Image description

তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে রাজনৈতিক লড়াই এখন আর শুধু মাঠে বা রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই। এই লড়াই হচ্ছে বাস্তবিক জগতের বাইরে ভার্চুয়াল জগতেও। গত কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (সোশ্যাল মিডিয়া) খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় এবং জনমত গঠনে রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত সবার চোখ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফলে রাজনীতির প্রচার-প্রসারে এ মাধ্যম যথেষ্ট ভুমিকা রাখছে। গত বছর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতন হয়েছে সেখানেও বড় প্রভাব ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে দেশে-বিদেশে বেশ কয়েকটি আন্দোলনই গড়ে উঠেছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে। ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়েও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে প্রচারণা, অন্য দলের বিপক্ষে গুজব-কুৎসা রটনা, অপপ্রচার, বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের চরিত্র হনন থেকে শুরু করে সবকিছুই চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। আর এই মাধ্যম ব্যবহারে এগিয়ে রয়েছে পতিত ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন গড়ে উঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। অন্যদিকে এই মাধ্যমে অনেকটাই পিছিয়ে আছে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি। দলটির মাঠে ব্যাপক সমর্থন থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেভাবে উপস্থিতি দৃশ্যমান নয়। দলীয়ভাবেও নেয়া হয়নি তেমন কোন উদ্যোগও। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মিডিয়া সেল এবং বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেন্টার-বিএনআরসি গঠন করা হয়েছে এই উদ্দেশ্যে, তবে এই দুই সংগঠন সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না বলেও মনে করেন দলটির নেতারা। এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে দলের স্থায়ী কমিটিতে আলোচনার কথাও জানিয়েছেন শীর্ষ নেতারা।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরকার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এর সঠিক ব্যবহার একদিকে যেমন নাগরিক অধিকার ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে, তেমনি এর অপব্যবহার সমাজে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই, এর ব্যবহারকারীদের সচেতন থাকা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ডিজিটাল প্রচারণার ক্ষেত্রে পতিত আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী যেমন সংগঠিত, তেমনি তারা নানা কৌশল ও কনটেন্ট দিয়ে আধিপত্য বিস্তার করছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। সেখানে বিএনপি যেন এক রকম ছন্দপতনের শিকার। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে অনলাইন পরিসরে রাজনৈতিক বক্তব্য, প্রচার ও প্রোপাগান্ডার পরিধি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ সময়টাতে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের সংঘবদ্ধ অপপ্রচার কেবল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেই নয়, বিএনপি, জামায়াতসহ এনসিসি এবং ইসলামী আন্দোলনের মতো অন্যান্য ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোকেও প্রবলভাবে লক্ষবস্তু করেছেতবে গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি কিছুটা সক্ষমতা দেখালেও, বিএনপি অনেকটা নিষ্ক্রিয়। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিএনপির এ পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ হলো দলীয় পর্যায়ে কারিগরি সক্ষমতার অভাব এবং কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি। অনেক সিনিয়র নেতা এখনো অনলাইন মিডিয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নন। ফলে দলীয় প্রচারণায় আধুনিক ভিডিও কনটেন্ট, গ্রাফিক্স, ডেটাভিত্তিক এনালিটিকস বা ট্রেন্ড বিশ্লেষণের মতো উপাদানের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, অনলাইন মিডিয়া বর্তমানে জনমত গঠনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। এখানে পিছিয়ে পড়া মানে শুধু বার্তা ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হওয়া নয়, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হারানো। এ দিক থেকে বিএনপির ঘাটতি বেশ বড়।

রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশ এর তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে শুধু ত্রয়োদশ নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে বিএনপিকে নিয়ে। অপতথ্যগুলোর ধরণ বুঝতে এগুলোকে রিউমর স্ক্যানার দুইটি আলাদা ভাগে ভাগ করেছে। দলটির পক্ষে যায় এমন অপতথ্যের প্রচারকে ইতিবাচক এবং বিপক্ষে যায় এমন অপতথ্যের প্রচারকে নেতিবাচক হিসেবে ধরে নিয়ে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এসব অপতথ্যের ৮৪ শতাংশই বিএনপির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে।

বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে যেসব আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে তাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে, জনমত গঠন, মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা, তরুণদের রাজপথে নামানোর এক্ষেত্রে এটি ছিল অন্যতম হাতিয়ার। বাংলাদেশে ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন এবং ২০২৪ এর কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার পতনের আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা ছিলো অনেক বেশি। শুধু বাংলাদেশ নয়, ক্রমাগত ভ্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে ফিলিপাইনেও ক্ষমতার মসনদে বসেছেন সাবেক স্বৈরশাসকের ছেলে। কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের আরজি করের ধর্ষণ কা-ও সোশ্যাল সাইটের কারণে অনেক বেশি ছড়িয়েছে। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানেও আন্দোলন যখন তীব্র তখন ইন্টারনেট বন্ধ করতে বাধ্য হয় সরকার। সেখানেও দাবি করা হয় সোশ্যাল সাইট ব্যবহার করে আন্দোলনকারীরা সরকারকে সরাতে চাচ্ছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার আন্দোলন দমাতে সোশ্যাল সাইট বন্ধ করার ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সরকারের চালানো নানা হত্যাযজ্ঞের ভিডিও ও স্থির চিত্র যখন সোশ্যাল সাইট খুলে দেয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে তখন আর আটকানো যায়নি আন্দোলন। পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারও বিগত কয়েক বছর ধরে লক্ষাধিক কর্মী নিয়োগ করে সাইবার লড়াইয়ে। সিআরআইয়ের মতো শক্তিশালী গবেষণা প্ল্যাটফর্মও দাঁড় করিয়েছে দলটি। শত শত কোটি টাকা খরচ করেছে অনলাইন ক্যাম্পিংয়ে। নির্বাচন ও সরকারের বিশেষ প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে এসব ব্যবহৃত হতো। ৫ আগস্টের আগে জামায়াতের তেমন প্রচারণা না থাকলেও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীও এই মাধ্যমে সক্রিয়তা বাড়িয়েছে, ব্যয় করছে ক্যাম্পিংয়ে। আর জুলাই আন্দোলনের ফলে গড়ে উঠা নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির বেশিরভাগই তরুণ হওয়াতে তারা স্বাভাবতই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপিসহ অন্যান্য দলও ক্রামাগত সোশ্যাল সাইট ব্যবহার করে আসছে পৃথকভাবে। যদিও তাদের দলীয় কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য না।