ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের বাকি আর মাত্র সপ্তাহখানেক। কিন্তু শেষ সময়ে এসেও ধানের শীষ প্রতীক না পেয়ে সারা দেশে ৬৫টির মতো আসনে বিএনপির ‘অভিমানী’ নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে ৩৫-৪০টি আসনে ভোটের লড়াইয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন দলটির এই স্বতন্ত্র প্রর্থীরা। এর মধ্যে আবার ২০টির মতো আসনে ধানের শীষ প্রতীকের কিংবা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রার্থীদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপি নেতারা। হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাকি সব স্বতন্ত্র প্রার্থী জোর নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন; যাদের বেশ কয়েকজন এরই মধ্যেই সভা-সমাবেশের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন, যা বিএনপির দলীয় এবং সমঝোতার প্রার্থীর জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কেননা, বিএনপির পক্ষ থেকে বোঝানোসহ নানান উদ্যোগের পরও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটের মাঠে থাকায় সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছে দলের তৃণমূল।
অনেকে মনে করছেন, এ অবস্থায় অনেক আসনে বিদ্রোহীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি অনেক আসনে বিএনপির ভোট কাটাকাটির কারণে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যাচ্ছে। যা বিএনপির জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য বিএনপির দাবি, নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও তাতে দলীয় বা জোট প্রার্থীদের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ, বিএনপির তৃণমূল শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের পক্ষেই থাকবে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, তারা (বিএনপি) মনে করছেন যে, যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করছে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে; দলীয় প্রার্থীদের এতে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। স্থানীয়ভাবে দলের নেতাকর্মীরা এখন দলের মনোনীত কিংবা সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তারাই বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আশা করছি, নির্বাচনে তারই প্রতিফলন ঘটবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী দেয় বিএনপি। তবে এর মধ্যে ঋণখেলাপির অভিযোগে কুমিল্লা-৪ আসনে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় বিএনপির দলীয় প্রার্থী নেই। আর সমঝোতার ভিত্তিতে ৮টি আসন শরিকদের জন্য ছেড়ে দেয় দলটি। অবশ্য কৌশলগত কারণে নির্বাচনে বিজয় ত্বরান্বিত করতে শরিকদের মধ্যে সাতজনকে বিএনপিতে যোগদান করিয়ে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়। এ ছাড়া জোটের ‘অনিবন্ধিত’ একটি দলকেও ধানের শীষ দেয় বিএনপি। সব মিলিয়ে শরিকদের জন্য ১৬টি আসন ছেড়েছে দলটি। তবে এর মধ্যে ১২টিতেই বিএনপির নেতারা ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র তথা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন।
শুরুতে ১১৭ আসনে বিএনপির ১৯০ জনের মতো নেতা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া ঠেকাতে অনেকের সঙ্গে আলোচনা করে বিএনপি। আঞ্চলিকভাবে দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা তাদের সঙ্গে কথা বলেন, প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে পরিণতির বিষয়েও তাদের হুঁশিয়ার করেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজনকে ঢাকায় ডেকে কথা বলেন তারেক রহমান। এমন উদ্যোগের ফলে অনেকে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে ধানের শীষ বা জোট প্রার্থীকে সমর্থন করেন। এরপরও যারা ভোটে রয়েছেন দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় দল। দেখা গেছে, কোনো কোনো আসনে বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। আবার কোথাও কোথাও এক ব্যক্তি একাধিক আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপির দপ্তর বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যেসব নেতা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, এমন অন্তত ৭১ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃত এসব নেতার মধ্যে বেশ কিছু সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের অনেকেই এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে দলের মনোনীত কিংবা সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তবে দলীয় বা জোট প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় গত কয়েকদিনে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। অনেক জায়গায় বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় বিএনপির স্থানীয় কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে। তবুও বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠ ছাড়েননি। দলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে ভোটের প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। দলীয় বহিষ্কারের ভয়ে পদধারী কেউ কেউ নীরবে তাদের সমর্থন দিচ্ছেন। আবার কোথাও কোথাও মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের কেউ কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী না হলেও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামছেন না।
তপশিল অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হয় গত ২০ জানুয়ারি। তবে বিদ্রোহীদের অনেকে ধীরে ধীরে ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন, যা নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে ধানের শীষ এবং জোট প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয়। এ অবস্থায় নির্বাচনে থাকা বিদ্রোহী প্রার্থীদের ‘নিষ্ক্রিয় করতে’ দলের পক্ষ থেকে তৎপরতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এ তৎপরতার সুফলও পাচ্ছে বিএনপি। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন দল বা জোটের প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে ভোট থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাৎক্ষণিক পুরস্কার হিসেবে দল থেকে তাদের বহিষ্কারাদেশও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিএনপির তৃণমূল নেতাদের বহিষ্কারের পর ভোটের মাঠের দৃশ্যপটে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নেতাকর্মীরা শুরুতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষ নিলেও সাংগঠনিক ব্যবস্থার পর ধীরে ধীরে ধানের শীষ ও জোট প্রার্থীর পক্ষে ঝুঁকছেন। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয় সমর্থন এবং নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের তৃণমূল সফরের মধ্য দিয়েও ধানের শীষ ও জোট প্রার্থীদের পক্ষে জোয়ার তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা সফরে ধানের শীষ ও জোট প্রার্থীদের একসঙ্গে মঞ্চে নিয়ে সমাবেশ করছেন। একই সঙ্গে জনতার সামনে ধানের শীষ ও জোটপ্রার্থী হিসেবে তাদের নিজেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট আসনে দলের বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ‘প্রান্তিক’ তথা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন। অনেকের অভিমত, এটা বহিষ্কারের চেয়েও বড় ফল বয়ে আনছে। তাদের দাবি, এর মধ্য দিয়ে বিএনপির তৃণমূল বিদ্রোহী প্রার্থী থেকে ক্রমেই ধানের শীষ কিংবা জোট প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকছে।
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে দলের মিডিয়া সেলের সদস্য ফারজানা শারমিন পুতুলকে বিএনপির প্রার্থী করেছে দল। তবে এ আসনে ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কার হয়েছেন দলের সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। বহিষ্কৃত হলেও জনসভাসহ প্রচার-প্রচারণার মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার বিএনপিতে ফেরার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন টিপু।
বাগেরহাট জেলার চারটি আসনের সব কয়টিতেই আছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। এর মধ্যে বাগেরহাট ১, ২ ও ৩—এই তিন আসনে প্রার্থী হয়েছেন বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিলভার লাইন গ্রুপের কর্ণধার এমএএইচ সেলিম। অবশ্য বর্তমানে বিএনপিতে তার কোনো পদ নেই।
টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে প্রার্থী করেছে দল। তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দল এরই মধ্যে তাকে বহিষ্কার করেছে। স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ ফরহাদের পক্ষ নেয়। তবে গত ৩১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলে তারেক রহমানের জনসভার পর তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ক্রমেই টুকু তথা ধানের শীষের দিকে ঝুঁকছে বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) আসনে ধানের শীষ পান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তবে এ আসনে স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী হন উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর রুবেল। আসনটিতে প্রার্থী সাতজন হলেও ভোটের আলোচনায় শীর্ষে রয়েছেন তারা দুজন। স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিকভাবেও তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। যে কারণে ভোটের ব্যালটেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন প্রিন্স-রুবেল।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা ঢাকা-১২ আসনটি গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পান ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে রয়েছেন; বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের নিয়ে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা, গণসংযোগও করছেন। এ আসনে সাইফুল হকের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন নীরব। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগে গত ৩০ ডিসেম্বর তাকে বিএনপির সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
ঢাকা-১২ আসনে সাইফুল হকের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন মহানগর উত্তর বিএনপির ১নং সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার। তিনি কালবেলাকে বলেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের ‘কোদাল’ মার্কার পক্ষে এরই মধ্যে বিএনপির ৮০% নেতাকর্মী কাজ করছেন। প্রচারণায় তারা ভালো সাড়া পাচ্ছেন। অল্প কিছু লোক স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গে রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, বাকিরাও খুব শিগগির কোদাল মার্কার সঙ্গে চলে আসবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকায় নির্বাচনী সমাবেশ করবেন। এরপর বিষয়টি আরও ক্লিয়ার হয়ে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে খুব বেশি প্রভাব ফেলা যায় না। কারণ, নেতাকর্মীরা দলের পক্ষেই থাকে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এই আসনে শেষ পর্যন্ত বিএনপি নেতা সাইদুজ্জামান কামাল বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এজন্য দল এরই মধ্যে তাকে বহিষ্কার করেছে। তবে কামালের পক্ষে বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে কাজ করছেন, আবার কেউ কেউ দলীয় বহিষ্কারের ভয়ে নীরবে সমর্থন দিচ্ছেন। তাই সাইদুজ্জামান কামালের প্রার্থিতা সাকির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুন ঘোড়া প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য এবং ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি। এ আসনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দিয়ে বিএনপি প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় হাসান মামুনকে বহিষ্কার করা হলেও তৃণমূলের বড় একটি অংশ তার সঙ্গে রয়েছেন। ফলে হাসান মামুন শক্ত প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ভোটের মাঠে।
জমিয়তের সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। তবে বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণ দে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। দুজনকেই এরই মধ্যে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তবে বিএনপির পদধারী সাবেক নেতা ও সাধারণ কর্মী এবং সাধারণ মানুষের সমর্থনে রুমিন ফারহানার পক্ষে এরই মধ্যে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে।
গণঅধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে রয়েছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। এ জন্য ফিরোজকে এরই মধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এরই মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও পাশে থাকায় তাদের বড় অংশ ফিরোজের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এতে করে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী রাশেদ।
বিএনপিতে যোগ দিয়ে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসন থেকে ধানের শীষ পান আমজনতার দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া। আর ধানের শীষ না পেয়ে এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়া এরই মধ্যে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। জানা গেছে, তৃণমূল বিএনপির পদধারী সাবেক নেতা এবং সাধারণ কর্মীরা সুজাত মিয়ার সঙ্গে রয়েছেন। এ ছাড়া পদধারী অনেক নেতাও গোপনে তার পক্ষে কাজ করছেন। অন্যদিকে পদধারী অবশিষ্ট নেতারা রেজা কিবরিয়ার সঙ্গে থাকায় আসন্ন নির্বাচনে এ দুজনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্যতা ও জনভিত্তি থাকায় বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভেতর থেকে অনেকেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসতে পারেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, নিজ নিজ এলাকায় নিশ্চয় তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও শক্ত ভিত্তি রয়েছে। সুতরাং নির্বাচনে তাদের ভেতর থেকে অনেকেই বেরিয়ে আসতে পারেন। শরিকদের বিএনপি সমর্থন করলেও তাদের অনেকের সংশ্লিষ্ট এলাকায় ওই মাত্রায় গণভিত্তি নেই, যেটা বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের রয়েছে। যদিও শরিকরা গণঅভ্যুত্থানের সময় ছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন। তবে তারা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। অন্যদিকে বিএনপির স্বতন্ত্ররা তো স্থানীয় নেতা। ফলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে তাদের একটা গুরুত্ব তো থাকবেই। এ ছাড়া তারা হামলা-মামলা তথা দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। মানুষ ভাবছে, এই লোকটা তো এলাকায় তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে মিশেছে, দুর্দিনে তাদের পাশে ছিল। তা ছাড়া আন্দোলন-সংগ্রামে এসব স্বতন্ত্রদেরও রাজপথে ভূমিকা-ত্যাগ রয়েছে। তারাও মামলা-হামলা, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার।’
তিনি আরও বলেন, আর যেখানে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপির নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন—সেখানে কার ভিত্তি কত শক্ত, কার জনপ্রিয়তা বেশি; সেটার ওপর জয়-পরাজয় নির্ভর করবে। সুতরাং অনেক জায়গাই বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী ধানের শীষ বা জোট প্রার্থীর জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে ভোটারদের মধ্যে একটা সাইকোলজিক্যাল চেঞ্জ এসেছে। সবকিছু ওপর থেকে চাপিয়ে দিলে তা মেনে নেবে, ব্যাপারটা এখন আর ঠিক এ পর্যায়ে নেই, সময় পরিবর্তন হয়েছে। আমাদেরকে এটাও মনে রাখতে হবে, চব্বিশের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে ৫৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন।