
আওয়ামী লীগসহ ফ্যাসিস্ট দলের নেতাকর্মী পুনর্বাসনের স্বর্গরাজ্য এখন পিরোজপুর বিএনপি। গত কয়েক মাসে এখানে বিএনপির বিভিন্ন পদে এসেছেন দলগুলোর শতাধিক নেতা। যাদের নাম রয়েছে ফ্যাসিস্ট দলের বিভিন্ন কমিটিতে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত অভিযোগ দিয়েও মেলেনি প্রতিকার। উপরন্তু ত্যাগী পরীক্ষিতদের বাদ দিয়েই হচ্ছে প্রাথমিক সদস্যের তালিকা। পরিস্থিতি এমন যে, আজন্ম বিএনপি করা নেতারাও বাদ পড়ছেন সদস্য তালিকা থেকে। এ নিয়ে ক্ষোভে দল ছেড়েছেন মঠবাড়িয়া উপজেলা বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মী। একযোগে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন তারা। ক্ষোভ সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মঞ্চে রেখে সম্মেলন হয়েছে ভাণ্ডারিয়া উপজেলায়। এছাড়া স্বরূপকাঠী-মঠবাড়িয়াসহ কয়েকটি উপজেলায় ঘটেছে সংঘর্ষের ঘটনা। যদিও এসব অভিযোগ স্বীকার করেননি এখানে কমিটি পুনর্গঠনের দায়িত্বে থাকা দলের সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক রওনাকুল ইসলাম টিপু। অভিযোগের তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মঞ্চে বাহিনী রেখে ভাণ্ডারিয়ায় সম্মেলন : আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির (জেপি-মঞ্জু) নেতাদের বিএনপিতে আসা নিয়ে প্রথম জটিলতা বাধে ভাণ্ডারিয়া উপজেলায়। প্রাথমিক সদস্য ফরম বিতরণ এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন নিয়ে শুরু থেকেই এখানে ওঠে নানা অভিযোগ। জেপি (মঞ্জু) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বাড়ি হওয়ায় তার দলের লোকজন বেশি এখানে। তাদের অনেকেই এখন বিএনপি নেতা। একই ভাবে আওয়ামী লীগ নেতারাও দেদার ঢুকছেন বিএনপিতে। শিয়ালকাঠী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি পদে এসেছেন ২নং নদমুল্লা ওয়ার্ড কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি বিধান চন্দ্র রায়। ৪নং ইকড়ি ইউনিয়ন যুব সংহতির সহসভাপতি হালিম গোমস্তা হয়েছেন ৭নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি।
যুবলীগের সক্রিয় ক্যাডার সাইদুল ইসলাম সম্পাদক হয়েছেন ইকড়ি ইউনিয়ন বিএনপির ৯নং ওয়ার্ডে। এই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেওয়া মাইনুল হাওলাদার। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন সিকদার ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা শরীফ বলেন, ‘শুরু থেকেই দলের ত্যাগী পরীক্ষিত নেতাকর্মী বাদ দিয়ে চলছিল কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া। কয়েক হাজার নেতাকর্মীর পূরণ করা প্রাথমিক সদস্য ফরম ফেলে দিয়ে ভোটার করা হয় অন্য দল থেকে আসা লোকজনকে। পদ-পদবি টিকিয়ে রাখতে কাজটি করেন বর্তমান নেতারা। বিষয়টি নিয়ে বহুবার মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা রওনাকুল ইসলাম টিপুকে। সেসব না শুনে লোক দেখানো সম্মেলন আর ভোটের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয় উপজেলা সম্মেলন। আগের নেতাদেরকেই আবার বসানো হয় পদে। বঞ্চিতদের ক্ষোভ ঠেকাতে সম্মেলন মঞ্চে রাখা হয় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’ অভিযোগ সম্পর্কে টিপু বলেন, ‘মঞ্চে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রেখে সম্মেলন চলছে শুনে সেখানে গিয়েছিলাম। তেমন কিছু পাইনি। পরে শুনেছি যে পক্ষ-প্রতিপক্ষের উত্তেজনা আর চিৎকার-চ্যাঁচামেচি শুনে তারা সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে চলে গেছেন।’ দলে ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসন প্রশ্নে বলেন, ‘গ্রুপিং আর নেতৃত্বের কারণে এসব অভিযোগ আসে। অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নাজিরপুরে বিএনপির কমিটিতে বহু আওয়ামী লীগ : ১১ জুলাই নাজিরপুর উপজেলা বিএনপি নেতারা ঢাকায় দেখা করেন বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে। উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিএনপির পদ-পদবিতে আসা আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি তালিকা তুলে দেওয়া হয় তার কাছে। সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হয় সংশ্লিষ্টদের আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটিতে থাকার প্রমাণ। এ সময় সেখানে ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান। দাখিল হওয়া ওইসব প্রমাণে দেখা যায়, বিএনপির পদে আসা এমন অন্তত ৬৪ জন আছেন যাদের নাম রয়েছে আওয়ামী লীগের কমিটিতে। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিরুয়ার রহমান বলেন, ‘মাটিভাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ২নং ওয়ার্ডের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মতিউর রহমান এখন একই ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। শাখারীকাঠি ইউনিয়ন কৃষক লীগের কমিটির সদস্য এসেছেন ওই ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি পদে। এরকম অনেক ঘটনা আছে। যারা এভাবে বিএনপির পদে এসেছেন তারা যে আওয়ামী লীগের পদে ছিলেন তার যাবতীয় প্রমাণ কেন্দ্রে দিয়েছি। এখানে প্রাথমিক সদস্য ফরম পূরণ থেকেই শুরু হয়েছে ষড়যন্ত্র। যারা যুগ যুগ ধরে বিএনপি করেছেন তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে প্রাথমিক সদস্য তালিকা থেকে। যার খেসারত বিএনপির পদে এসব আওয়ামী লীগ নেতারা।’ অভিযোগ সম্পর্কে টিপু বলেন, ‘প্রমাণ সংবলিত অভিযোগ দাখিলের পর বিষয়টি তদন্ত করে দেখেছি। এরকম ১৩-১৪ জন পাওয়া গেছে যারা আওয়ামী লীগের পদে ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।’
মঠবাড়িয়ায় ক্ষোভে শতাধিক নেতাকর্মীর বিএনপি ত্যাগ : ১৫ আগস্ট বেতমোর রাজপাড়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডে একসঙ্গে প্রায় দেড়শ লোক যোগ দেন জামায়াতে ইসলামীতে। এদের অধিকাংশই বিএনপির নেতাকর্মী। বহু বছর ধরে বিএনপি করার পরও প্রাথমিক সদস্যের তালিকায় নাম না ওঠায় ক্ষুব্ধ হয়ে দল ছেড়েছেন তারা। ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা পাঁচজন উপদেষ্টা ছিলাম ওয়ার্ড বিএনপির কমিটিতে। ২০১৫ সালে হয় সর্বশেষ ওই কমিটি। শুধু আমি নই, আজন্ম বিএনপি করা অনেকের নাম বাদ পড়েছে প্রাথমিক সদস্য তালিকা থেকে। অথচ আমরা যথাযথভাবে ফরম পূরণ করে জমা দিয়েছিলাম। চূড়ান্ত তালিকা হওয়ার পর দেখি বাদ পড়েছি সবাই।’ ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পকেট কমিটি করার জন্য আমিসহ অন্তত ৭০-৮০ জনের প্রাথমিক সদস্য ফরম গায়েব করা হয়েছে। সেই ক্ষোভে বড় একটা অংশ জামায়াতে যোগ দিয়েছে। আমরা অবশ্য দল ছাড়িনি। সরাসরি সব জানিয়েছিলাম টিপু ভাইকে। উপজেলা-জেলা নেতাদের কাছেও অভিযোগ দিয়েছি, লাভ হয়নি। লোক দেখানো সম্মেলনের মাধ্যমে যাকে সভাপতি করা হয়েছে তিনি আওয়ামী লীগের লোক। সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থী, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বায়জিদ আহম্মেদের নির্বাচনি এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছে।’ শুধু এই একটি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড নয়, উপজেলার আরও বহু এলাকায় ঘটেছে একই ঘটনা। হলতা গুলিশাখালী ইউনিয়নের ৩-৪ নং ওয়ার্ডে বিএনপির সভাপতি হওয়া দুজনই সরাসরি ছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনে। মঠবাড়িয়া সদর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের সিনিয়র সহসভাপতি পদে আসা ব্যক্তি ছিলেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কমিটির ৩৭নং সদস্য। উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হুমায়ুন ফরাজি পেয়েছেন রাজপাড়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি পদ। এরকম আরও অনেক আওয়ামী লীগ নেতা পদ-পদবি পেয়েছেন বিএনপির কমিটিতে।
এই তিন উপজেলা ছাড়াও পিরোজপুর সদর, পৌরসভা, স্বরূপকাঠী এবং জিয়ানগর থেকেও মিলেছে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিএনপির কমিটিতে পদ-পদবি পাওয়ার প্রমাণ। এসব বিষয়ে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা টিপুর কাছে মৌখিক আর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথাও বলেছেন অনেকে। কিন্তু সব অভিযোগের প্রায় একই উত্তর টিপুর, চলছে তদন্ত আর যাচাই-বাছাই। অভিযোগের সত্যতা পেলে নেওয়া হবে ব্যবস্থা। কিন্তু গত ১ বছরেও এরকম কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির মেলেনি পিরোজপুরে। বরং দিন দিন আরও ভাড়ি হচ্ছে অভিযোগের পাল্লা।