আলফাজ আনাম
নতুন এক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে পা রেখেছেন তারেক রহমান। সতেরো বছর আগে সেনানিয়ন্ত্রিত সরকারের সময় তার ওপর চালানো হয়েছিল নির্মম নির্যাতন। এরপর তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। সে সময় দলের ভেতরে ও বাইরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছিল একটি মহল। গণমাধ্যমে তারেক রহমানকে বাংলাদেশের রাজনীতির এক ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে এমন বৈরী পরিস্থিতি আর কখনো আসেনি। এমনকি বিদেশে গিয়েও তিনি ও তার পরিবার স্বস্তিতে ছিলেন না। এর মধ্যে একের পর এক পারিবারিক বিপর্যয় সৃষ্টি করা হয়েছে। নির্বাসনে থাকা অবস্থায় ভাইকে হারিয়েছেন, মাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা মামলায় আটকে রেখে সুচিকিৎসা না দিয়ে বাড়িতে বন্দি রাখা হয়েছিল। এখন তিনি হাসপাতালে আছেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে তারেক রহমান নির্বাসনে থেকে দলের হাল ধরে রেখেছেন। দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনে দলের লাখ লাখ নেতাকর্মীকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। গুম ও খুনের শিকার হয়েছেন কয়েক হাজার নেতাকর্মী। দীর্ঘ সময়ে বিদেশ থেকে দল পরিচালনা করতে গিয়ে নানা ধরনের ভুল হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু তার বড় সাফল্য ছিল স্বৈরশাসকের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিএনপিকে ভাঙা সম্ভব হয়নি। এটি তারেক রহমানের বড় রাজনৈতিক কৃতিত্ব। বিদেশে থেকেও দলের ওপর তিনি কর্তৃত্ব ধরে রাখতে পেরেছিলেন। অথচ ওয়ান-ইলেভেনের পর দলের মহাসচিবসহ অনেক সিনিয়র নেতা বিশ্বাসঘাতকতা করে দল ছেড়ে গিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তার ওপর নির্মম নির্যাতনের পেছনে দলের এই নেতাদের কম ভূমিকা ছিল না। দুই নেত্রীকে মাইনাসের নামে বেগম খালেদা জিয়াকে কারারুদ্ধ করতে এরাই ছিলেন বেশি সক্রিয়।
তারেক রহমান সতেরো বছর আগে যে রাজনীতির দৃশ্যপটের মধ্য থেকে দেশ ছেড়েছিলেন, গত দেড় দশকে তার অনেক কিছু বদলে গেছে। প্রবল প্রতাপশালী ও নিপীড়ক এক শাসকের পতন ঘটেছে। সদলবলে তাদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে। গতানুগতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের বাইরে তরুণ ছাত্রদের রক্তাক্ত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন হয়েছে। কোটা প্রথা বাতিলের মতো অরাজনৈতিক বিষয়কে উপলক্ষ করে আন্দোলন গড়ে উঠলেও এই আন্দোলনের ভাষা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের পতনের মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত এক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। ফলে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা।
চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে থাকা জাতীয়তাবাদী দল দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শনের ওপর দলটি গড়ে উঠেছে। সেই রাজনৈতিক দর্শন ধারণ করে গড়ে উঠেছে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনীতি। সাতই নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটেছিল জিয়াউর রহমানের। সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মূল চেতনা ছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ। ফলে জিয়াউর রহমানের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়া, রুশ-ভারতের পক্ষপুটে থাকা পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে আসা এবং ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা।
সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের ৫০ বছর পর ১৪ হাজার মানুষের আত্মত্যাগ ও ২০ হাজার মানুষের পঙ্গুত্ববরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেড় দশকের ভারতের পুতুল সরকারকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের যে চেতনা, এবারের অভ্যুত্থানের চেতনার মধ্যে তার বড় কোনো ফারাক নেই। এখনো এ দেশের মানুষ এমন নেতৃত্ব দেখতে চায়, যারা ভারতীয় আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় ভূমিকা পালন করতে পারবে। ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি বদলে আত্মমর্যাদার পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে। বহুমুখী সম্পর্কের ভিত্তিতে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ গতিশীল হবে। হাসিনা উৎখাতের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার কাছে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার নাম ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। দেশের ভঙ্গুর ও অস্থির পরিবেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ট্র্যাকে দেশকে ফিরিয়ে আনা এখন প্রধান কর্তব্য। দেশের মানুষ বাংলাদেশকে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে দেখতে চায়। তারেক রহমানের সামনে দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয়তাবাদী দলকে জিয়াউর রহমানের আদর্শে পরিচালিত করা, যাতে দেশের তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই দলের রাজনীতির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করে।
দীর্ঘ সময়ের স্বৈরশাসকের পলায়নের পর রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোগুলোয় এখন শূন্যতা ও এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে কেবল এই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব। এজন্য প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে দরকার হবে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐক্য। প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে তারেক রহমানকে এই ঐক্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক দল ও দেশের মানুষকে বার্তা দিতে হবে—সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গতিপথ নির্ধারিত হবে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পরিচালনা করা হবে।
বিএনপিকে আরেকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে, ফ্যাসিবাদ তাড়াতে জুলাইয়ের আন্দোলনের ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা হবে। ফ্যাসিবাদ তাড়ানোর বেদনাদায়ক স্মৃতি যে এ দেশের মানুষের মধ্যে এখনো জাগরূক আছে, তা মাত্র কয়েক দিন আগে জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির মুখ ওসমান হাদির জানাজা থেকে স্পষ্ট। ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর মানুষের প্রতিবাদ ও জানাজা থেকে দেশের মানুষ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটি বড় বার্তা দিয়েছে বলে মনে করা যায়। সম্ভবত তারেক রহমানও এই বার্তাটি পেয়েছেন। দেশে ফেরার পর তার প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোয় ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
তারেক রহমান সম্ভবত ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, হাসিনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট কতখানি বদলে গেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন একসময়কার জোটসঙ্গী যারা ছিল বেগম খালেদা জিয়া সরকারের জুনিয়র পার্টনার, তারা হয়ে উঠেছে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এমন পরিস্থিতি বিএনপির নেতাকর্মীদের সামনে নতুন এক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। কারণ এই নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নির্ধারণ করা দলের জন্য কঠিন। বিএনপি সবসময় আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করে এসেছে। জিয়াউর রহমানের সময় থেকে ইসলামপন্থি দলগুলো ছিল বিএনপির মিত্র। এখন তারা হয়ে উঠেছে প্রধান প্রতিপক্ষ। ফলে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে পড়তে হচ্ছে বিএনপি ও তারেক রহমানকে।
আওয়ামী লীগ যেভাবে কিংবা যে ন্যারেটিভে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোকে মোকাবিলা করেছে, সেই পথে যদি বিএনপি এগিয়ে যায়, তাহলে দলটির জন্য বুমেরাং হতে পারে। বিএনপির মুখে আওয়ামী ন্যারেটিভ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তারেক রহমান এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন। সুবিধাবাদী রাজনৈতিক চক্র ও জনসমর্থনহীন বামপন্থিরা তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়েছে। শেকড়হীন এই রাজনৈতিক চক্র সবসময় পরগাছার ভূমিকা পালন করে। এদের প্রধান কাজ হচ্ছে একধরনের আদর্শিক ধোঁয়াশার আড়ালে কাল্পনিক শত্রু তৈরি করা। এই রাজনৈতিক চক্রটি দলের ভেতরে ও বাইরে বিভাজনের রাজনীতি উসকে দেয়। এরা মূলত যেকোনো পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ ধরনের ব্যক্তিরা এখন বিএনপির সামনের সারির মুখ হিসেবে মানুষের পরিচিতি পাচ্ছে। বিশেষ করে দলের প্রচারবিদ হিসেবে যারা নিজেদের দাবি করছেন, তারা উগ্র সেক্যুলার ও বিভাজনের রাজনীতির বয়ান সামনে আনছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ। স্বাভাবিকভাবে ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দল বিএনপি ধীরে ধীরে মানুষের সামনে নতুন এক পরিচয় নিয়ে হাজির হচ্ছে। তারেক রহমান এই সুবিধাবাদী প্রচারবিদদের কতটা লাগাম টেনে ধরেন সেটাই দেখার বিষয়।