Image description

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ফেনীর তিনটি আসনে ভোটের সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তরুণ ভোটারের বড় অংশ, জোট রাজনীতির হিসাব-নিকাশ, প্রার্থী পরিবর্তন ও আইনি জটিলতা—এই চার কারণে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা সমীকরণ। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থিতা নিয়ে ওঠানামা এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ফেনীর ভোটের মাঠকে করে তুলেছে বহুমাত্রিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

ফেনীর তিনটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ১৩ লাখ ৩০ হাজার ৯২৪ জন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সি তরুণ ভোটার পাঁচ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫০ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এই তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ ‘জুলাই আন্দোলনের স্পিরিটে’ অনুপ্রাণিত হয়ে নির্দিষ্ট দল নয়—যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার মনোভাব পোষণ করছেন। ফলে তারাই হতে পারেন নির্বাচনের গেম চেঞ্জার।

জেলায় তিনটি আসনেই বিএনপির প্রার্থী থাকলেও জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী দিয়েছে শুধু ফেনী-১ ও ফেনী-৩ আসনে। খালেদা জিয়ার মৃত্যু, ফেনী-২ আসনে জামায়াতের ছাড়, জোট রাজনীতি ও ফেনী-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুসহ বিভিন্ন ইস্যু ফেনীর নির্বাচনি সমীকরণকে পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ফেনী-১ (পরশুরাম-ফুলগাজী-ছাগলনাইয়া)

এই আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন ১০ জন। যাচাই-বাছাই শেষে তিনজনের মনোনয়ন বাতিল হয় এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে মনোনয়ন যাচাই কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। তার মৃত্যুর পর আসনটিতে দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনুকে প্রার্থী করা হয়। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এসএম কামাল উদ্দিন মজনুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। খালেদা জিয়া তার পৈতৃক আবাসের এই আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে তার মৃত্যুর পর বাইরে থেকে প্রার্থী এনে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপির তৃণমূলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে মাঠে সক্রিয় জামায়াত। ফলে এবারের নির্বাচনে পূর্বের সব সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিএনপির তৃণমূল।

এছাড়া আসনটির আরো পাঁচ প্রার্থী হলেন—জাতীয় পার্টির মোতাহের হোসেন চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কাজী গোলাম কিবরিয়া, গণমুক্তি জোটের মাহবুব মোর্শেদ মজুমদার ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন থেকে আনোয়ার উল্ল্যাহ ভূঞা।

ফেনী-২ (সদর)

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী জয়নাল আবদিনের প্রতিপক্ষ প্রথমবারের মতো নির্বাচনে আসা এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। জামায়াতের প্রার্থী লিয়াকত আলী ভূঁইয়া জোটের কারণে মঞ্জুকে আসনটি ছেড়ে দেন। এর আগে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে লিয়াকত আলী ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে আসনটিতে দল গোছানোর পাশাপাশি মাঠে সরব ছিলেন। ফলে সব মহলে লিয়াকত আলীর গ্রহণযোগ্যতা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু জোটগত হিসাবের কারণে তিনি আসনটি ছেড়ে দেন। তবে এবি পার্টির সাংগঠনিক শক্তি তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় বিএনপির জয় সহজ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী ও তরুণদের ভোট জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা রাখা মঞ্জুর পক্ষে গেলে পাল্টে যেতে পারে দৃশ্যপট ও পূর্বের সব সমীকরণ।

এই আসনে প্রার্থী হিসেবে আরো রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একরামুল হক ভূঞা, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) শামসুদ্দিন মজুমদার, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল মার্কসবাদীর (বাসদ) জসিম উদ্দিন, খেলাফত মজলিসের মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আবুল হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের তারেকুল ইসলাম ভূঞা ও আমজনতা দলের সাইফুল করিম মজুমদার।

ফেনী-৩ (দাগনভূঞা-সোনাগাজী)

এই আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক। মিন্টুর জনপ্রিয়তা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে শুরুতে ভোটের হাওয়া ধানের শীষের দিকে ঝুঁকলেও শেষ পর্যায়ে এসে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে তার প্রার্থিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনে করা আপিলের রায় তার বিপক্ষে গেলে এই আসনের পুরো সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় জামায়াত প্রার্থী মানিক তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশের সমর্থন পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই আসনে প্রার্থী হিসেবে আরো রয়েছেন জাতীয় পার্টির আবু সুফিয়ান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাইফ উদ্দিন, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের আবু নাছের, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আবদুল মালেক ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন থেকে খালেদুজ্জামান পাটোয়ারী।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ৪ জানুয়ারি যাচাই-বাছাই শেষে জেলার তিনটি আসনে মোট ৩৫ প্রার্থীর মধ্যে ২২ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা ও ১২ জনের বাতিল এবং বিএনপির মরহুম চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়ন যাচাই-বাছাই কার্যক্রম সমাপ্ত করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক।