সংসদ নির্বাচন ঘিরে জমজমাট প্রচার-প্রচারণা চলছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনে। প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস যেমন আছে, পাশাপাশি সংঘাত-সহিংসতার কারণে এই এলাকায় ভোটের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কার কথাও বলেছেন অনেকে।
তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনে বেশ কয়েকটি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেও সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে গত কয়েকদিনে।
তবে, ভোটারদের মাঝে ভোট নিয়ে উৎসবের পরিবেশও দেখা গেছে। পথে পথে ব্যানার, নগরজুরে মাইকিং, কখনো বা ঢোল বাদ্য বাজিয়ে নানা আয়োজন দেখা গেছে নির্বাচন ঘিরে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনের ভোটাররা একবাক্যে বলছিলেন, বন্দরনগরী সবচেয়ে বড় সংকট জলাবদ্ধতা ও যানজট। তাদের দাবি, যেই ভোটে জিতুক তারা যেন উদ্যোগ নেন সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি বন্ধের।
এদিকে, প্রচারণার জন্য অল্প সময় বাকি থাকায় ভোটারদের সমর্থন আদায়ে শেষ চেষ্টাটুকু করছেন প্রার্থীরা। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে সবগুলোতেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রার্থীদের মধ্যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলেছে।
আগে থেকেই চট্টগ্রামে সাংগঠনিক অবস্থান মজবুত থাকায় নির্বাচনী লড়াইয়ে উজ্জীবিত বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করছেন, হাতে গোনা দুয়েকটি আসন বাদ বাকিগুলোতে জয় পাবেন তারা।
অন্যদিকে, দুইটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী আছে বিএনপির, কোথাও কোথাও দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সংকটও আছে। আর এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী।
তবে নির্বাচন ঘিরে যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে, ভোটারদের শঙ্কা বাড়ছে সেই বিষয়টি কীভাবে সামাল দেবে নির্বাচন কমিশন–– এমন প্রশ্নে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এবারের নির্বাচন ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবে ইসি।

তিনটি সমস্যার সমাধান চান ভোটাররা
চট্টগ্রামের নালাপাড়া বাজারে কথা হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আসলাম হোসেনের সাথে। প্রায় দেড় যুগ ধরেই চট্টগ্রাম শহরে তার বসবাস।
তিনি বলছিলেন, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামে সামান্য বৃষ্টিতেই যে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে, তা নিয়ে কোনো সমাধান এখন পর্যন্ত কোনো সরকার করতে পারেনি।
এখানকার বাসিন্দাদের অনেকেই বলছিলেন, নগরীর পানি নিষ্কাশনের জন্য যে খাল না নালাগুলো ছিল সেগুলোর অনেকাংশেই দখল হয়ে গেছে। যে কারণে বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয় বর্ষা মৌসুমসহ বছরের বিভিন্ন সময়।
এই যেমন, হাফিজা আক্তার বলছিলেন তার বাড়ির পাশের একটি নর্দমা আটকে রাখছে একটি পক্ষ। যে কারণে বৃষ্টি হলেই পুরো বাড়িঘর তলিয়ে যায় তারা। এ নিয়ে তিনি সমাধানের চেষ্টা করেছেন, সরকার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাদের কাছেও গিয়েছেন; কিন্তু কোনো সমাধান এখনো পাননি।
তিনি বলছিলেন, "যখন আমাদের পরিবার প্রতিবাদ করছে, কথা বলছি, তখন খাল দখলদাররা আমার ছেলেরে ফোন করে বলছে কাফনের কাপড় রেডি রাখিস"।
এলাকার বাসিন্দাদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দখলদাররা খাল-নালাসহ বিভিন্ন জলাশয় দখল করে স্থাপনা দোকান নিমার্ণের ফলে অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতা আরো বেড়েছে।
গত কয়েক বছরের চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু এতে খুব বেশি সমাধান আসেনি। যে কারণ যানজট নিরসনে স্থায়ী সমাধানের কথাও বলছিলেন ভোটারদের অনেকেই।
কেউ কেউ আবার নাগরিক ভোগান্তির পাশাপাশি চাঁদাবাজির বিষয় নিয়েও কথা বলেছেন। তাদের অনেকেই বলেছেন, এখানে কেউ নতুন করে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করতে গেলে চাঁদা গুনতে হয়।
পার্কিং স্পেস থেকে শুরু করে বাজারের বিভিন্ন দোকানেও চলে চাঁদাবাজি। যা গত দেড় বছরে আরো বেড়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে বলছিলে, নালাপাড়া বাজার এলাকার ভোটার মো. মহিউদ্দিন।
তিনি বলেন, আমরা চাই এমন একজন ভোটে জিতুন যিনি চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে এলাকার মানুষকে রক্ষা করবে।
বিশেষ করে গত কয়েক মাসে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায়ও চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা গেছে।

নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা কেন?
প্রায় ৬৬ লাখ ভোটারের চট্টগ্রাম জেলায় মোট সংসদীয় আসন রয়েছে ১৬টি। সিটি করপোরেশেন এলাকার বাইরে মেট্রোপলিটন শহরের বাইরে চট্টগ্রামের রাজনীতি দুই অঞ্চলে বিভক্ত।
কর্ণফুলী নদীর এক প্রান্ত থেকে কক্সবাজার জেলার এই সীমান্ত পর্যন্ত দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং মিরসরাই থেকে রাঙ্গুনিয়া পর্যন্ত উত্তর চট্টগ্রাম।
গত ১১ই ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। এই তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই চট্টগ্রামের বেশ কয়েক জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
গত বছরের তেসরা নভেম্বর বিএনপি প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকা ঘোষণার পর নির্বাচনের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা দেয় বিএনপি। ওই সময় মনোনয়ন নিয়ে রাস্তা অবরোধ ও অগ্নিসংযোগসহ সহিংসতা ছড়ায় সীতাকুণ্ড এলাকায়।
এর একদিন পরেই চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর একটি কর্মসূচিতে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত হয়, আহত হন এরশাদ উল্লাহও।
সব খানে যখন নির্বাচনের পরিবেশ, এরইমধ্যে সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন র্যাবের এক কর্মকর্তা।
গত কয়েক দিনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেও নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে মীরসরাই, রাউজান, ফটিকছড়ি, সাতকানিয়াসহ বেশ কিছু এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীতেই খুনের ঘটনা ঘটেছে ২২টি, অস্ত্রবাজির ঘটনা ২৩টি। আর চট্টগ্রাম রেঞ্জে এই সংখ্যা যথাক্রমে ২০৯ এবং ২০২টি।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে অনেক প্রার্থীর।
ভোটারদেরও অনেকেই বলছিলেন, এমন যদি পরিবেশ থাকে তাহলে অনেকেই ভোটের দিন কেন্দ্রে যেতে আগ্রহ দেখাবেন না।
চট্টগ্রামের নগরীরর পতেঙ্গা এলাকায় কথা হয় আলী হোসেনের সাথে। মি. হোসেন বলছিলেন, অনেক বছর পর ভোটের আমেজ পাচ্ছিলাম, আবার দেখলাম হামলা হচ্ছে, ঝামেলা হচ্ছে, এসব হলে নির্বাচন হবে কি-না সেই চিন্তাও তৈরি হয়।
চট্টগ্রামে গত কয়েকমাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের বেশিরভাগই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। শুধু সীতাকুণ্ডেই রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছেন অন্তত চারজন।
যদিও আঞ্চলিক আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম -১১ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এবারের নির্বাচনে ভোটের মাঠে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যারা দায়িত্ব পালন করবে তাদের সব রকম প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে
চট্টগ্রামে সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্ত অবস্থান রয়েছে বিএনপির। তবে বিভিন্ন আসনে দলীয় মনোনয়ন ঘিরে অসন্তোষ ও কোন্দল দেখা গেছে বিএনপিতে। আন্দোলনের মুখে সীতাকুণ্ডে প্রার্থী পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে দলটি।
মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষের বাইরে দুইটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীও আছে বিএনপির। এছাড়াও দলীয় কোন্দল কিংবা মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ আছে বেশ কয়েকটি আসনে। কোথাও কোথাও মনোনয়ন নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশাও রয়েছে।
যে কারণে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী এবং ভোটারদের কেউ কেউ বলছিলেন, আগামী নির্বাচনে চট্টগ্রামে বিএনপির বেশকিছু আসন হাতছাড়া হতে পারে।
যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম-১১ আসনের বিএনপি প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, তারা আশা করছেন যে সবগুলো আসনেই জয় আসতে পারে বিএনপির।
"জনগণের বিএনপির প্রতি একটা আস্থা আছে। আগেও ছিল এখনো আছে। সেই আস্থার ভিত্তিতেই মানুষ এবার বিএনপিকে ভোট দেবে বলে আমি মনে করি," বিবিসি বাংলাকে মি. চৌধুরী বলছিলেন।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের সবগুলো আসনে জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থান ততটা মজবুত না হলেও, শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকেই তারা নির্বাচন ঘিরে মাঠে নেমেছে। ফলে ভোটার একটা অংশের কাছে তাদের সমর্থনও বেড়েছে।
ভোটাররা বলছিলেন, গত দেড় বছরে বিএনপি নেতাদের কিছু নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের কিছুটা সমর্থনও বেড়েছে।
দলে অন্তঃকোন্দল না থাকলেও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থিতা নিয়ে এখনো সংকট চলছে চট্টগ্রাম-৮ আসনে।
এই আসনটিতে এনসিপিকে জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার পরও জামায়াতের প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেনি। ফলে, আসনটি ঘিরে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে কিছুটা সংকটও দেখা দিয়েছে।
এর বাইরে কয়েকটি আসনে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা।
জামায়াতের চট্টগ্রাম মহানগর আমীর নজরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, আমরা মনে করি এই নির্বাচনের চট্টগ্রামে অর্ধেকের বেশি আসন জামায়াত পেতে পারে। তবে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। কাজে বাধা দেওয়া হচ্ছে"।
যদিও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ কতটা শঙ্কামুক্ত থাকে তা নিয়ে এখনো শঙ্কা রয়েছে দলটির মধ্যে।