পরনে শিফন শাড়ি, আঁকা ভ্রু, চোখে বড় সানগ্লাস- নিজের ব্যক্তিত্বের সাথে মিলিয়ে জনপরিসরে এভাবেই দেখা যেত প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে।
তার এই সাজপোশাক একদিকে যেমন অনেক নারীর জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠেছিল, তেমনি কটাক্ষেরও শিকার হতে হয়েছে প্রতিপক্ষ রাজনীতিকদের।
আবার নারী নেতৃত্বের বিষয়ে ভিন্নমত থাকা রাজনৈতিক দলও জোট করেছিলেন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতির মাঠে নারীদের সাজপোশাকের ধারণাই বদলে দিয়েছিলেন ৪০ বছরেরও বেশি সময় বিএনপির শীর্ষ পদে থাকা এই নেতা।
একইসাথে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে পশ্চিমা ছকে বাঁধা ভাবনারও জবাব দিয়েছেন তিনি।
১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সহনশীল ইসলামী ধারার ও কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সাথে নারীদের উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
ফলে রাজনীতি আর ব্যক্তি জীবনে নেওয়া তার সিদ্ধান্তগুলো কারও কারও কাছে বিপরীতমুখী মনে হলেও, নিজ চিন্তায় তাতে সামঞ্জস্য আছে বলেও মনে করেন অনেকে।

সাদা সুতি শাড়ি থেকে শিফন, জর্জেট
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে এসেছিলেন প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।
পরনে সাদা রঙের সুতি বা তাঁতের শাড়ি, মাথায় আধোঘোমটা টেনে এক সময়ের গৃহবধূ হাল ধরেন দলের, নেতৃত্ব দেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের।
যদিও তার আগে স্বামীর সাথে তোলা ছবি বা ঘরোয়া পরিবেশে তাকে ঘোমটা দিতে দেখা যায়নি।
নির্বাচনে জয়ী হয়ে শপথ নেন বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
সময়ের সাথে তার সাজপোশাকেও আসে কিছুটা পরিবর্তন।
আন্দোলনের মাঠে যেখানে তাকে বেশিরভাগ সময় দেশিয় শাড়িতেই বেশি দেখা গেছে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর বৈঠক বা সরকারি সফরে তাকে দেখা যেত একরঙা সিল্ক, জর্জেট বা শিফন শাড়িতে।
সাথে থাকতো শাড়ির সাথে মিলিয়ে নেয়া শাল, সামনের দিকে খানিকটা ফুলিয়ে বাধা চুল, সীমিত অলঙ্কার, কখনও বা হাতঘড়ি, আর মর্জি হলে গোলাপি লিপস্টিকে। তার এই অবয়বকে আইকনিকও মনে করেন কেউ কেউ।
ছবির উৎস,Getty Images
এনিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন আই খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ওনার যে পোশাকটা, যে এপেয়ারেন্সে উনি (খালেদা জিয়া) আমাদের সামনে এসেছেন, সেটা আসলে আমাদের রক্ষণশীল জায়গার বিধবার রূপকে ভেঙে দেয়ার একটা জায়গা ছিল। পোশাক যেমন তার আইকন ছিল, তার ডাকটাও কিন্তু তার একটা আইকন ছিল এবং যেটা ক্রমাগত এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তার শক্ত অবস্থানকে প্রমাণ করেছে"।
প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সনকে নিয়ে 'খালেদা' নামে একটি বই লিখেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। সেখানে তার বাবা-মায়ের বরাত দিয়ে তিনি লিখেছেন ছোটবেলা থেকেই খালেদা জিয়া গুছিয়ে চলাফেরা করতেন, ছিলেন মৃদুভাষী।
মি. আহমদের ভাষায় রাজনীতিতে আসার পর তিনি কিছুটা গুটিয়ে গেলেও "পোশাকপরিচ্ছদের ব্যাপারে সবসময় পরিপাটি ছিলেন। তার সাজপোশাকে কোনো উগ্রতা ছিল না। এক ধরনের সম্ভ্রম জাগতো। এককথায় বলা যায় এলিগেন্ট"।
ছবির উৎস,Getty Images
বদলে দিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতার সাজপোশাকের ধারণা
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পভাষী, গাম্ভীর্য আর সংযত আচরণ তথা খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্বই তাকে রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
পোশাক আর সাজে তার আধুনিক মার্জিত রুচি আর পরিমিতিবোধ সেসময় যেমন নানা বয়সী নারীদের আকৃষ্ট করেছিল, তেমনি প্রভাব ফেলেছিল তাদের সাজসজ্জাতেও।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এনিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্টও করেন তারকাসহ অনেকে।
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে সংগীতশিল্পী সাজিয়া সুলতানা পুতুল লিখেছেন, 'জীবনে প্রথম তাকে দেখেছিলাম শৈশবে… ধূসর চুল আর শুভ্র শাড়িতে মনে হয়েছিল রাষ্ট্রপ্রধান হতে হলে বোধ হয় এতটাই আভিজাত্য নিজের ভেতর ধারণ করতে হয়।'
আইরিন সুলতানা নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'খালেদা জিয়ার জীবনাবসানের পর তার রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়েই বস্তুত কথা হবে। যদিও রাজনীতিক খালেদা জিয়া ঘরের বধূ থেকে দলের নেতা হয়ে ওঠার পুরোটা সময়েই ফ্যাশন ও স্টাইলে কেতাদুরস্ত একজন নারী ছিলেন'।

তবে তার নান্দনিকতা যে কেবল প্রশংসাই কুড়িয়েছে, তেমনটাও না।
বরং পর্যবেক্ষকদের ভাষায় পশ্চাৎপদ পুরুষতান্ত্রিক যে সমাজে তাকে রাজনীতিতে আসতে হয়েছে, সেখানে তার দল বা নেতৃত্বের বিপরীতে এসব বিষয় ঘিরে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকারই হতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
সভা-সমাবেশতো বটেই, এমনকি সংসদে দাঁড়িয়েও তার সাজপোশাক নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কটাক্ষ করার নজির রয়েছে, যা প্রকাশিত হয়েছে নানা সংবাদমাধ্যমে। আর তাতে কোনো অংশে পিছিয়ে ছিলেন না নারী নেতৃত্বও।
খোদ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের সামনে তার ভ্রু আঁকা কিংবা সাজগোজ নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন।
এধরনের কর্মকান্ডকে 'ব্যক্তিগত রোষানল' আর মোটাদাগে ছকে আঁকা নারী রাজনৈতিক নেতার চেয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের ফলে 'হজম' করতে না পারাকেই কারণ হিসেবে দেখেন পর্যবেক্ষকদের অনেকে।
"উনিতো সত্যিকার অর্থেই ট্র্যাডিশনাল সুন্দরী ছিলেন, একারণে ওনাকে অনেকের ব্যক্তিগত রোষানলে পড়তে হয়েছে", বলছিলেন অধ্যাপক নাহরিন আই খান।
অন্যদিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগে মুসলিম লীগ ও পরবর্তী সময়ে নারী রাজনৈতিক নেতাদের যে ইমেজ ছিল তাদের তুলনায় খালেদা জিয়াকে "একটু ডিস্টিংক্ট (স্বতন্ত্র) মনে হতো" বলে মন্তব্য করেন মি. আহমদ।
"এই পার্থক্যটা অনেকে হজম করতে পারতেন না। এটাই হলো সমস্যা", বলেন তিনি।
ছবির উৎস,Getty Images
নারী নেতৃত্ব মেনে নিয়ে একই মঞ্চে ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এসব আক্রমণ-সমালোচনায় কখনো জবাব দেননি খালেদা জিয়া, দমেও যাননি।
বরং বজায় রেখেছেন নিজের পছন্দের সাজপোশাক, জনপ্রিয়তা দিয়ে দাপিয়ে বেরিয়েছেন রাজনীতির মাঠ।
এমনকি ধর্মভিত্তিক যেসব রাজনৈতিক দলের নেতারা নারী নেতৃত্বকে সমর্থন করে না, তারাও খালেদা জিয়াকে সামনে রেখে করেছেন রাজনৈতিক জোট, একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে করেছেন সভা-সমাবেশ আর আন্দোলন।
মহিউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, পশ্চাৎপদ এই সমাজে এমনিতেই নারীদের প্রতি একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এমনকি এবারও ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নারীদের মনোনয়ন দিতে দেখা যায়নি।
"কিন্তু এরকম একটা সমাজে একজন নারীকে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে গ্রহণ করতে তাদের দ্বিধান্বিত দেখিনি। বা হতে পারে তারা বাধ্য হয়েছেন, তাদের এটা গিলতে হয়েছে"।
"কিন্তু খালেদা জিয়ার যে জনপ্রিয়তা এবং যে বিপুল পরিমাণ আগ্রহ তাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের – জীবনে কোনো নির্বাচনে হারেন নাই। এরকম একজন ব্যক্তিকে মেনে নেয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না- এভাবেও বলা যায়", বলেন তিনি।
ছবির উৎস,Getty Images
এমনকি নির্বাচনের জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে নিজের বেশভূষায়ও কখনও বদল আনেননি খালেদা জিয়া।
"যতদিন তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তিনি কট্টরবাদী লেবাসে যান নাই", বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
মৃত্যুর আগে পরিবারের সাথে তোলা ছবিতেও খালেদা জিয়াকে দেখা গেছে একই ধরনের শাড়ি আর সাজে।
"ওনাকে কিন্তু ইলেকশনের আগে কখনও হিজাব পরে আসতে হয়নি বা তসবিহ নিয়ে আসতে হয়নি। উনি যে পোশাকে ছিলেন, ওনার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একই ধারায় চলেছেন এবং শক্ত হাতে উনি ইসলামিক দলকে কন্ট্রোল করেছেন, উনি জাতীয়তাবাদকে ধারণ করেছেন এবং ওনার দলওকে ৪৪ বছর ধরে ম্যানেজ করে চলেছেন", বলছিলেন অধ্যাপক নাহরিন আই খান।