Image description

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিটি এলাকায় একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এ বিষয়ে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশনাও রয়েছে। তবে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে দলটি। কোথাও সমঝোতা, কোথাও অভ্যন্তরীণ ভোটের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে এখনো একমত হতে পারেননি স্থানীয় নেতারা। এরই মধ্যে প্রার্থী হওয়া নিয়ে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।

গত ১০ অক্টোবর তারেক রহমানের নির্দেশনায় স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধ মেটাতে বিশেষ কমিটি গঠন করে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের মোট ৫ হাজার ৪৮০টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সামনে রেখে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান, সদস্য, মেয়র ও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। --- সূত্র, নিউএজ 

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ছয় জেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে সংঘর্ষে অন্তত ৬১ জন আহত হয়েছেন। এসব সংঘর্ষে কোথাও কোথাও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। নারায়ণগঞ্জে বিএনপির এক নেতাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

ফেনীর পঞ্চগাছিয়া ইউনিয়নে একক প্রার্থী নির্ধারণে স্থানীয় নেতারা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি। পরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুযায়ী দলীয় সদস্যদের ভোটে একক প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে ভোটের এই প্রক্রিয়াও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ইউনিয়নটির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী কামাল উদ্দিন আহমেদের অভিযোগ, ভোটের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। অতীতে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও তাঁকে ভোটের বাইরে রাখা হয়েছে। ভোটের কয়েক দিন পর প্রার্থী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে তাঁর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জাতীয়তাবাদী তাঁতী দলের স্থানীয় এক নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একাধিক প্রার্থী থাকায় বাছাইপ্রক্রিয়ায় অনেকে নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। এখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় নেতারা।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ে তিনটি পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা; দ্বিতীয়ত, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি; আর তাতেও সমাধান না হলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ নেওয়া।

 কথা বলেছেন বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার সম্ভাব্য ২০ জন প্রার্থী এবং দলীয় নেতা। তাঁদের অধিকাংশই সমঝোতার ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাইয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন। কয়েকজনের মতে, প্রার্থী নির্বাচনে অর্থনৈতিক প্রভাব নয়, বরং দলের জন্য সাংগঠনিক অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, পরিস্থিতি তত জটিল হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও চেয়ারম্যান পদপ্রত্যাশী নোমান উদ্দিন মুরাদ বলেন, কোনো কোনো এলাকায় পাঁচ থেকে ১১ জন পর্যন্ত প্রার্থী হতে আগ্রহী। প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করা হবে। তাতে কাজ না হলে ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটির নেতাদের ভোটে প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।

সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন জানান, অভ্যন্তরীণ ভোটের বিষয়ে তাঁদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা নেই। প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক অবদান ও জনগ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ে জরিপ করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন তাঁরা। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। তাঁর আশা, আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার এমন ঘটনা কম ঘটবে।

ফেনীতে অবশ্য প্রার্থী বাছাইয়ে অভ্যন্তরীণ ভোটের প্রক্রিয়া শুরু করেছে জেলা বিএনপি। ফেনী সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। একটি ইউনিয়নে সর্বোচ্চ ১৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে কমিটি গঠন করে জেলা পর্যায়ে নির্দেশনা দিয়েছে। তবে যেসব এলাকায় সাত থেকে ২৫ জন পর্যন্ত নির্বাচনে আগ্রহী, সেখানে একক প্রার্থী নির্ধারণ করা কঠিন হবে।

প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, তা নিয়েও বিএনপির নেতাদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।

অন্যদিকে এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, অভ্যন্তরীণ ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা তাঁর জানা নেই। তবে প্রয়োজন মনে করলে স্থানীয় নেতারা ভোটের পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতেও দল কাজ করছে বলে জানান তিনি।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান লিটন বলেন, প্রার্থী নির্ধারণ করবেন জেলা পর্যায়ের নেতারা। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলামের অভিযোগ, তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজের পছন্দের প্রার্থী বাছাইয়ের চেষ্টা করছেন।

দলীয় সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতা ইতিমধ্যে তৃণমূলে বিভক্তি স্পষ্ট করে তুলেছে। কুমিল্লা জেলা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নিউ এজকে বলেন, সম্ভাব্য প্রার্থীরা স্বতন্ত্রভাবে প্রচার চালানোর পরিবর্তে এলাকায় একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। প্রতিপক্ষকে দমনের চেষ্টায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

নারায়ণগঞ্জের এক বিএনপি নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে যেসব নেতা-কর্মী একসঙ্গে আন্দোলন করেছেন, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে তাঁরাই এখন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন। তবে নিজের প্রার্থিতার সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে সাম্প্রতিক সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জহির ফকির হত্যাকাণ্ড। গত ২১ অক্টোবর তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর ভাতিজা ও মামলার বাদী ইসমাইল হোসেনের অভিযোগ, চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে হত্যা করেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জহির। এবারও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল তাঁর।

ইসমাইল হোসেন জানান, গত বছরও ওই পক্ষের হামলার শিকার হয়ে মামলা করেছিলেন জহির। তবে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, জহির কখনো তাঁকে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনার কথা জানাননি। হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির ১২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ২২৭ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে সৃষ্ট সহিংসতার ঘটনা ৬৯টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন, আহত ৫৪০ জন।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর কেউ সহিংসতায় জড়ালে তাঁকে বহিষ্কারের পাশাপাশি দায়ীদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

দীর্ঘ ১১ বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ফিরতে যাচ্ছে বিএনপি। গত ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন জানায়, আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ৮০টি উপজেলার ৮১৫টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। তবে গত ১০ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। নির্বাচনে অনিয়ম ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ২০২১-২২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বর্জন করে দলটি। যদিও সে সময় তৃণমূলের অনেক নেতা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেন। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও বর্জন করেছিল বিএনপি। তবে ২০২১ সালের পৌরসভা নির্বাচনসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল দলটি।আস