Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তাপ বাড়ছে রাজনীতির মাঠে। সেই উত্তাপ আরও বাড়িয়েছে জামায়াত-এনসিপি জোট। এই জোটের ফলে নির্বাচনী মাঠে কার পাল্লা ভারী হচ্ছে, আর কে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। 

এই জোটের ফলে জামায়াতে ইসলামী লাভবান হলেও এনসিপি কার্যত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে জামায়াতের ভেতরে বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে।

বিপ্লবের ফসল ও রাজনৈতিক মেরুকরণ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২৪-এর বিপ্লবের সুফল ঘরে তুলতে জামায়াত সুকৌশলে এগোচ্ছে। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের নির্বাচনী অবস্থান আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী করছে। প্রাথমিকভাবে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতাদের মধ্যে নানা বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে তারা একজোট হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

 

এই জোট নিয়ে জামায়াতপন্থী ও এনসিপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট। জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবীরা মনে করছেন, এই ঐক্য ইসলামী শক্তির সংহতি বাড়াবে। অন্যদিকে এনসিপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ আশঙ্কা করছেন যে এই জোটের ফলে এনসিপি তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় হারিয়ে ফেলছে। এনসিপি ও জামায়াত নেতাদের বক্তব্যেও এই জোটের ভালো-মন্দ দিকগুলো ফুটে উঠেছে।

তবে নেতৃত্বের বড় অংশই এখন নির্বাচনী মাঠকে শক্তিশালী করতে ঐক্যের ওপর জোর দিচ্ছেন। 

ভোটারদের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সাধারণ ভোটারদের মাঝে এই জোট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কিছু ভোটার মনে করছেন, ভোটের মাঠে ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে তারা প্রভাব ফেলতে পারবে, আবার কেউ কেউ এনসিপির জামায়াতে বিলীন হওয়াকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী যেভাবে সুসংগঠিতভাবে এগোচ্ছে, তাতে তারা নির্বাচনকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলছে। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপ্লবের সুফল ও সাংগঠনিক বিস্তার জামায়াতে ইসলামী ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিজেদের সক্রিয় ভূমিকার ফসল হিসেবে এই জোটকে দেখছে।

তাদের লক্ষ্য হলো এই বিপ্লবের রাজনৈতিক সুফল ঘরে তোলা এবং ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থানকে সর্বোচ্চ শক্তিশালী করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা বাংলাদেশে যে তৃতীয় ধারার রাজনীতির কথা বলছিলাম, জুলাই আন্দোলনের পর এনসিপি সেই জায়গাটা সবচেয়ে বেশি তৈরি করেছিল। এখন সংসদে আসন পাওয়ার লোভে তারা যখন জামায়াতের মতো একটি দলের সঙ্গে ঐক্যে গেল, সেটা আসলে এই সম্ভাবনারই ইতি ঘটাল।

আব্দুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যে কথা তারা বলছিলেন, সেটি দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এনসিপি আগে বলেছিল একাত্তর এবং চব্বিশের বিরোধীদের সঙ্গে কোনো সখ্য হবে না। কিন্তু যে জোটে তারা গেল, সেখানে একাত্তরের অমীমাংসিত প্রশ্নটি রয়েই গেল।

এই জোটে এনসিপির চেয়ে জামায়াত বেশি সুবিধা পাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ড. শামিম রেজা। তিনি বলেন, এনসিপির সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের যে সখ্য বা গ্রহণযোগ্যতা আছে, জামায়াত মূলত সেটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক সমালোচনা ঢাকার চেষ্টা করবে। জামায়াত যতটা সুবিধা পাবে, এনসিপি ততটাই জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। সব মিলিয়ে, নতুন রাষ্ট্র গঠনের যে লক্ষ্যের কথা এনসিপি শুরু থেকে বলে আসছিল, জামায়াতের সঙ্গে এই নির্বাচনী জোট সেই লক্ষ্য অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।

প্রাথমিকভাবে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে জামায়াত নেতাদের কিছু বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকলেও বর্তমানে তারা অভিন্ন নির্বাচনী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামী ও সমমনা শক্তিগুলোকে এক করে নির্বাচনকে আরও বেশি প্রভাবশালী করা। জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবীরা এই জোটকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি ইসলামী রাজনীতির জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে যা নির্বাচনী ময়দানে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এই জোটের ফলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে এনসিপি। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর বিশাল সাংগঠনিক শক্তির কাছে এনসিপি কার্যত বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
জোট গঠনের আগে এনসিপি নেতাদের মধ্যে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বাকযুদ্ধ চললেও, শেষ পর্যন্ত তারা ভোটের মাঠে একত্র হতে বাধ্য হয়েছেন। এনসিপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরা এই জোট নিয়ে বেশ চিন্তিত। তারা মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে এই গাঁটছড়া এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বকীয়তা ধূলিসাৎ করে দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে দলটির কোনো আলাদা অস্তিত্ব থাকবে না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে। তারা এনসিপির মতো ছোট দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে এবং নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার কৌশল অবলম্বন করছে। তবে এই জোটে এনসিপির রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

ভোটারদের মধ্যে এই জোট নিয়ে মিশ্র আবেগ কাজ করছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বড় পরিবর্তনের স্বার্থে এই ঐক্য জরুরি, আবার অনেকে মনে করছেন এটি ক্ষমতার রাজনীতির একটি অংশ মাত্র। বিশেষ করে এনসিপির সমর্থকরা তাদের দলের স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়ে যাওয়া নিয়ে হতাশ হতে পারেন। 

জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতাদের আলোচনায় এনসিপিকে ৩০ আসন ছেড়ে দিচ্ছে জামায়াত। নতুন এ দলটি আসন চেয়েছিল ৫৬টি। এ ছাড়া এনসিপির সঙ্গীয় জোট এবি পার্টি পাচ্ছে ৩টি আসন। এ দলটি ১২ আসন চেয়েছিল বলে জানা গেছে।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আমাদের সমঝোতা আসলে জামায়াতের সঙ্গে নয়, ৮ দলের সঙ্গে হচ্ছে। 

তার দলের ৩টি আসন প্রাপ্তির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা তো একটা জোটে আছি। এই জোট থেকে নাহিদ ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনিই জানেন।

৮ দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরকষাকষি করছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন দলটিকে ৩৫টি আসন দেওয়ার কথা ৮ দলের বৈঠকে চূড়ান্ত হলেও দলটি এখনও তা মানতে রাজি হচ্ছে না। দলটি ১২০ আসন দাবি করছে। 

জামায়াত যে ১১০ আসন ছাড়ছে বলে আলোচনা হচ্ছে, তার মধ্যে খেলাফত মজলিস ১৫টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১০টি, এলডিপি ৩টি, লেবার পার্টি ৩টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ২টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ৩টি, খেলাফত আন্দোলন ৪টি এবং নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।