ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার যখন তুঙ্গে তখন মাঠে ‘তেমন একটা সুবিধা করতে’ পারছে না জাতীয় পার্টি।
প্রচারে বাধাসহ তাদের প্রার্থীরা নানামুখী চাপে থাকার অভিযোগ করেছেন দলের নেতারা।
জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা কতটি আসনে জয় পাবেন, কী আভাস পাচ্ছেন নেতারা? তাদের প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকবেন নাকি প্রকাশ্যে বা নীরবে অন্য প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে সরে যাবেন?
জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের মঙ্গলবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ড্টকমকে বলেন, “আমরা যতগুলো আসনে প্রার্থিতা দিয়েছি, সবাইকে বলেছি- ‘তোমরা থাকো, কোনো বাধা-বিপত্তি এলে যেখানে যেখানে জানানো দরকার, জানাও’। আমরা এখনও সমর্থন দেওয়া বা প্রত্যাহার নিয়ে চিন্তা করিনি।”
তবে দলের একাধিক নেতা বলছেন, তাদের প্রার্থীরা জয়লাভ করতে পারেন, এমন আসনগুলোতে জাতীয় পার্টি ‘মাটি কামড়ে’ পড়ে থাকবে।
আর যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেই সেখানে প্রার্থীরা স্থানীয়ভাবে ‘ভোটের অঙ্কে’ যুক্ত হয়ে ‘সরে যাবেন’ বা ‘নীরব’ থাকবেন, বলছেন ওই নেতারা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। প্রার্থীরা প্রচার শেষ করবেন মঙ্গলবার সকালে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিপাকে পড়ে জাতীয় পার্টি, যারা শেখ হাসিনা সরকারের তিন মেয়াদে বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল।
আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ তকমা দিয়ে দলটির মতো জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধ করার দাবি তোলে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদসহ কয়েকটি দল।
অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দিনে বঙ্গভবনে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় পার্টিও উপস্থিত ছিল।
সেই সূত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথম দফার সংলাপে জাতীয় পার্টিকেও আমন্ত্রণ করেছিলেন। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির মুখে দলটিকে বাদ দেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা ও নির্বাচন কমিশনের সংলাপেও।
এর মধ্যে বিভিন্ন সময় ঢাকাসহ নানা জায়গায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘ্টনা ঘটেছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও কার্যালয় দখল, বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সারাদেশে ২৪৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে জাতীয় পার্টি। শেষ পর্যন্ত ১৯৫টি আসনে দলের প্রার্থীরা ভোটে আছেন। তাদের মধ্যে কারাগারে আছেন তিনজন।
ভোটের প্রচারে বাধা
ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আহসান খান সম্প্রতি তার প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি বলেছেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই তার নির্বাচনি প্রচারে পরিকল্পিতভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে।
কী ধরনের বাধার মুখে পড়ছেন, জানতে চাইলে আহসান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোরডটকমকে বলেন, “রাতের অন্ধকারে কারা আমার প্রচারসামগ্রী ছিঁড়ে ফেলে, তা তো আমি দেখি নাই। গত দুই-তিনদিনে এক অলৌকিক শক্তি তিন-চারশ ব্যানার খুলে ফেলছে। আমি দলের উর্ধ্বতনকে জানিয়েছি।”
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “একটি ভোট পেলেও আমি ভোটের শেষ দেখবো।”
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় একজন নেতার অভিযোগ, সারাদেশের বেশ কয়েকটি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের ওপর চাপ আছে। যেখানে শক্তিশালী, সেখানে প্রত্যক্ষ চাপ এবং কোথাও কেবল সমর্থকদের উপর চাপ প্রয়োগ করছে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর অনুসারীরা।
জাতীয় পার্টির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘মাইনরিটি ও আওয়ামী লীগের কেউ যেন লাঙ্গলে ভোট না দেয়, সেই অপচেষ্টাও আছে কিছু এলাকায়।’
দলের নেতা বলছেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ‘আওয়ামী লীগ ট্যাগ’ দেওয়ার বিষয়টিকে তারা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতি’ হিসেবে দেখছেন।
দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, রংপুর ও লালমনিরহাট এলাকায়, যেখানে তাদের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে প্রার্থীদের কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
ভোটের প্রচার শুরুর আগেই গেল ১০ জানুয়ারি বগুড়া জেলা জাতীয় পার্টি কার্যালয়ের দখলে নিয়ে ব্যানার ঝুলিয়ে দেন ‘জুলাই যোদ্ধারা’। এ সময় জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় পরদিন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বলে দাবি করেন, দলটির বগুড়া-৪ আসনের (কাহালু-নন্দী গ্রাম) মনোনীত প্রার্থী শাহীন মোস্তফা কামাল ফারুক। নিরাপত্তাহীনতায় নির্বাচনি এলাকায় ঠিকভাবে যেতে পারছেন না, তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ভাবছেন তিনি।
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম বুধবার অভিযোগ করেছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছাতক উপজেলার পেপার মিল বাজার সংলগ্ন লেবার পাড়া এলাকায় গাড়ি রেখে প্রচারে যান তিনি। ফিরে এসে দেখতে পান তার গাড়িতে সাঁটানো পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
৩০ জানুয়ারি লালমনিরহাটের হাতিবান্ধায় নির্বাচনি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দলের প্রার্থী মশিউর রহমান রাঙ্গা।
তার চার দিন আগে ২৬ জানুয়ারি যশোর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মিছিল থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী খবির গাজীর প্রচার বাহনে হামলা হয়েছে বলে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।
২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের দিনে রাজশাহীতে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ নিয়ে প্রতিবাদ জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এনসিপি নেতারা। তারা জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে প্রতীক না দেওয়ার দাবি জানায়। তবে তাদের তিন প্রার্থীকে ‘লাঙ্গল’ প্রতীক বরাদ্দ দেন জেলা রিটার্নিং অফিসার।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নের জবাবে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, ‘আমাদের সব জায়গায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ হচ্ছে, এমন নয়। তিনজন প্রার্থী কারাগারে থেকে নির্বাচন করবেন। তাদের জামিনও দিচ্ছে না।”
তবে রংপুরে কোনো বাধা বা ঝামেলা করা হচ্ছে না বলেছেন তিনি।
জয়ের আশা কত আসনে?
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, প্রায় দুই শত আসনে প্রার্থী দিলেও রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সিলেট, বরিশাল জেলায় কিছু আসনে সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে জাতীয় পার্টি।
বাকি সব জায়গাতেই ‘নড়েবড়ে’ অবস্থায়। কোনো প্রচার নেই, কোথাও প্রচার থাকলেও সাড়া নেই, বলছেন ওই নেতারা।
কোথাও কোথাও স্থানীয় বিএনপির প্রতি সমর্থন জানিয়ে নির্বাচনি কাজে যুক্ত হয়েছেন জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা।
কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, বিজয়ী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে থাকা প্রায় ১৮০টি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার মতো অবস্থা নেই।
সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি তার জীবদ্দশায় ভেঙে কয়েক টুকরো হয়েছে। তার মৃত্যুর পর তার ভোট ভাই জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিও এখন তিন টুকরো।
জিএম কাদেরের অংশটি নির্বাচন করতে পারলেও নিবন্ধন জটিলতায় পারছে না অপর দুই অংশ।
এ অবস্থায় জাতীয় পার্টির নেতারা বলছেন, সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাচ্ছেন তারা।
তবে দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “সারাদেশের সাত-আটটি আসনে প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে জাপার প্রার্থীরা।
জিএম কাদের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কতগুলো আসন পাবো, গুনে গুনে তো বলতে পারবো না। আমি অনেক আসনের বিষয়ে আশাবাদী। আমার আসনে অবস্থা ভালো। অনেকে আপত্তি করছে, কিন্তু আমি তো আমাদের সমর্থন বাড়ছে বলে দেখছি।”
প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া সব নির্বাচনে অংশ নিয়েছে জাতীয় পার্টি।
বিগত তিনটি নির্বাচনের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছে দলটি।
১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদে ৩৫, ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৩২, ২০০১ সালের অষ্টম সংসদে ১৩, ২০০৮ সালের নবম সংসদে ২৭, ২০১৪ সালের দশম সংসদে ৩৪, ২০১৮ সালের একাদশ সংসদে ২৫, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৩টি আসন পেয়েছিল জাতীয় পার্টি।
নানান প্রতিকূলতায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অবস্থা ‘শোচনীয়’ বলছেন নেতারা।
মাঠের চিত্র বলছে, জাতীয় পার্টির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত এলাকার মধ্যে অন্যতম রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা এলাকার বেশ কিছু আসনে দলের প্রার্থীরা জয় পেতেন পারেন।
আওয়ামী লীগ না থাকায় এবার রংপুরের ছয়টি আসনে কোথাও জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে ত্রিমুখী, কোথাও দ্বিমুখী লড়াই হবে।
রংপুর-৩ সদর আসন থেকে নির্বাচন করছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। প্রায় চার দশক ধরে আসনটি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এরশাদ পরিবারের হাতে থাকায় অনেকে একে ‘জাতীয় পার্টির আসন’ বলেও অভিহিত করে থাকেন।
এরশাদ, তার স্ত্রী রওশন এরশাদ, ছেলে সাদ এরশাদ ও সবশেষ জিএম কাদের এই আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন।
বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-২ আসনে জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মণ্ডল এগিয়ে থাকবেন বলে তার সমর্থকরা দাবি করেছেন।
এছাড়া রংপুর-৪. রংপুর-৫, রংপুর-৬ আসনেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থায় আছেন বলে দলের নেতাকর্মীরা বলেছেন।
কুড়িগ্রামে চারটি আসনের মধ্যে একটিতে বিজয়ের সম্ভাবনা থাকলেও বাকি তিনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিস্থিতি নেই বলে স্থানীয় ভোটাররা বলছেন।
দিন কয়েক আগে কুড়িগ্রাম-২ আসনের একটি নির্বাচনি সভায় জাতীয় পার্টির ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি ময়নুল ইসলাম ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি অনুসারীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বলেও প্রচার আছে।
তবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ময়নুল ইসলাম বলেন, “পনির উদ্দিন আহমেদ (জাতীয় পার্টির প্রার্থী) আমাকে বাদ দিয়ে রাজনীতি করলেন। আমি এখন দলে আছি নাকি নাই, জানি না।”
তার হিসাবে কুড়িগ্রাম-২ আসনে ধানের শীষ ‘জিতবে’। আর কুড়িগ্রাম-১ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর সঙ্গে অন্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
কুড়িগ্রাম-১ (নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী) আসনে জাতীয় পার্টি প্রার্থী এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান। এ আসনে তিনি একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।
গাইবান্ধা জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে গাইবান্ধা-১ ও ৫ আসনে দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী এগিয়ে থাকলেও জেলার বাকি তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকার সম্ভাবনা সামান্য।
গাইবান্ধা-২ আসনে আবদুর রশিদ সরকার, গাইবান্ধা-৩ আসনে ময়নূর রাব্বি চৌধুরী রুমান ও গাইবান্ধা-৪ আসনে কাজী মশিউর রহমানের জেতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন আছে, বলেন জাতীয় পার্টির একজন যুগ্ম মহাসচিব।
লালমনিরহাটের তিনটি আসনের মধ্যে লালমনিরহাট-১ আসনে মশিউর রহমান রাঙ্গার অবস্থা ভালো বলে দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য। তবে জেলার বাকি দুটিতে পরিস্থিতি অনুকূলে নয়।
সিলেট বিভাগের মধ্যে কেবলমাত্র সিলেট-৩ আসনে মোহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বলে তার নির্বাচনি এলাকার একজন ভোটার বলেছেন।
কিন্তু ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনের মাঠে চিত্র বলছে, বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিক ও জামায়াত জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজুর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ থাকবে।
এছাড়া দলের যে তিনজন প্রার্থী কারাগারে রয়েছেন তাদের মধ্যে গোলাম কিবরিয়া টিপু তার নির্বাচনি এলাকায় বাবুগঞ্জ ও মুলাদী উপজেলায় আলোচনায় আছেন।
বরিশাল-৩ আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের একজন বিএনপির জয়নুল আবেদীন। হাবিবা কিবরিয়া তার বাবার হয়ে প্রচার চালাচ্ছেন।
ভোটারদের একটি অংশের ধারণা, জয়নুল আবেদীনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন কারান্তরীণ জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপু।
দুইবারের এমপি হওয়ায় জাতীয় পার্টির একটি কর্মী বাহিনী রয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ভোটাররাও তার দিকে ঝুঁকে রয়েছেন।
কারাগারে থাকা জাতীয় পার্টির অপর দুই প্রার্থী হলেন নরসিংদী-২ আসনে এ এন এম রফিকুল আলম সেলিম ও শেরপুর-১ আসনে মাহমুদুল হক মনি।
জিএম কাদের বলেন, “আদালত জামিন স্থগিত করছে, এটা সমস্যা। কিছু-কিছু জায়গায় বাধা-বিঘ্ন আছে, দুয়েকটি দলের লোকেরা করছে। কিন্তু আমরা এসব গুরুত্ব দিচ্ছি না। এগিয়ে যাচ্ছি।”
নির্বাচনি আসনে ‘ঝামেলা’ করার অভিযোগ এনে জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসতে পারে। এক্ষেত্রে বিএনপিকেও অবহিত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে দলের শীর্ষস্থানীয় এক নেতা বলেছেন।
জাপা সরে যাবে নাকি নীরব থাকবে?
প্রতিপক্ষের চাপে থাকা জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত ভোটের থাকবে কিনা তা নিয়ে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত আলোচনা চলছে। যেখানে জয়ে আশা আছে সেখানে মাঠে থাকা এবং অন্যগুলো হিসাব-নিকাল করে এগনোর কথা বলছ দলটি।
জাতীয় পার্টির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “বাকি আসনগুলোতে জাপা স্থানীয়ভাবে ভোটের অঙ্কে যুক্ত হবে। কোথাও প্রার্থী নিজেই সমর্থন জানাবেন, কোথাও সমর্থকেরা স্বেচ্ছায় বিএনপি বা অন্য শক্তিশালী প্রার্থীর দিকে যাবে।”
তবে দলের চেয়ারম্যান বলছেন, তারা এখনো অন্য কোনো দল বা প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া বা প্রত্যাহার নিয়ে চিন্তা করেননি।
এক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গেও কোনও আলাপ হয়নি বলছেন জিএম কাদের।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, “নির্বাচনের এখনও বেশ কদিন বাকি। শেষ কথা বলার সময় আসেনি। কিন্তু জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় নির্বাচন ইনক্লুসিভ হচ্ছে। বিএনপি চায় নির্বাচন কালারফুল হোক।”
কিন্তু জাতীয় পার্টির প্রার্থী যেখানে নেই, সেখানে কী হবে?
জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসনে দলের প্রার্থী নেই। এলাকায় কিছু নেতাকর্মী আছেন, যারা বিএনপির সঙ্গে মিলে মিশে আছেন।
স্থানীয় একজন ভোটার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটমকে বলেন, “জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি মামুনুর রশীদ জোয়ার্দারের অনুসারীরা স্থানীয় বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে কাজ করছেন। জাপার ভোটারের সংখ্যাও খুব কম।”
২০১৪ সালে মামুনুর রশীদ, ২০১৮ সালে মুরাদ হাসান, ২০২৪ আব্দুর রশীদ এমপি ছিলেন আসনটিতে। তবে বর্তমানে ধানের শীষের প্রার্থী ফরিদুল কবির তালুকদারের (শামীম তালুকদার) দিকেই স্থানীয় জাতীয় পার্টির ভোট যাবে বলে মনে করছেন সরিষাবাড়ী এলাকার ওই ভোটার।
ঢাকা-৪ আসনে জাতীয় পার্টির সমর্থকদের ভোট বিএনপির প্রার্থীর দিকে যাবে, এমনটি মনে করছেন কেন্দ্রীয় একজন নেতা। এখানে দলের প্রার্থী নেই।
জাতীয় পার্টি থেকে এই আসনে কয়েকবার এমপি হয়েছেন সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। এখন তিনি আনিসুল ইসলাম মাহমুদদের সঙ্গে আছেন। এখানে প্রায় ২৫ হাজার ভোট আছে তার। এই ভোট কার বাক্সে যাবে?
এ বিষয়ে সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা মন্তব্য করতে চাননি।
জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ অংশ ৪৮টি আসনে মনোনয়ন দিলেও নির্বাচন কমিশন তাদের মনোনয়ন বাতিল করেছে।
এ অংশটি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি-জেপিসহ কয়েকটি দল মিলে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ নামে নির্বাচনি জোট গঠন করে।
তফসিল ঘোষণার পর ২০ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির আরেকটি অংশের চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের চট্টগ্রামের হাটহাজারীর গ্রামের বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
জাতীয় পার্টির এই অংশের নেতারাও স্থানীয় হিসাব-নিকাশে জড়িয়ে পড়েছেন বলে দলের প্রভাবশালী একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন।
দলের এ অংশের মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদারের ঘনিষ্ঠ একজন বলেন, “বরিশাল, পটুয়াখালীর বেশ কয়েকটি আসনে হাওলাদারের অনুসারীদের ভোট যাবে নানা দিকে। ইতোমধ্যে কোনো আসনে বিএনপি, কোনো আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীরাও যোগাযোগ করছেন।”
রুহুল আমীন হাওলাদারের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।