আল জাজিরার প্রতিবেদন
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শোকের আবহে দীর্ঘদিনের তিক্ততা ভুলে বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে এক ‘নতুন অধ্যায়’ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছে ভারত। গত ৩১ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিএনপির বর্তমান কাণ্ডারি তারেক রহমানের সঙ্গে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎ করেছেন। আসন্ন ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের এই অবস্থান পরিবর্তনকে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এস জয়শঙ্কর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বিশেষ চিঠি হস্তান্তর করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) বৈঠক ও করমর্দনের ছবি শেয়ার করে জয়শঙ্কর লেখেন, ‘ভারত সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করছি। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, বেগম খালেদা জিয়ার দর্শন ও মূল্যবোধ আমাদের অংশীদারিত্বের উন্নয়নে পথ দেখাবে।’
ভারতের এই মন্তব্যকে নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ গত কয়েক দশক ধরে নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে বা নেপথ্যে খালেদা জিয়ার ‘দর্শন ও মূল্যবোধের’ বিরোধিতা করে আসছিল। ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিএনপিকে পাকিস্তান-ঘেঁষা ও ইসলামপন্থীদের মিত্র হিসেবেই দেখে এসেছে ভারত।
কেন এই পরিবর্তন?
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি ভারত ও বিএনপি উভয় পক্ষকেই কাছাকাছি আসতে বাধ্য করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসনে যাওয়ায় বাংলাদেশে ব্যাপক ভারত-বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়। অন্যদিকে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। ফলে প্রধান প্রতিযোগী হিসেবে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
আল জাজিরাকে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, তারেক রহমান নির্বাসনে থাকাকালীন অনেকটা পরিণত হয়েছেন।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির শাসনামলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। তখন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়া এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সখ্যের অভিযোগ ছিল বিএনপির বিরুদ্ধে। তবে বর্তমানে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট ছিন্ন হওয়া এবং তারেক রহমানের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ’ ও ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি নয়াদিল্লির কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
তারেক রহমানের বৈদেশিক বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আল জাজিরাকে বলেন, সম্পর্কের নতুন সূচনার জন্য অতীত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হবে। শেখ হাসিনার আমলে সম্পর্ক ছিল কেবল একটি দল ও ব্যক্তির সঙ্গে। আমরা চাই জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, তারেক রহমান ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানানো হবে এবং ভারত যাতে হাসিনাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, অতীতের বোঝা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি বাস্তবতার কারণেই তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না—এমন সতর্কতাও রয়েছে। তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, নতুন শুরু করতে হলে অতীত থেকে ‘পরিষ্কার বিচ্ছেদ’ প্রয়োজন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নে ভবিষ্যৎ সরকারও ভারতের ওপর চাপ বজায় রাখবে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সামনে ভারতের বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশে পাকিস্তানঘনিষ্ঠ বা ভারতবিরোধী তৎপরতা ঠেকানো। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। ‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল; এখন তা জনগণের সম্পর্ক হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে’—এমন বার্তাই দিচ্ছে তারেক রহমানের দল।

