হওয়ার কথা। তবে ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করতে হয়েছে। ৮০টির মতো আসনে জয়ের ব্যবধান একেবারে কম। জামায়াতের ভোটের এমন উত্থানে নেতাকর্মীরা বিস্মিত।

প্রতিপক্ষ দলের জনসমর্থন নেই উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস প্রশ্ন তুলেছেন– তাদের কোনো ভোট নেই, এত ভোট এখানে কীভাবে পেল? তিনি বলেন, ওরা ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে, এটা খুব ভয়ংকর। 

মির্জা আব্বাস বলেন, ফলাফলে আমি আনন্দিত, দেশবাসীও আনন্দিত। সবাই ভোট দিয়েছেন। এই রায়টা ঐতিহাসিক। আমরা আশা করছি, জনগণ এই রায়ের প্রতিফলন পাবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান বলেন, শতভাগ সন্তুষ্ট হওয়া কঠিন ব্যাপার। বিএনপি মোটামুটি খুশি। আমরা সবাইকে পুরোপুরি ভোটে আনতে পারিনি। আমরা জনগণকে ভোটমুখী করব। যেন সব মানুষ কেন্দ্রে আসে। 

বড় জয়ের কারণ
বিএনপির এমন বিজয়ের পেছনে নানা কারণ রয়েছে। এর অন্যতম হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব, আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতন, জিয়া পরিবারের সীমাহীন ত্যাগ, বিএনপির প্রতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন আলেমদের সমর্থন, চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে না যাওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশের সমর্থনও রয়েছে। 
অনেকেরই শঙ্কা ছিল, জামায়াত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। এই ‘ভয়’ থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি উদার ও জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ বিএনপিকে ভোট দিয়ে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে। এ ছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক এবার কার দিকে গেছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে বা স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সমর্থকরা আদর্শগত কারণেই জামায়াতকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। ফলে তাদের ভোটের সিংহভাগ বিএনপির বাক্সে গেছে। 

কোথাও ছিল না মহিলা দল 
জামায়াত সারাদেশে তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে সারাদেশ চষে বেড়ালেও বিএনপি ছিল নির্বিকার। জামায়াতের নারীকর্মীরা ভোটের মাঠে কাজ করলেও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। জামায়াত নারী ভোটারকে একদিকে যেমন ধর্মীয়ভাবে প্রভাবিত করেছেন, তেমনি বিগত দিনে বিএনপির অপকর্মকে তুলে ধরে তাদের কাছে টানতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে মহিলা দল নির্বাচনী কাজে নিষ্প্রভ ছিল। আবার গণঅভ্যুত্থানের পর জেন-জি গোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনার সঙ্গেও খাপ খাওয়াতে পারেনি বিএনপি। 

কোন্দল মেটাতে ব্যর্থ শীর্ষ নেতারা
এদিকে নির্বাচনী তপশিলের পর ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় যোগ্য আর অযোগ্যদের মূল্যায়ন নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে ৯০টির বেশি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন। দল থেকে এই বিদ্রোহ নিরসন করতে ব্যর্থ হয়েছেন শীর্ষ নেতারা। শুধু বহিষ্কার করেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে দলটি। যার কারণে দ্বিধাবিভক্ত ছিল পুরো দল। এসব দুর্বলতা শিগগির নিরসন না করতে পারলে সামনে আরও বিপর্যয় আসতে পারে বলেও দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন।

ঢাকার ৭টি আসনে বিপর্যয়
ঢাকা মহানগরের ১৫ আসনের সাতটিতেই জিতেছে জামায়াত। যেটাকে অকল্পনীয় মনে করছেন বিএনপি নেতারা। এর মধ্যে ঢাকা-১২ ও ১৪ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগাভাগিতে অনায়াসে জামায়াত জয়লাভ করে। তবে ঢাকা-৪, ৫ ও ১৬ আসনের ফল বিপর্যয় কোনোভাবেই মানতে পারছেন না দলটির নেতাকর্মীরা। হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে এসব আসনে বিএনপি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী ছিল। খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে এসব আসনে বিএনপি হেরেছে। 
ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াত এবং ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় জামায়াত জোটের প্রার্থী জয়লাভ করে। এর আগে কখনও ঢাকা মহানগরে জামায়াত কোনো আসনে জিততে পারেনি। 

খুলনা বিভাগে ভরাডুবি
সবচেয়ে ভরাডুবি হয়েছে খুলনা বিভাগে। এই বিভাগের ৩৬ আসনের মধ্যে মাত্র ১১টিতে জিতেছে বিএনপি। বিভাগীয় শীর্ষ নেতার পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে মনোনয়ন দেওয়ায় অনেক যোগ্যরাই ছিটকে পড়েন বলে অভিযোগ তৃণমূলের। এতে সৃষ্ট দলীয় কোন্দলে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। 

এই বিভাগের সাতক্ষীরার চার আসনের একটিতেও জেতেনি বিএনপি। এখানে ভুল লোককে মনোনয়ন দেওয়ায় এমনটি হয়েছে বলে জানান জেলার নেতাকর্মীরা। কুষ্টিয়ার চারটি আসনেরও একটিতেও জেতেনি বিএনপি। কুষ্টিয়া চার আসনেও প্রার্থিতায় তৃণমূল নাখোশ ছিল। চুয়াডাঙ্গা ১ ও ২ এবং ঝিনাইদহের চারটি আসনেও একচেটিয়া জয়লাভ করে জামায়াত। ঝিনাইদহে চারটিতেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদ্রোহী এবং অযোগ্যদের মনোনয়ন দেওয়ায় এমন বিপর্যয় ঘটেছে। যশোরের ছয় আসনের পাঁচটিতেই জামায়াত জয়লাভ করেছে। সেখানেও ভুল প্রার্থী বাছাইয়ে এমন ভরাডুবি ঘটেছে। নড়াইল-২ আসন জোটকে ছেড়ে দিলেও বিদ্রোহী প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ছিল বেশি। এখানে ধানের শীষের প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগ আর হিন্দু অধ্যুষিত বাগেরহাট ২ ও ৪ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় জেতা হয়নি বিএনপির। দলটির সাবেক এমপি এমএইচ সেলিম (সিলভার সেলিম) ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএইচ সালাম এসব আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে হেরে যান।

বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনেও বিপর্যয়
রাজশাহী-১ ও ৪ আসনে জামায়াত কখনও জয়ী হতে না পারলেও এবার এই দুটি আসনে চমক দেখিয়েছে। অথচ এই দুই আসনে বিএনপির ভোটারদের প্রভাব বেশি। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনটি সব সময় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও এবার সেখানে জামায়াত জিতেছে। গাজীপুর-৪, নারায়ণগঞ্জ-৪, ফরিদপুর-১ আসনসহ আরও অন্তত ১০ বিএনপি অধ্যুষিত আসনে হেরেছে দলটি।