বছর পেরোলেও এখনো বিতর্কে জুলাই জাতীয় সনদ। আর এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বল এখন জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের কোর্টে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সমমনা জোট এরই মধ্যে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে। সেখানে বিরোধী জোটের জন্য ৫টি আসন খালি রাখলেও এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে নাম দেওয়া হয়নি। কমিটি এ পর্যন্ত ৯টি বৈঠকে সংবিধানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন সব অংশীজনের মতামত নিয়েছে। আর দুই থেকে তিনটি বৈঠক করতে চায় কমিটি। এর মধ্যে বিরোধী দলকে একাধিকবার আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাতে সাড়া মেলেনি। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। বিষয়টি নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।
গত রবিবারও জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, পাহাড়সমান ব্যর্থতা চাপা দিতেই বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে সরকার। ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টাও করছে। তিনি বলেন, নোট অব ডিসেন্টের ক্ষেত্রে সমঝোতা প্রস্তাবে রাজি হয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করবে না জামায়াত। অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ও সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে আনা হলে বিরোধী দল অংশ নেবে এমন আশা করেন তিনি। বলেন, তারা যদি তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন না করে, সেটা জাতি দেখবে। তবে বিএনপি তাদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেন, বিরোধীদল যদি চায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্ট শিথিল করার জন্য, সেটা কমিটিতে এসে তাদেরকে বলতে হবে। তখন কমিটি বিবেচনা করতে পারে, এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি মন্তব্য করতে তিনি চান না।
সরকারি দল জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত তারা সংবিধান সংশোধনে বিরোধী জোটের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে। মতামত চায়। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাই বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না এ দাবি সঠিক নয়। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় জোট সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে সংস্কারের দাবি জানিয়ে বিশেষ কমিটি বর্জন করে আসছে। প্রয়োজনে কঠোরভাবে রাজপথে নামারও ঘোষণা দিয়েছে। জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নে বেশির ভাগ ভোটার সম্মতি দিলেও তা বাস্তবায়নে বিএনপি সরকার গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, এই সংবিধান ফ্যাসিবাদের জন্মই শুধু দেয় নাই, ফ্যাসিবাদকে স্থায়ী রূপ দিতে চেয়েছিল। যে সমস্ত জায়গায় আমূল পরিবর্তন দরকার, সব জায়গায় আপনারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছেন। আবার নোট অব ডিসেন্ট দেন নাই, সেগুলোও এখন আপনারা এড়িয়ে চলছেন। সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন, ‘ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়া সংবিধানে ফিরে না গিয়ে জুলাই সনদের আলোকে ৭০ ভাগ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে রাজপথের আন্দোলনেই সরকারকে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে।’ ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজসহ কমিশনের সদস্যরাও জুলাই সনদে সই করেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাতে সই করে। জুলাই সনদে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মোট ৮৪ দফা রয়েছে, সংবিধান সংক্রান্ত বিষয় বাদে বাকিগুলোকে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি নেওয়ার জন্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের আয়োজন করা হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরুতে হোঁচট খায়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির বিজয়ীরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ীরা দুই পদেই শপথ নেন। গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধীদের মাঠের আন্দোলনের মধ্যেই বিএনপি সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে, যেখানে প্রতিনিধি দেয়নি বিরোধীরা। সংবিধান সংশোধন কমিটি ইতোমধ্যে রাজনীতি দল ও জোট, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক, বিশিষ্ট নাগরিক, গণমাধ্যমের প্রতিনিধি, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা, নারী নেতৃত্ব, গণ অভ্যুত্থানের অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বিত খসড়ায় ৮৪টি সিদ্ধান্তের মধ্যে ১০টি প্রস্তাবে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো নোট অব ডিসেন্টের মাধ্যমে আপত্তি জানিয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ত্রয়োদশ সংশোধনীর অনুচ্ছেদ ৫৮এর গ (২) প্রস্তাবের বিপরীতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপি ও সমমনা কয়েকটি রাজনৈতিক দল। সনদের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান নিয়ে বলা আছে- প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না। এ বিষয়ে বিএনপি, এনডিএম, ১২-দলীয় জোট, ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট আপত্তি জানিয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় বাছাই কমিটির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে এর গঠন প্রক্রিয়া সংসদের হাতে ন্যস্ত করার পক্ষে মতামত দিয়েছে বিএনপি। নিম্নকক্ষে পিআর পদ্ধতির যে প্রস্তাব রয়েছে, সে বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপিসহ কয়েকটি সমমনা রাজনৈতিক দল। উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী রাখার প্রস্তাবেও নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপি ও এনডিএম। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্বের দুটি বিষয়ে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো আপত্তি দিয়েছে। এই দুটি বিষয় হলো- বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন না। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এই দুটি পদে নিয়োগ হয়। সনদের প্রস্তাবে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।
এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতি যে প্রত্যাশা, তার কাঠামো তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন বুঝতে পারেন-পরিবর্তনের জায়গাগুলোর মধ্যে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বড় বিষয়। এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটাকে বাস্তবায়নের পথে যেভাবে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন ছিল, সেভাবে হচ্ছে না। ভিন্ন পথ খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। বড় রকমের সংস্কার ছাড়া ছোটখাটো সংশোধন দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো বদলাবে না। রাষ্ট্রকাঠামো না বদলালে গণতান্ত্রিক উত্তরণ করতে পারবেন না।
সংবিধান সংস্কারের আলোচনা শুরু হয়েছিল অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, জনমত জরিপসহ বিভিন্নভাবে নেওয়া মতামতের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি ওই কমিশন বিস্তারিত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেয়। পরে ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই দফায় দীর্ঘ আলোচনা করে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ।