Image description

স্বাধীনতার পর থেকে দেশে এ পর্যন্ত মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।  রাষ্ট্রপতিদের শাসনকার্যের উপর জনগণের আস্থা ও রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য গণভোটগুলোর আয়োজন করা হয়।  স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর দেশে আবারও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। 

 

তবে এবারের গণভোটটি অন্যগুলোর থেকে আলাদা।  কেন না, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একই দিন, অর্থাৎ ১২ই ফেব্রুয়ারি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।  জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে দেশের সকল ক্ষেত্রে সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সকল স্তরে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর ব্যাপারে প্রচার চালাচ্ছে।  তবে একই দিনে দুই ব্যালট পেপারে ভোটদানের বিষয়ে ভোটারের মাঝে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।  ব্যালটের দুটিতেই ভোট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে কিনা কিংবা দুটির মধ্যে একটি ব্যালটে ভোট দিলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কিনা, গণভোটের বিষয়গুলো কী কী ইত্যাদির ব্যাপারে তুলে ধরা হলো। 

গণভোট নিয়ম নীতি ও নির্বাচন 

কোনো ভোটার দুটি ব্যালটের মধ্যে একটিতে ভোট দিতে চান তাহলে সেই সুযোগ আছে কিনা সেই প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব মতিয়ুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, একটি ব্যালট দেওয়ার কোনো সুযোগ এবার থাকছে না।

তিনি বলেন, একই সঙ্গে একজন ভোটারকে দুটি ব্যালটই সরবারহ করা হবে।  যদি কোনো ভোটার একটি ব্যালট নিতে চান তাহলে তাকে শুধু সংসদ নির্বাচন বা গণভোটের একটি ব্যালট দেওয়া হবে না।

নির্বাচন কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, যদি কোনো ভোটার গণভোটে ভোট না দিতে চান তাহলেও তাকে ব্যালট নিতে হবে।  তিনি ভোট দেন আর না দেন, তার দুটি ব্যালটই ভাঁজ করে বাক্সে ফেলতে হবে।  গণনার সময় যদি ফাঁকা ব্যালট ভোটের বাক্সে পাওয়া যায়, তবে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী সেই ব্যালটগুলো বাতিল বলেই গণ্য হবে।

এর আগে একটি পরিপত্রের মাধ্যমে ইসি জানায়, দুটি আলাদা ব্যালট পেপারের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।  ভোটগ্রহণ শেষে একই সঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল গণনা করা হবে।  সকলের ভোটের সুযোগ রাখতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিভিন্ন দেশে  একই খামে দুটি পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে।  ২৫ জানুয়ারির মধ্যে গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ব্যালট ভোট দেওয়া শেষে একই খামে করে দেশে পাঠাতে বলা হয়েছে। 

একই দিনে দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোটের সময়সীমা বাড়িয়ে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এবারের নির্বাচনে যে সব নির্বাচন কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের জন্য এই গণভোট নতুন অভিজ্ঞতা হওয়ায় বৃহস্পতিবার (২২শে জানুয়ারি) থেকে সারাদেশের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবে নির্বাচন কমিশন।

সারাদেশের এবার ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রে চলবে ভোটগ্রহণ।  সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়ায় দুটি ব্যালটেই একই সঙ্গে ভোট দিতে হবে।  সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যালট হবে সাদাকালো, আর গণভোটের ব্যালট পেপার হবে গোলাপি রংয়ের।  কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত, নির্ধারিত এবং সরবারহকৃত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ভোটারগণ ভোট প্রদান শেষে জাতীয় সংসদের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালট একই বাক্সে ফেলবেন।

 

ভোট গণনা শেষে প্রতিটি কেন্দ্রে একটি আলাদা ফরমে, আলাদা আলাদা ঘরে 'হ্যাঁ' ভোট ও 'না' ভোট গণনা করে সেটি কেন্দ্রে টানিয়ে দিবেন স্ব স্ব কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা।  একইভাবে সংসদ নির্বাচনের ভোটের পরিমাণও আলাদা ফরমে যোগ করতে হবে।  এসবের সঙ্গে প্রবাসী ও দেশের মধ্যে যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছে, তাদের ভোটও একই সঙ্গে যোগ করে দিতে হবে। 

পরে প্রতিটি আসন ভিত্তিও একইভাবে দুটি ভোটের ফলাফল যোগ করে সেটি স্বাক্ষর করে নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন রিটার্নিং অফিসার।

গণভোটের ক্ষেত্রে ঠিক এই বিয়ষগুলোই অনুসরণ করবে নির্বাচন কমিশন এবং সেই নির্দেশনাও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে মাঠের নির্বাচন কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে।

গণভোটের চারটি বিষয়

সরকার যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে সেখানে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার ও ৩৭টি আইন ও বিধি সংস্কারের তালিকা তৈরি করেছে।  যার সংক্ষিপ্ত অংশ তৈরি করা হয়েছে গণভোটের ব্যালটের জন্য।  সেখানে ছোট করে মাত্র চারটি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে।  ভোটারদের সেই বিষয়গুলো পড়েই জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোটের ব্যালটে হ্যাঁ অথবা না ভোট দিতে হবে।

এবার গণভোটের ব্যালটে যে চারটি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে তা হলো–

আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?" - (হ্যাঁ/না):

(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।

(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।

(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।

(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।

সূত্র: বিবিসি