জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে এই সনদের ওপর অনুষ্ঠেয় গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে প্রচারে নেমেছে দলটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য বাকি ২৭০ আসনে ‘অ্যাম্বাসেডর’ বা প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে এনসিপি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ সাত মাস ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। সেদিন ২৪টি দল সনদে সই করে, পরে আরও একটি দল সই করেছে। তবে এনসিপি জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যায়নি, পরেও আর সনদে সই করেনি।

তবে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগের দিন ১৬ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দল জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর না করলে পরবর্তী সময়ে সই করার সুযোগ থাকবে।
সনদে সই না করার বিষয়ে তখন সংবাদ সম্মেলন করে তিনটি দাবি জানিয়েছিল এনসিপি। এক. জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগেই প্রকাশ ও এই আদেশ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে জারি করতে হবে। দুই. জনগণ গণভোটে সনদের পক্ষে রায় দিলে নোট অব ডিসেন্টের (ভিন্নমত) কার্যকারিতা থাকবে না। তিন. গণভোটের রায় অনুযায়ী আগামী নির্বাচিত সংসদ তাদের ওপর প্রদত্ত গাঠনিক ক্ষমতাবলে সংবিধান সংস্কার করবে এবং সংস্কার করা সংবিধানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ সংবিধান, ২০২৬’।
এনসিপি পরেও আর সনদে সই করেনি। তবে গত ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। এই আদেশের অধীনেই ১২ ফেব্রুয়ারি জুলাই সনদের মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর গণভোট হবে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন মনে করেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করা যাবে না, বিষয়টি এমন নয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি কিছু অস্পষ্টতার কারণে। যেমন, নোট অব ডিসেন্টের (ভিন্নমত) ক্ষেত্রে ক্ল্যারিফিকেশন (ব্যাখ্যা) ছিল না, সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার ব্যাপারে নিশ্চয়তা ছিল না। পরে অবশ্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ হয়েছে, যার অধীনে গণভোট হচ্ছে। কিন্তু নোট অব ডিসেন্টের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়।’
এনসিপি কি সনদে সই করবে?
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এনসিপি। এখন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, সমঝোতায় তারা ৩০টি আসনে ছাড় পাচ্ছে। বাকি ২৭০টি আসনে তাদের প্রার্থী থাকছে না।
তবে গতকাল রোববার এনসিপির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলের কোনো প্রার্থী নেই, এমন মোট ২৭০টি আসনে দল থেকে অ্যাম্বাসেডর বা প্রতিনিধি নিয়োগ দেবে এনসিপি। এসব অ্যাম্বাসেডর বা প্রতিনিধির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোয় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো হবে। তাঁরা স্থানীয় জনগণের কাছে এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান, গণভোটের গুরুত্ব ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবেন। এ পদ্ধতির মাধ্যমে এনসিপি সারা দেশে একটি সমন্বিত ও সর্বব্যাপী প্রচার নিশ্চিত করতে চায়, যাতে প্রার্থী থাকা কিংবা না–থাকা—সব আসনেই জনগণের কাছে দলের বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকলেও এনসিপি কি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে? এমন প্রশ্নে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দলের অনেকেই এখন মনে করেন, এনসিপির জুলাই সনদে সই করা উচিত। তবে সংসদ নির্বাচন, গণভোটের প্রচারের প্রস্তুতি, সমঝোতাসহ বিভিন্ন কাজে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ব্যস্ত থাকায় এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে ওঠেনি।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা–৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে নেমেছেন। ‘আজাদী যাত্রা’ শীর্ষক প্রচার কার্যক্রমে তিনি ঢাকা–৮ আসনভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করছেন। জানতে চাইলে পাটওয়ারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘জুলাই সনদের কিছু বিষয় স্পষ্ট নয়। কিন্তু আমরা সংস্কার চাই। তাই “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে প্রচার করছি। সনদে স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত নিলে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেব।’