আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে ইশতেহার সাজিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন সামনে রেখে দেওয়া এই ইশতেহারের মোটো বা মূলনীতি ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’। প্রতিটা সেক্টরে দুর্নীতি নির্মূলের রূপরেখা সাজিয়ে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে চায় দলটি। দেশের ৪১টি মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪১টি ভাগে দেওয়া হবে জামায়াতের ইশতেহার।
জামায়াতের ইশতেহার কমিটি ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের ইশতেহার ও করণীয় ঠিক করতে দেশ ও দেশের বাইরে থাকা শিক্ষক, চিকিৎসক, পলিসি এক্সপার্ট, সাবেক সচিবসহ বিভিন্ন বিভাগের এক্সপার্টদের প্রায় ২০০ জন সদস্য কাজ করেছেন। ৪১টি মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪১টি আলাদা প্যানেল কাজ করেছে। জানা যায়, ইশতেহারের মূল লক্ষ্য তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ধারণ করা হয়েছে, যা হলো : সুশাসন নিশ্চিতকরণ, চাঁদাবাজি নির্মূল এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। জামায়াতের এসব পলিসি এক্সপার্টকে (নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞ) মতে, গুড গভর্ন্যন্স বা সুশাসন তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি খাত থেকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি কার্যকরভাবে দূর করা যাবে।
জামায়াতের আমিরের ফেসবুক পেজে প্রতিদিন পৃথক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী এসব বার্তা তুলে ধরা হচ্ছে, যার অন্যতম লক্ষ্য রাষ্ট্র পরিচালনায় দুর্নীতি নির্মূলের কৌশল জনগণের সামনে তুলে ধরা। ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’—এই মূল থিমের আওতায় বিভিন্ন সেক্টরে নানা প্রতিশ্রুতি থাকলেও সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দমন।
দুর্নীতি দমনে আইসিটির সর্বোচ্চ ব্যবহারের পরিকল্পনা : পলিসি এক্সপার্টরা জানান, প্রযুক্তিকে শুধু আয়ের উৎস নয়, দুর্নীতি দমনের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে। নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি আর্থিক লেনদেন নগদে করা যাবে না। প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল প্রমাণ থাকতে হবে। এর মাধ্যমে কালো টাকা ও ঘুষ লেনদেন বন্ধ করা সহজ হবে। আইসিটিতে ফ্রিল্যান্সিং বাড়ানো, আয় বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বড় বিষয় হলো—বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি শনাক্ত ও নির্মূল করা।
যোগ্য মানূষ গড়ে তুলতে আর্থিক সহযোগিতা : ইশতেহারে পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে এক কোটি দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য হিউম্যান স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রসেসিং জোন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে থাকা, খাওয়া ও প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকবে। বিদেশগামী কর্মীদের ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রেমিট্যান্স তিন থেকে পাঁচ গুণ বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
জামায়াতের পলিসি এক্সপার্টরা বলছেন, বিএনপি যেখানে নগদ ভাতা বা কার্ডভিত্তিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেখানে জামায়াত বলছে মানুষকে টাকা নয়, যোগ্যতা ও দক্ষতা দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা যদি ইংরেজি দক্ষতার জন্য আইএলটিএস বা বিদেশ যাওয়ার জন্য ভাষা শিখতে চায় বা কম্পিউটার স্কিল শিখতে চায়, তাহলে সেই প্রশিক্ষণের খরচ রাষ্ট্র বহন করবে। তবে কোনো হাতখরচ বা নগদ টাকা দেওয়া হবে না।
নারীদের ক্ষেত্রেও নগদ অর্থ না দিয়ে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির খামার বা ক্ষুদ্র উদ্যোগ সরাসরি করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যুবকদের জন্য পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা থাকবে, যাতে তারা গ্রাফিক ডিজাইন সেন্টার বা ক্ষুুদ্র ব্যবসা শুরু করতে পারে। লক্ষ্য একটাই—মানুষকে স্বাবলম্বী করা, হাতে হাতে টাকা দেওয়া নয়।
অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশু ও ষাটোর্ধ্ব বয়স্কদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা : স্বাস্থ্য খাতে ইশতেহারে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হবে।
মূল বাজেটে হাত না দিয়ে ইশতেহার অনুযায়ী আর্থিক পরিকল্পনা : এসব প্রতিশ্রুতির অর্থ কোথা থেকে আসবে—জানতে চাইলে জামায়াতের পলিসি এক্সপার্টরা বলেন, ‘আমাদের আর্থিক আয় ও ব্যয় কিভাবে হবে, তা প্রতিটি পলিসি প্ল্যানে দেওয়া হয়েছে।’ তাঁরা বলছেন, দেশে রাজস্ব আদায়ে ফাঁকি, দুর্নীতি রোধ ও সরকারের দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে বছরে কমপক্ষে এক থেকে দুই লাখ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব, যা বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। শতভাগ দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও আংশিক কমানো গেলেই বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ পাওয়া যাবে। এই অর্থ দিয়েই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে। যা হবে বিদ্যমান বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়েই।
ইশতেহার কমিটির অন্যতম সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোকাররম হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বড় একটি দল ইশতেহার তৈরিতে কাজ করছে। পুরো ইশতেহারটি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কাঠামোতে সাজানো হয়েছে। ৪১টি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা টিম কাজ করছে। এ পর্যন্ত সাতটি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ পলিসি পেপার প্রকাশ করা হয়েছে এবং আরো অন্তত ৯টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নীতিপত্র প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। দেশ ও বিদেশের প্রায় ২০০ বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক ও বর্তমান প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং গবেষক এক বছর ধরে এসব নীতি প্রণয়নে কাজ করছেন।
তিনি জানান, ১৬টি পূর্ণাঙ্গ পলিসি পেপার নির্বাচনের আগে প্রকাশ করা হবে। পলিসি পেপারে যা প্রকাশ হয়েছে, তা-ও মূল ইশতেহারে থাকবে। ইইউভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইরাসমাসের এশিয়ার রিজিওনাল ম্যানেজার ড. আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াত আমাদের কাছে পলিসি চেয়েছে, আমরা আমাদের জায়গা থেকে তাদের সহযোগিতা করেছি। জামায়াতের পক্ষ থেকে আজ যেসব পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে, এতে এমন কোনো বিষয় নেই যা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। অন্যদিকে এর চেয়ে আরো বেশি কিছু করার পরিকল্পনা জামায়াতের রয়েছে।’
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাসুম বলেন, ‘আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যা বলব, তা কেবল স্লোগানসর্বস্ব হবে না, বরং আমরা যা করতে চাই এবং যা বাস্তবায়ন করব, তাই ইশতেহারে আসবে। ইসলাম আমাদের এটাই শিক্ষা দেয়, যা নিজেরা করবে না, তা অন্যকে না বলতে। আমরা যা বলছি, তা বাস্তবায়ন করার জন্যই বলছি এবং আমরা আশাবাদী যে, জনগণ আমাদের প্রতি হতাশ হবে না।’
ইশতেহারে নারী অধিকার গুরুত্ব পাবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নারী অধিকারের বিষয়ে ইসলাম মা, বোন ও স্ত্রীকে যে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে, আমরা সমাজে তাই হুবহু প্রতিষ্ঠিত করব। বর্তমানে নারীরা যে নির্যাতন, হয়রানি বা যৌতুকের বলি হচ্ছে, তা বন্ধে আমরা সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার কায়েম করব, যাতে তারা নিজ নিজ অবস্থানে সর্বোচ্চ মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে।’